চাঁদপুর জেলা সংবাদদাতা

চাঁদপুরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি ও অন্যান্য দল। উৎসবমুখর এ পরিবেশ কিছতা ম্লান হয়েছে বিএনপির একাধিক প্রার্থী জটিলতা নিয়ে। নতুন ইতিহাস গড়তে চায় জামায়াত মনোনীত প্রার্থীগণ। এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এনসিপি, গণঅধিকার, খেলাফত মজলিস ও গণফোরামসহ অন্যান্য দলের প্রতিটি আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা হয়নি।

মনোনয়ন বঞ্চিতরা এখনো আন্দোলন করায় সাধারণ ভোটাররা রয়েছেন বিভ্রান্তির মধ্যে। দিন যত যাচ্ছে তাদের মধ্যেকার আন্তঃকোন্দলের বিষয়টি আরো স্পষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকটি আসনে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে দলের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। চারটি আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ, মশাল মিছিল ও কালো পতাকা মিছিল করে আসছেন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা।

আটটি উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁদপুরের পাঁচটি আসন। এখানে প্রথম দফায় ধানের শীষের কান্ডারির নাম ঘোষণা করে বিএনপি। তারা নানা কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছেন, দিচ্ছেন বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি। আর জামায়াত প্রায় বছরখানেক আগে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করায় ইতোমধ্যে তারা ভোটের মাঠ চষে বেড়িয়েছেন। দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী হিসেবে যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। এছাড়া ইসলামি আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদসহ অন্য দলগুলোও বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে আছে। জাতীয় পার্টির (জাপা) কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

চাঁদপুর-১ (কচুয়া)

জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মুহাদ্দিস আবু নছর আশরাফী। এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছে বিএনপি আ ন ম এহসানুল হক মিলন। এ নিয়ে বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে ‘অসন্তোষ’ দেখা দেয়। এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ২০১৮ সালে দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবিতে গত ২০ নভেম্বর উপজেলার নেতাদের নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন তিনি।

মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গত ১৫-১৬ বছর মিলন এলাকায় ছিলেন না। তখন আমি দলের হাল ধরে রেখেছি। সে কারণেই আমি এখনো মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ ক্ষেত্রে দল যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, আমিও তার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করব। অবশ্য এহসানুল হক মিলন বলেন, ‘দল থেকে আমি মনোনয়ন পেয়েছি। এখন কে কী বলল, এটা দেখা বা শোনার সময় নেই। যে যাই করুক, আমি দল মনোনীত ধানের শীষের চূড়ান্ত প্রার্থী।’

জামায়াত প্রার্থী মুহাদ্দিস আবু নসর আশ্রাফী এবারই প্রথম নির্বাচন করছেন। তিনি বলেন, এখানকার মানুষ পরিবর্তন চান। তিনি নিজের অবস্থান থেকে নির্বাচনী এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন। তার প্রচারণায় ব্যাপক জনসমাগম লক্ষ্যনীয়। নেতাকর্মীরাও তার জয়ের ব্যাপারে অনেকটাই আশাবাদী।

এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের ওমর ফারুক কাসেমী, এনসিপির ডা. আরিফুল ইসলাম, গণঅধিকারের এনায়েত হাসিব নির্বাচন করতে চান। জাপা সহ অন্যান্য দল এখনো প্রচারণায় আসেননি।

এই আসনে ১২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা ও ২৪৩টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এ উপজেলা। এ উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা রয়েছে ৩ লক্ষ ৫১ হাজার ৬ শ’ ৭৬ জন। তন্মধ্যে মহিলা ভোটার ১ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯শ’ ৬৯ জন ও পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ৮১ হাজার ৭শ’ ৪ জন।

চাঁদপুর-২ (মতলব উত্তর ও দক্ষিণ)

জামায়াতের প্রার্থী ডা. মো. আবদুল মোবিন। জামায়াতের প্রার্থী ডা. মো. আবদুল মোবিন বলেন, তিনি এবং তার ভোটাররা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উপজেলা শহর চষে বেড়াচ্ছেন। প্রতিদিনই করছেন সভা সমাবেশ। তিনি বলেন- মতলববাসী সচেতন, তারা পরিবর্তন চায়। দাঁড়িপাল্লার বিজয়ে এলাকাবাসী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে মো. জালাল উদ্দিনকে। যদিও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশ প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে। চাঁদপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) প্রয়াত নুরুল হুদার ছেলে তানভির হুদাকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে তার সমর্থকেরা আন্দোলন করে আসছেন।

তানভির হুদা বলেন, এখনো চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হয়নি। দলের দুঃসময়ে তিনি নেতা-কর্মীদের নিয়ে এলাকায় থেকে কাজ করে আসছেন। এখানে প্রার্থী পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে বলে তিনি মনে করেন। এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী বলেন, ‘আমি মনোনয়নপ্রত্যাশী সবাইকে নিয়েই শুরু থেকে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করে আসছি। দু-একজন ছাড়া সবাই এক হয়ে ধানের শীষের জন্য কাজ করছেন।’

বিএনপির এখনো অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী ব্যারিস্টার ওয়াদুর রহমান টিপু, অধ্যাপক ডা: শামীম, ডা: মাহবুবুর রহমান শামীম, সাবেক চেয়ারম্যান এম এ শুক্কুর, ড: আনিছুল আউয়াল। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মানসুর আহমেদ, এনসিপির ইসরাত জাহান বিন্দু, গণঅধিকারের ইসমাইল হোসেন বিএম গোলাপ হোসেন নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন।

চাঁদপুর-৩ (সদর ও হাইমচর)

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এডভোকেট মো. শাহজাহান মিয়া। এ আসনটিতে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন শেখ ফরিদ আহমেদ। বিএনপি থেকে আরো মনোনয়ন প্রত্যাশি বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তফা খান সফরি ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা প্রবাসী আজম খান। এতে তৃণমূলে বিভক্তি দেখা গেছে। বিএনপির প্রার্থী বলেন, ‘আমি প্রতিটি পাড়া-মহল্লার ঘরে ঘরে যাচ্ছি। তাদের চাহিদার কথা শুনছি। আমি মনে করি, আমার দল ক্ষমতায় এলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করবে।’

জামায়াতে ইসলামী মো. শাহজাহান মিয়াকে দলীয় প্রার্থী করেছে। তিনি চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও নিয়মিত এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচার চালাচ্ছেন। শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘আমার দল জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে দেশে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি থাকবে না। মানুষের ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।’ পাড়া মহল্লায় শাহজাহান মিয়ার সমর্থনে ব্যাপক গণসংযোগ, প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন নেতাকর্মীরা।

ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী শেখ মো. জয়নাল আবেদীন, গণফোরামের জেলা সভাপতি সেলিম আকবর, গণ অধিকার পরিষদের মো. জাকির হোসেন, এনসিপির জেলার প্রধান সমন্বয়কারী মো. মাহবুব আলম, খেলাফত মজলিসের তোফায়েল আহমেদ সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন।

চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ)

চাঁদপুর জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী। এই আসনে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করেছে লায়ন হারুনুর রশিদকে। বিএনপির সাবেক এই সংসদ সদস্যকে প্রার্থী ঘোষণার পর টানা তিন দিন সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এম এ হান্নানের সমর্থকেরা। এখনো তারা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন।

উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মঞ্জিল হোসেন বলেন, হারুনুর রশিদ গত ১৭ বছর নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন না। তারা প্রার্থী পরিবর্তন ছাড়া মাঠ ছাড়বেন না। তবে বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দল থেকে সিগন্যাল পেয়ে মাঠে নেমেছি। যারা বিরোধিতা করছে এখন, তারা প্রার্থী পরিবর্তনের আন্দোলন করতে করতে হয়রান হয়ে গেছে। শুনেছি, তারা স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচনে অংশ নেবে। এতে ধানের শীষের কিছুই হবে না।’

জামায়াত প্রার্থী মাওলানা বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী বলেন, দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। গত বছর থেকে তিনি এলাকায় নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সরকার গঠনের সুযোগ দেন তাহলে আমরা এ দেশে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করব। বেকার যুবকের বেকারত্ব সমস্যা দুর করব। প্রতিটি মানুষ যেন স্বাধীন ভাবে চলতে পারে, ন্যায় বিচার পায়, সে ব্যাপারে সংসদে কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠা করব। নেতাকর্মীরা বিল্লাল মিয়াজীর জয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মকবুল হোসাইন, এনসিপির উপজেলার প্রধান সমন্বয়কারী দেওয়ান মো. শরীফুল ইসলাম, গণঅধিকারের আরিফ তালুকদার মাহমুদুল হাসান, দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন।

চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি)

জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক আবুল হোসাইন। তিনি শাহরাস্তি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিল। মমিনুল হককে এখানে বিএনপির দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এ আসনে বিএনপি থেকে আরো মনোনয়ন প্রত্যাশি ব্যারিস্টার কামাল উদ্দিন. শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসেন। বিএনপির প্রার্থী বলেন, এই আসনে দল আমাকে প্রার্থী করেছে। মনোনয়ন ঘোষণার আগে এখানে কয়েকজন প্রচার চালালেও প্রার্থী ঘোষণার পর কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

জামায়াত প্রার্থী আবুল হোসাইন বলে, মানুষের পাশে সেবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজীগঞ্জ শাহরাস্তিতে গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। দলীয় নেতাকর্মীরা নির্বাচনী প্রচারণায় তাকেই জয়ের ব্যপারে আত্মবিশ্বাসী হিসেবে এগিয়ে রেখেছেন। দিনরাত তিনি নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন।

এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী। এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মো. মাহাবুব আলম, গণঅধিকারের ইউনুস মিয়া দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করে প্রচার চালাচ্ছেন। এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মো. মাহাবুব আলম বলেন, ‘আমরা পাঁচটি আসনে দলীয় মনোনয়নপত্র নিয়েছি। তবে গত রোববার তিনদলীয় জোট হয়েছে। চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হলে আমরা আমাদের অবস্থানের বিষয়টি বলতে পারব।’

অপরদিকে নির্বাচনি কৌশল হিসেবে জোটবদ্ধ প্রচারণায় নেমেছে জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাকের পার্টি ও খেলাফত মজলিসেরও রয়েছে একজন করে প্রার্থী।

জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা জানান, সুষ্ঠু ভোট হলে তারা নির্বাচিত হবেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে তারা যাচ্ছেন। ভোটারদের কাছে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলেও দাবি করেছেন এ দু’দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

তরুণ ভোটার আদনান আল মুরাদ বলেন, এখন একটা রিকশা চালকও অনেক সচেতন। তারা নিজের ভালো-মন্দ জানে এবং বুঝে। খিচুড়ি খাওয়ার জন্য অনেকেই নেতাদের সভায় যায়। প্রকৃতপক্ষে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা তাল মিলিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে বৃহৎ দল বিএনপির কর্মী-সমর্থক বেশি হলেও অন্তর্কোন্দল ও প্রার্থী জটিলতার কারণে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া কষ্টসাধ্য হবে। সেই ক্ষেত্রে ভোটাররা দেশ নিয়ে এখন জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আস্থা রাখছেন।

জেলার ৫ টি আসনেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে। আন্দোলন রত সমমনা ও ইসলামী ৮ দলের মধ্যে ৪ দল আছে। সার্বিকভাবে কেন্দ্রীয়ভাবে জেলার ৫টি আসনেই জামায়াতে ইসলামীর বাহিরে অন্য দলের প্রার্থী মনোনয়ন কঠিন বলে মনে করে ভোটার সাধারণ।