# ‘সময় এসেছে, সকলে মিলে দেশ গড়ার, যেকোনো মূল্যে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে, মহানবীর আদর্শের ন্যায়পরায়ণতার আলোকে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করব’
অবসান ঘটল দীর্ঘ অপেক্ষার। অপেক্ষা আর না-বলা কষ্টের পর টানা প্রায় ১৮ বছর পর আপন মাটি ছুঁলেন তারেক রহমান। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর আবেগ আর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রতিটি মুহূর্তে। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই জুতা খুলে খালি পায়ে মাতৃভূমির মাটি ছুঁলেন তারেক রহমান। পরে তিনি হাতে তুলে নেন এক মুঠো মাটি। প্রিয় স্বদেশের স্পর্শে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীসহ দেশের মানুষ। তাকে একনজর দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন কর্মী সমর্থক ও অনুরাগীরা।
প্রায় দেড় যুগ পর গতকাল বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের বুকভরা ভালোবাসায় সিক্ত হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশে ফেরার পর পূর্বাচলের ঐতিহিাসিক সংবর্ধনা মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি’। দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলার কথা তুলে ধরে সেটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা চেয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সমবেত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, প্রিয় ভাই-বোনেরা, মার্টিন লুথার কিং-এর নাম শুনেছেন না আপনারা? মার্টিন লুথার কিং, একটি বিখ্যাত ডায়লগ আছে, আই হ্যাভ এ ড্রিম। আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সকলের সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে আমি বলতে চাই, আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি।
তিনি বলেন, আজ এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য যদি সেই প্ল্যান, সেই কার্যক্রম, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয়। তাহলে এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন, এই সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি যত মানুষ আছেন, প্রত্যেকটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে। এরপর তিনি বলেন, আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন, আপনারা যদি আমাদেরকে সহযোগিতা করেন, ইনশাআল্লাহ আমরা ’আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব।
১৫ মিনিটের বক্তৃতা শেষ করে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাত নেড়ে স্বাগত জানিয়ে আবার মাইকের কাছে ফিরে এসে নিজের পরিকল্পনার কথা আবারও মনে করিয়ে দেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, মনে রাখবেন, উই হ্যাভ এ প্ল্যান। উই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অ্যান্ড ফর দ্য কান্ট্রি। ইনশাআল্লাহ, আমরা সেই প্ল্যান বাস্তবায়ন করব।
২০০৮ সালে কারামুক্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চলে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। এরপর প্রায় দেড় যুগ কাটাতে হয় নির্বাসনে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে নামেন তারেক রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে প্রথমে ফুল দিয়ে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মির্জা ফখরুল ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে একে একে আলিঙ্গন করেন। এ ছাড়া উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তিনি। পরে তিনি কুশল বিনিময় করেন তার শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর সঙ্গে। এ সময় মেয়ের জামাইকে গোলাপ ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু।
এর আগে তারেক রহমানকে বহনকারী বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিজি-২০২ উড়োজাহাজটি স্থানীয় সময় বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। সেটি বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে কিছু সময় যাত্রাবিরতি নিয়ে বেলা ১১টা ১২ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে তিনি ঢাকায় অবতরণ করেন।
বিমানবন্দর থেকে গাড়িবহর নিয়ে তারা যান পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়কে সংবর্ধনা স্থলে। সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ‘প্রিয় বাংলাদেশ’ সম্বোধনে শুরু করা বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, একাত্তর সালে এই দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ২০২৪ সালে এদেশের ছাত্র জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল। আজ বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়। তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ চায়, তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার পাবে।
তিনি বলেন, আজ আমাদের সময় এসেছে, সকলে মিলে দেশ গড়ার। এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলেরও মানুষ আছে; এই দেশে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে।
সকলের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে তিনি বলেন, যে বাংলাদেশে একজন নারী, একজন পুরুষ, একজন শিশু, যেই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ইনশাআল্লাহ, ঘরে আবার ফিরে আসতে পারে। তিনি বলেন, এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, পাঁচ কোটির মত শিশু, ৪০ লাখের মত প্রতিবন্ধী মানুষ এবং কয়েক কোটি কৃষক-শ্রমিক রয়েছেন। এসব মানুষের একটি প্রত্যাশা আছে এই রাষ্ট্রের কাছে, এই মানুষগুলোর একটি আকাঙ্ক্ষা আছে এই দেশের কাছে। আজ আমরা সকলে যদি ঐক্যবদ্ধ হই, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে আমরা এই লক্ষ কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারি, ইনশাআল্লাহ।
শান্তি-শৃঙ্খলা বজান ওপর রাখায় গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আসুন, আমরা যে ধর্মের মানুষ হই, আমরা যে শ্রেণীর মানুষ হই, আমরা যে দলেরই রাজনৈতিক দলের সদস্য হই, অথবা একজন নির্দলীয় ব্যক্তি হই, আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে, যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ধরে রাখতে হবে। যেকোনো মূল্যে যে কোনো বিশৃঙ্খলাকে পরিত্যাগ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে। শিশু হোক, নারী হোক, পুরুষ হোক, যে কোনো বয়স, যে কোনা শ্রেণী, যেকোনো পেশা, যে কোনো ধর্মের মানুষ যেন নিরাপদ থাকে, এই হোক আমাদের চাওয়া।
তারেক রহমান বলেন, একাত্তর সালে আমাদের শহীদরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এরকম একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য। বিগত ১৫ বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শত শত, হাজারো গুম-খুনের শিকার হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, নিরীহ মানুষও প্রতিবাদ করতে গিয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে, জীবন দিয়েছে। ২০২৪ সাল মাত্র সেদিনের ঘটনা। আমরা দেখেছি আমাদের তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা কীভাবে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে দেশের এই স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য।
আততায়ীর গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির নিহতের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে এই বাংলাদেশের চব্বিশের আন্দোলনের, এক সাহসী প্রজন্মের এক সাহসী সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি শহীদ হয়েছে। ওসমান হাদি চেয়েছিল, এই দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক, এই দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক, এই দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক।
তিনি বলেন, আজ চব্বিশের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন ওসমান হাদিসহ, একাত্তরে যারা শহীদ হয়েছেন, বিগত স্বৈরাচারের সময় বিভিন্নভাবে খুন-গুমের শিকার হয়েছেন, এই মানুষগুলোর রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, আসুন আমরা আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যেখানে আমরা সকলে মিলে কাজ করব; যেখানে আমরা সকলে মিলে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলব।
কোনো দেশের নাম উচ্চারণ না করে তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন আধিপত্যবাদ শক্তির গুপ্তচরেরা বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রে এখনও লিপ্ত রয়েছে। আমাদেরকে ধৈর্যশীল হতে হবে, ধৈর্য ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের যে সদস্যরা আছেন, আপনারাই আগামী দিন দেশকে নেতৃত্ব দিবেন, দেশকে গড়ে তুলবেন। এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের সদস্যদের আজ গ্রহণ করতে হবে, যেন এই দেশকে আমরা সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি, শক্ত ভিত্তির উপরে, গণতান্ত্রিক ভিত্তি, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির উপরে যেন এই দেশকে আমরা গড়ে তুলতে পারি।
মঞ্চে এবং মঞ্চের বাইরে থাকা জাতীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে চাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যেকোনো মূল্যে আমাদেরকে এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে, যেকোনো উস্কানির মুখে আমাদের ধীর, শান্ত থাকতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, আসুন আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করি, হে রাব্বুল আলামিন, হে একমাত্র মালিক, হে একমাত্র পরওয়ারদিগার, হে একমাত্র রহমত দানকারী, হে একমাত্র সাহায্যকারী, আজ আপনি যদি আমাদেরকে রহমত দেন, তাহলে আমরা এই দেশের মানুষ কঠোর পরিশ্রম করার মাধ্যমে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারব। আজ যদি আল্লাহর রহমত এই দেশ এবং এই দেশের মানুষের পক্ষে থাকে, আল্লাহর সাহায্য, আল্লাহর দয়া এই দেশের মানুষের উপরে, এই দেশের উপরে থাকে, ইনশাআল্লাহ, আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
মহানবীর (সা.) আদর্শে ন্যায়পরায়ণতার আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি নেতা বলেন, আসুন, আমরা সকলে মিলে প্রতিজ্ঞা করি যে, ইনশাআল্লাহ, আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আসবেন, আমরা সকলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের ন্যায়পরায়নতার আলোকে আমরা দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
মায়ের সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, আপনারা জানেন, এখান থেকে আমি আমার মা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাব। এই একটি মানুষ, যে মানুষটি এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবেসেছেন। তার সাথে কী হয়েছে, আপনারা প্রত্যেকটি মানুষ সে সম্পর্কে অবগত আছেন। সন্তান হিসেবে আপনাদের কাছে আমি চাইব, আজ আল্লাহর দরবারে আপনারা দোয়া করবেন, যেন আল্লাহ উনাকে তৌফিক দেন, উনি যেন সুস্থ হতে পারেন।
বক্তৃতার শেষ প্রান্তে নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি স্লোগান ধরেন, আসুন প্রিয় ভাই বোনেরা, সবাই মিলে আজ আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, ‘সবাই মিলে করব কাজ, গড়ব মোদের বাংলাদেশ’।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের আগে বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। মঞ্চে অন্যদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হেসেন ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
অন্যান্য দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জেএসডির তানিয়া রব, জনসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দীন ইকরাম, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারী, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) আহসান হাবিব লিংকন ও জাগপার খন্দকার লুৎফুর রহমান।
এর আগে বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে গণসংবর্ধনা মঞ্চে পৌঁছান তারেক রহমান। সেখানে নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
লাখো কণ্ঠের উচ্ছ্বাসে স্বাগত : অবসান ঘটল দীর্ঘ অপেক্ষার। টানা প্রায় ১৮ বছর পর আপন মাটি ছুঁলেন তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীসহ দেশের মানুষ। তাকে একনজর দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন কর্মী-সমর্থক ও অনুরাগীরা। দলীয় পতাকা-ব্যানার হাতে ভোর থেকেই বিমানবন্দর এলাকা ও রাজধানীর ৩০০ ফিটে জড়ো হন লাখো নেতাকর্মী। প্রত্যেকেই পথ চেয়েছিলেন তারেক রহমানের। অবশেষে সবার অপেক্ষার অবসান ঘটে। এর মধ্যে দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে গণসংবর্ধনাস্থলের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান লাখা নারী-শিশু বৃদ্ধ-যুবা। অনেকে হাত উঁচিয়ে সালাম জানান। তাদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস-আনন্দ আর নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। তার স্বদেশে ফেরার এই মুহূর্ত ঘিরে মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকা। দলীয় পতাকা-ব্যানার হাতে এক অনন্য উচ্ছ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন নেতাকর্মীরা।
এর আগে বেলা ১১টা ৪২ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান। সেখানে তাকে বরণ করে নেন দলের শীর্ষ নেতারা। সেখান থেকে লাল-সবুজের একটি বাসে চড়ে গণসংবর্ধনা মঞ্চ ৩০০ ফিটের দিকে রওনা হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। পথে পথে নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান। তাকেও স্বাগত জানান অপেক্ষমান নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।
খালি পায়ে মাটি ছুঁলেন : অপেক্ষা আর না-বলা কষ্টের পর অবশেষে দেশের মাটিতে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর আবেগ আর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রতিটি মুহূর্তে। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই জুতা খুলে খালি পায়ে মাতৃভূমির মাটি ছুঁলেন তারেক রহমান। পরে তিনি হাতে তুলে নেন এক মুঠো মাটি। প্রিয় স্বদেশের স্পর্শে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তারেক রহমান। দুপুর সাড়ে ১২টার পর বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে প্রথমে দুই পায়ের জুতা খোলেন। এরপর হাতে নেন এক মুঠো মাটি।
প্রধান উপদেষ্টা সঙ্গে ফোনালাপ : দেশে নেমেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন তারেক রহমান। দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছার পর তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে ফোন করেন। সূত্র বলছে, ফোনে তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। প্রধান উপদেষ্টাও তাকে দেশে স্বাগত জানান।
আদরের বিড়ালও ঢাকায় : তারেক রহমানের আদরের পোষা বিড়াল জেবু এখন ঢাকায়। তারেক রহমানের সঙ্গে একই ফ্লাইটে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তাকে ঢাকায় আনা হয়। এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান জানিয়েছিলেন, বিড়ালটি তার মেয়ে জাইমা রহমানের হলেও এখন তার পরিবারের অংশ হয়ে গেছে, সবার আদরের হয়ে গেছে জেবু।
জনস্রোতে পরিপূর্ণ ৩০০ ফিট : তারেক রহমান বীরের বেশে, ফিরে এলেন বাংলাদেশে, তারেক রহমান আসছে, বাংলাদেশ হাসছে, এমন স্লোগানে মুখরিত ছিল ৩০০ ফিট এলাকা। সরেজমিন দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের বিপুলসংখ্যক উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে সংবর্ধনাস্থল ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কাজ করেছে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।
ফেসবুকে পোস্ট : যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে সিলেট এসে পৌঁছেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে বহনকারী উড়োজাহাজটি বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সিলেট পৌঁছে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট দেন তারেক রহমান। পোস্টে তিনি লেখেন, অবশেষে সিলেটে, বাংলাদেশের মাটিতে! পোস্টে তারেক রহমান দুটি ছবিও যুক্ত করেন। একটিতে তাকে উড়োজাহাজের ভেতরে বসে থাকা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। অন্য ছবিটিতে তার সঙ্গে স্ত্রী জুবাইদা রহমানও রয়েছেন।
গণসংবর্ধনাস্থলে পৌঁছাতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় : কয়েক লাখ মানুষের ভিড় ঠেলে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজধানীর পূর্বাচলের গণসংবর্ধনাস্থলে পৌঁছাতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। পূর্বাচলে গণসংবর্ধনাস্থলে যাওয়ার জন্য হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমানকে নিয়ে গাড়িবহর রওনা দেয় দুপুর ১২টা ৪১ মিনিটে। গণসংবর্ধনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছাতে এই গাড়িবহরকে ভিড়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে তারেক রহমানের গাড়িবহর সভামঞ্চের কাছাকাছি যায়। গাড়ি আর সামনে অগ্রসর হতে না পারায় ৩টা ৫০ মিনিটে তিনি হেঁটে সভামঞ্চে ওঠেন।
তারেক রহমান লাল-সবুজ রংয়ের একটি বাসে করেই গণসংবর্ধনাস্থলে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। বাসটির সামনে লেখা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এই বাসের সামনে বসে তিনি নেতাকর্মীদের অভিবাদনের জবাবে হাত নাড়িয়ে তাঁদের শুভেচ্ছা জানান। এসময় বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। নেতাকর্মীরা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রাখে পুরো এলাকা।
সাধারণ চেয়ারে তারেক রহমান : লাল-সবুজ রঙে সাজানো একটি বাসে করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গণসংবর্ধনাস্থলে পৌঁছান তারেক রহমান। গণসংবর্ধনাস্থলের মঞ্চে উঠে নিজের জন্য বরাদ্দ বিশেষ চেয়ার সরিয়ে রেখে সাধারণ একটি চেয়ার টেনে সেটাতে বসেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পরে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন তিনি। বক্তৃতার শুরুতে তারেক রহমান বলেন, রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে আজ আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি আপনাদের মাঝে। ১৯৭১-এ আমাদের এই মাতৃভূমি লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ১৯৭৫ সালে সিপাহি বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। একইভাবে পরে ’৯০-এ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে এনেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতাসহ এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।এক পর্যায়ে মঞ্চে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।