ভোটের লড়াইয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি নন কেউই। তারই অংশ হিসেবে একর পর এক বিএনপিতে বিলুপ্ত হচ্ছে দলটির সাথে রাজপথে থাকা ১২ দলীয় জোট ও যুগপৎ আন্দোলনের রাজনৈতিক দলগুলো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজ দল বিলপ্ত ঘোষণা করে বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন শীর্ষ নেতারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধুমাত্র একটি প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য দীর্ঘদিনের গড়ে উঠা রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করা গণতন্ত্রের জন্য শোভনীয় নয়, এটি খুবই দৃষ্টিকটু। কারণ একটি দল শুধুমাত্র একজনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠে না। দেশব্যাপী সংগঠনটির নেতাকর্মীরা যে উদ্দেশ্যে এই দলগুলোতে সক্রিয় থাকেন, তারা একসময় নিরাশ হয়ে হারিয়ে যান। এতে করে রাজনীতির উপর তাদের একধরণের অবিশ^াস জন্ম নেয়।
সূত্র মতে, চলতি মাসের ৮ তারিখ ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করেন। দলে যোগ দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন বলে জানান তিনি। সেলিম বলেন, দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। যদিও পরিস্থিতির কারণে একসময় বিএনপি থেকে তাকে সরে যেতে হয়েছিল। তবে হৃদয়ে সব সময় বিএনপিকেই ধারণ করেছেন।
এবার বিএনপিতে যোগদান করছেন জোটের সমন্বয়কারী এবং জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা। গতকাল সোমবার বিকালে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানস্থ কার্যালয়ে নিজের দল বিলুপ্ত করে নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন তিনি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে হুদা যোগ দেন। তিনি এয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ- ৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন।
অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদাসহ তার নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হলেন। আমরা আশা করছি, তাদের এই যোগদান বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করবে।
যোগদান করে সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, বিএনপি জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী দল। আমরা দেশের এই ক্রান্তিকালে গণতন্ত্রের পথে আমরা বিএনপিতে যোগ দিলাম। নির্বাচন বানচালের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মুহুর্তে তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আমি আমার দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করছি।
জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সাথে রাজপথে থাকা শরিকদের মনোনয়ন নিয়ে চলছে দর কষাকষি। এতে মনোনয়ন না পেয়ে জোটের অনেকেই হতাশা ব্যক্ত করেছেন। কেউকেউ বিএনপি তাদের সাথে গাদ্দারি করেছেন বলেও আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন। বিএনপির সাথে আজীবনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ লেবারপার্টি। সংগঠনটির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, বিএনপি তাদের সাথে মুনাফেকী আচরণ করেছে। তাদের সাথে আর একসাথে আন্দোলন করার প্রশ্নই আসে না।
এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসন্ন নির্বাচনে কোন ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না দলটি। ধানের শীষের প্রতীকের বাইরে জয়ী হওয়া অনেক কঠিন বলে মনে করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা। তারা বলছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বলেছেন, প্রার্থী কে হলো সেটি বড় বিষয় নয়, প্রতীকই হচ্ছে মূল। তাই যারাই বিএনপি থেকে নির্বাচন করবেন, তাদের প্রতীক হবে ধানের শীষ। এর বাইরে বিকল্প চিন্তা করা যাবে না।
এদিকে দল বিলুপ্ত করে যোগদানের বিষয়টিকে সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যারা রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করছেন, এটিকে আমি একটি বড় ও সাহসী সিদ্ধান্ত বলে মনে করি। আমরা দল বিলুপ্তকারীদের মূল্যায়নের চেষ্টা করছি।
সূত্র মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একক শক্তির যুগ খুব কম দেখা গেছে। রাজপথ হোক কিংবা নির্বাচনের মাঠসঙ্গী ছাড়া এগোনো প্রায় অসম্ভব। তাই স্বাধীনতার পর থেকে জোট গঠন হয়ে উঠেছে রাজনীতির সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। আর জোটই বারবার বদলে দিয়েছে রাজনৈতিক মানচিত্র। আদর্শের মিল, ক্ষমতার লোভ, কখনও অস্তিত্বের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের হাত ধরে। ভোটের আগে আসন ভাগাভাগি, ক্ষমতায় গেলে অংশীদারিত্ব, বাইরে থাকলে যুগপৎ আন্দোলন, এই তিন সূত্রে বাঁধা বাংলাদেশের জোটের রাজনীতি। তবে জোটের রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাঁকটি আসে ১৯৯৯ সালে। আওয়ামী লীগকে হটাতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি (এরশাদের একটি অংশ) ও ইসলামী ঐক্যজোট মিলে গঠন করে চার-দলীয় জোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ২০-দলীয় জোট হয় বিএনপির নেতৃত্বে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি এবং আরও কয়েকটি ছোট দল মিলে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ২০১৮ রাতের ভোটের নির্বাচনের কারণে এই জোট নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি ও নির্বাচনের পরেই এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। ২০২২ সালের শেষের দিকে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন করতে ২০ দলীয় জোট অনানুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দিয়েছে বিএনপি। ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের ডেকে বলে দেওয়া হয়েছে, আজকে থেকে ২০ দলীয় জোট বিলুপ্ত। কেউ যাতে আর ২০ দলীয় জোটের নাম ব্যবহার না করে। এরপর সবাই জোটবদ্ধ না হয়ে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। এতে অভিন্ন কর্মসূচি পালন করে দলগুলো। তবে এর মধ্যে ২০ দলীয় জোট ভাঙার ঘোষণার পর সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে যার যার অবস্থান থেকে অংশ নিতে জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন জোট গঠন করেছেন। এরমধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে ছিল এমন ১২টি রাজনৈতিক দল মিলে ‘১২ দলীয় জোট’ গঠন করেছে। আরো ছয়টি দল মিলে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট গঠন করেছে। এছাড়াও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকটি শরিক দলসহ বাম প্রগতিশীল ধারার ৭টি দল নিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ গঠন করা হয়েছে। গণতন্ত্র মঞ্চের ব্যানারেই এই ৭টি রাজনৈতিক দল বিএনপি ঘোষিত যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল। ।
জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে অন্তত পাঁচটি বড় জোট সক্রিয়। যেসব দল এখনো জোটে নেই, তারা যে কোনোভাবে কোনো বড় জোটের ছায়ায় ভোটযুদ্ধে নামতে চাইছে। তবে সবচেয়ে বড় বাধা আসন বণ্টন। ছোট দলগুলো চায় নিজেদের তুলনায় বেশি আসন পেতে। বিপরীতে বড় দলগুলো বেশি আসন ছাড়তে নারাজ। এমন অবস্থায় প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়, কারও কারও জোট ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেকেই নিজ দল বিলুপ্ত করে বড় দলে যোগ দিচ্ছেন।
জানা গেছে, ভোটের আগে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে বিএনপি। ২৭২টি আসনে নিজস্ব প্রার্থী ঘোষণা করলেও বাকি ২৮টি আসনের অর্ধেকও ঠিক করতে পারছে না বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে মিত্র দলগুলোতে উত্তাপ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি গুলশানে অনুষ্ঠিত বিএনপি ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির বৈঠক অস্বস্তিকর পরিবেশে শেষ হয়। আলোচনা মনঃপূত না হওয়ায় দলের শীর্ষ নেতা সাইফুল হক ক্ষুব্ধ হয়ে বৈঠকস্থল ছেড়ে চলে যান। নিজের আগ্রহের আসনে বিএনপি প্রার্থী দেওয়ায় লেবার পার্টি বিএনপির সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আসন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় গণঅধিকার পরিষদ বিএনপির পাশাপাশি বিরোধী জোটের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করা হবে এবং ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো হবে। এক্ষেত্রে অতীতে শরিক এবং মিত্রদের বিএনপি ২৫টি আসনে ছাড় দিয়েছিল, এবারো যেন তেমন মূল্যায়ন করা হয় সেই আশা করছেন দলগুলোর নেতারা। দলগুলোর শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি একলা চলো নীতিতে এগোচ্ছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বিএনপি বন্ধু ছেঁটে ফেলার কৌশল নিয়েছে, যা দলটির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে রাজনীতিতে ‘বিকল্প শক্তি’ হিসেবে উঠতে চাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী-ইসলামী আন্দোলনসহ আট দলের জোট। তারা ঘোষণা করেছে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’- প্রতি আসনে একজন প্রার্থী। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী তরুণ নেতৃত্বও পিছিয়ে নেই। এনসিপি, এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’। জাতীয় পার্টির একাংশ আত্মপ্রকাশ করেছে ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)’-১৮ দলের জোট। বাম দলগুলোও পিছিয়ে নেই। নয়টি দল নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’। আন্দোলন ও নির্বাচনে একসঙ্গে কাজের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত তারা স্বতন্ত্র থাকবে নাকি কোনো বড় জোটে যুক্ত হবে-সিদ্ধান্ত এখনো স্পষ্ট নয়। জোট থেকে এক দলে পরিণত হতে পারে এনসিপি, এবি পার্টি ও রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন।
রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. শামীম রেজা বলেন, রাজনীতির জটিল কুটিল অবস্থার মধ্যে ছোট দলগুলো কতটুকু অবস্থান তৈরি করতে পারবেন, বড় দল থেকে কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন সেটা বোঝার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। কারণ প্রতীক পেলেই বিজয় নিশ্চিৎ হবে না। কারণ মূল দলের প্রার্থীরা সব আসনেই রয়ে যাচ্ছে। তবে যেভাবে দল বিলুপ্তির হিড়িক শুরু হয়েছে, তাতে ভবিষ্যৎ রাজনীতি কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তবে কয়েকজন বিশ্লেষক বলেছেন, নাম সর্বস্ব দলগুলো জোটের ছায়ায় এসে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে ফায়দা লুটতে চায়। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা সংগঠনগুলো নিজেদের রাজনৈতিক দল পরিচয় দিয়ে জোট গঠন করে জোটভিত্তিক রাজনীতিকেই কলংকিত করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির সাথে থাকা একটি দলের শীর্ষ নেতা বলেন, জোট রাজনীতির যে ঐতিহাসিক গুরুত্ব তা আজ বিলীন হতে চলেছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে এ উপমহাদেশে জোট রাজনীতি শুরু হয়েছিলো তা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিএনপি যেভাবে তাদের মিত্র সংগঠনগুলোবে বিলীন করে দিচ্ছে, তাতে কেউ আর দল গঠন করবে না।