দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকা কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জোট ভূমিধস জয়লাভ করেছে। বিশিষ্টজন ও দলীয় নেতারা এই বিজয়কে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জনগণের রায়ের প্রতিফলন এবং জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের আকাক্সক্ষার জয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই বিজয়কে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং উন্নয়নের জন্য জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশিষ্টজনরা মনে করেন, এই বিজয় দেশে বহুমাত্রিক গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে বিএনপির পক্ষে জনমত প্রকাশ করেছে। এটি দলটিকে ধারণ করে আগামীর পথচলায় অগ্রসর হতে হবে। অন্যথায় অতীতের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতের সরকারকেও জনগণের মুখোমুখী হতে হবে।
সূত্র মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই নির্বাচনকে অনেকেই দেশ গড়ার জন্য অন্যতম সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, যে কারণে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে। শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের নয়, বিরোধীদলসহ সবাইকে নিয়েই দেশ পরিচালনা করতে হবে। মানুষের নিরাপত্তা, বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধাণ্য দিতে হবে।
বিশিষ্টজনরা উল্লেখ করছেন, এই বিজয় বয়ে এনেছে বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে।এই বিজয়কে বাংলাদেশে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার নতুন সূচনা হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর হাসান মোর্শেদ বলেন, বিএনপির এ বিজয় তখনই সফল হবে, যখন ফ্যাসিবাদের সকল আচরণ তাদের মধ্যে দেখা যাবে না। দেশের অর্থনীতি, আইনের শাসন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে দলীয় লেজুড়বৃক্তি থাকবে না। তাদের এ বিজয় তখনই সফল হবে, যখন বিএনপির তাদের অঙ্গীকার গুলোর বাস্তবায়ন দেখাবে।
বিএনপির সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে এনেছে। বিএনপি তাদের কমিটমেন্ট রক্ষায় কাজ করবে। আগামী সরকার হবে জনগণের সরকার। ক্ষমতার সকল উৎসে থাকবে জনগণ। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ততা দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।
এদিকে সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই ফলাফলকে দলের নেতাকর্মীরা ঐতিহাসিক জয় হিসেবে দেখছেন। উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীরা দেশজুড়ে বিজয় মিছিল এবং আনন্দের মাধ্যমে এই ফলাফল উদযাপন করছেন। দলের নেতাকর্মীরা এই বিজয়কে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের ফসল হিসেবে দেখছেন। এছাড়া দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক সহিংসতাহীন পরিবেশে এই উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। সরেজমিনে ঢাকার গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। বিভিন্ন জেলা থেকে বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ের তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে জড়ো হওয়া নেতাকর্মীরা আনন্দ প্রকাশ করেন।
এদিকে সরকার গঠনেরও কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কেমন মন্ত্রিসভা হতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য দেশবাসীকে আর অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই নির্বাচন একটি মাইলফলক। সারা বিশ্ব এই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তিনি বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর যে গণজোয়ার আমরা দেখেছি, তাতেই পরিষ্কার ছিল যে জনগণ পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং ‘৩১ দফা’ অনুযায়ী সংবিধানের কাক্সিক্ষত সংস্কার করা হবে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।
এদিকে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, যে ভালোবাসা আপনারা দেখিয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার গুলশানের বাসভবন থেকে পবিত্র জুমার নামাজ আদায়ের জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদর দপ্তর মসজিদে যান। এ সময় তার বাসভবনের সামনে উৎসুক জনতার ভিড় জমে। নামাজে যাওয়ার আগে তিনি কিছু সময় গাড়ি থামিয়ে উপস্থিত জনতার সঙ্গে কথা বলেন। নিজের গাড়ির দরজা নিজেই খুলে কিছু মানুষের সাথে আলাপ করেন। তাদের পরিচয় জানতে চান এবং জনতার মধ্যে কেউ কেউ বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ গড়তে আমরা আপনার সঙ্গে আছি।’ এ কথার উত্তরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাদের ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, আপনারা যে ভালোবাসা আমাকে দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমার জন্য দোয়া করবেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদর দপ্তর মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ আদায় করেন।
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, যা তারেক রহমানের নেতৃত্বে। প্রায় দুই দশক পর এবার বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে তারেক রহমান পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, এ ঘোষণা ইতিমধ্যে বিএনপি দিয়েছে। তিনি ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচন করেছেন এবং দুটো আসনেই জয় লাভ করেছেন।