মাহমুদ শরীফ কুমারখালী (কুষ্টিয়া) : কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে বিএনপি প্রাথমিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর থেকেই মনোনয়ন বঞ্চিতরা জনপ্রিয়তা প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভ মিছিল, মশাল মিছিল, মৌন মিছিল, প্রতিবাদ সভা, সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দুই গ্রুপের নেতা কর্মীরা। শেষে কেন্দ্র তাদের মূল্যায়ন করবে এমন আশা সবার।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থীর নাম আগেই ঘোষণা হওয়ায় দলের মধ্যে প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ বা ক্ষোভ নেই। জামায়াতের প্রার্থী অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে গণসংযোগ চালাচ্ছে। তার জনপ্রিয়তা এখন অবস্থান করছে শীর্ষে। এই আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় সোয়া চার লাখ। এর মধ্যে কুমারখালীর ভোটার দুই লাখ ছিয়াশি হাজার এবং খোকসা উপজেলার ভোটার এক লাখ ষোল হাজার।

অতীতের নির্বাচনে দেখা গেছে, কুমারখালী উপজেলার ভোটের উপরই এখানে বিজয় নির্ভর করে। সে অনুয়ায়ী চরমোনাই এর হাতপাখা ও বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী খোকসা উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় কুমারখালী শহরের বাসিন্দা দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর আলাদা একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়ে গেছে। তাছাড়া এই আসনে জামায়াতের রয়েছে নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক। ফ্যাসিষ্ট আমলেও দুই উপজেলায় দুইজন পুরুষ ও একজন মহিলা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ছিল। ইতিপূর্বে তিনজন ইউপি চেয়ারম্যানও বারবার নির্বাচিত হয়েছিলেন কুমারখালী থেকে।

এদিকে এনসিপির প্রার্থী চূড়ান্ত করার শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যদিও তাদের প্রভাব ক্ষীণ। গণঅধিকারের তরুন নেতা শাকিল আহমেদ তিয়াসও শো-ডাউন দিচ্ছে মাঝে মধ্যেই। তরুনদের একটি বড় অংশ ভাইজান খ্যাত তিয়াসের সাথে আছে। ইসলামী আন্দেলনের প্রার্থী আলহাজ্ব আনোয়ার খান বেশ জোরেশোরেই প্রচারণা চালাচ্ছেন ইদানিং। তবে নির্বাচনী লড়াই জমবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। অত্র আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী আফজাল হোসেন মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন অনেক আগে থেকেই। ঘরে ঘরে লিফলেট বিলি, শোভাযাত্রা, বাইক বহর, উঠান বৈঠক করছেন নিয়মিত।

জামায়াতের এই প্রার্থীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির থেকেই। ছিলেন উপজেলা শিবিরের সভাপতি। পৌর জামায়াতের আমীর, উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালনে বহু মামলা হামলার শিকার হয়েছেন। বর্তমানে উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এর আগে আফজাল হোসেন কুমারখালী উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হন সবচেয়ে বেশি ৮২ হাজার ভোট পেয়ে। কুষ্টিয়া-৪ আসনে প্রথম বারের মতো প্রার্থী হয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে ছুটছেন রাতদিন। দলের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে গণসংযোগসহ নির্বাচনী প্রচারণায়। নির্দলীয় ভাসমান ভোটাররাও এবার নতুন এই প্রার্থীর পক্ষে মতামত দিচ্ছে এমন দাবি তার।

বস্ত্র, তাঁতশিল্প ও কৃষি নির্ভর এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আলহাজ্ব আনোয়ার খান মাঝে মধ্যেই দিচ্ছেন বড় ধরনের শোডাউন। দলীয় কিছু নেতা কর্মীরা তার সাথে আছে। তবে এই দলের তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন জোরদার না থাকায় অনেকেই সোস্যাল মিডিয়ায় বিরুপ মন্তব্য করছে। তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজসেবামূলক কাজে ইদানিং বেশ সক্রিয়।মনোনয়ন না পাওয়া বিএনপির নেতাদের মধ্যে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে অনেকের মুখে ।

এদিকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনছার প্রামানিকের ছেলে জাকারিয়া মিলনকে কেন্দ্রীয় যুবদল বহিস্কার করায় এগ্রুপের তৎপরতা হ্রাস পেয়েছে। অপর আশাবাদী প্রার্থী শেখ সাদীও কেন্দ্রে জোর লবিং চালাচ্ছে, তার পক্ষে জনমত বাড়ছে দিনদিন।

কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক মেয়র নুরুল ইসলাম আনছার প্রামানিক দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় তার গ্রুপের কর্মীরা প্রতিবাদে মাঠ গরম অব্যহত রেখেছে। জেলা বিএনপির যুগ্ন আহ্বায়ক শিল্পপতি শেখ সাদী দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী, তার গ্রুপ রয়েছে কৌশলগত অবস্থানে। তারা এখনো মনোনয়ন পাবে বলে চালাচ্ছে প্রচারনা। আনছার প্রামানিক ও শেখ সাদী দুই জনই শেষে দলের মূল্যায়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

প্রাথমিক ভাবে মনোনয়ন পাওয়া বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী বিভিন্ন স্থানে গনসংযোগ চালালেও গ্রুপিং দোলাচলের কারণে আলোড়ন উঠছেনা। ধারনা করা হচ্ছে, দলীয় গ্রুপিং তারে প্রচারণায় ব্যাঘাত করছে। কুষ্টিয়া-৪ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দলটির মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ তীব্র হওয়ায় এক সময়ের বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে বিজয় কঠিন হবে, এমন কথা বলছেন প্রবীণ নেতারা।

কুষ্টিয়া জেলার ৪টির মধ্যে যে সব আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম কুমারখালী-খোকসা আসন। এখানে বিএনপি প্রার্থীর বিপক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আফজাল হোসেন দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় জনহিতকর কাজ করে জনগণের মন জয় করে ফেলেছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও ভোটার যত বেড়েছে, বিএনপির সে অনুযায়ী তেমন বাড়েনি। মহিলা ভোটারের ক্ষেত্রে জামায়াতের অবস্থান আরো শক্ত বলেও তারা তথ্য পেয়েছে।

আলোচিত কুমারখালী-খোকসা আসনে সমমনা ইসলামী আট দলীয় জোট চুড়ান্ত ভাবে কাকে মনোনয়ন দিচ্ছে? এই আালোচনা কুমারখালী ও খোকসা উপজেলায় এখন সর্বত্র। হাতপাখার প্রার্থীর কিছু কর্মী তাদের ‘মনোনয়ন কনফার্ম‘ বলে গুজব ছড়ালে এবিষয়ে আনোয়ার খান দৈনিক সংগ্রামকে জানান, সমমনা আট দলীয় জোট যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই আমরা। তিনি বলেন, ইসলামী দলের একটি ভোট বাক্স হোক এটাই চাই।

এদিকে প্রচার-প্রচারণা ও জনসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে বিএনপির অপর নেতা কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সদস্য হাফেজ মইনউদ্দিন। এলাকায় তিনিও জনপ্রিয় তরুন নেতা হিসেবে স্থান করেছেন। তার সমর্থকরাও মনে করে এখানে প্রার্থী পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এই আসনের নতুন প্রার্থীতায় দেখা যাচ্ছে খেলাফত মজলিসের ফজলে নূর ডিকো‘কে, তিনি দলের কুমারখালী উপজেলা সেক্রেটারী। মাঝে মধ্যে প্রচারণায় নামছেন। সব মিলে সমমনা ইসলামী আট দলীয় জোটের সাথে বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী লড়াই হবে, সেই ভোটের লড়াই অনেক কঠিন হবে এটা নিশ্চিৎ।