বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, “বিএনপি রাজনৈতিক সংকট তৈরি করছে”। তিনি বলেন, গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ জনগণের দেয়া রায় মেনে না নিয়ে বিএনপি জনগণের সঙ্গে শুধু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে না, জনগণের সঙ্গে প্রতারণাও করছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরাও গণভোটে হ্যাঁ ভোট চেয়েছে। কিন্তু গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়ার পর বিএনপি গণভোট মানে না। তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান আজকের প্রধানমন্ত্রী যদি গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়ে থাকেন তবে তিনি কেন গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে বিএনপি যেসব প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে গণভোট জয়যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নোট অব ডিসেন্ট বাতিল হয়ে গেছে। এজন্যই বিএনপির মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারা ছলে-বলে কৌশলে ফ্যাসিবাদের পথে ফিরে যেতে চায়।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোট বাতিল করার অর্থ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নিজের দেওয়া ভোটকে নিজে অস্বীকার করছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, আপনি গণভোটে “হ্যাঁ’’ ভোট দিয়েছেন নাকি “না” ভোট দিয়েছেন! যদি হ্যাঁ ভোট দিয়ে থাকেন তবে গণভোট বাতিল করার অর্থ হচ্ছে আপনি (প্রধানমন্ত্রী) নিজের দেওয়া ভোটকে নিজে অস্বীকার করছেন। তিনি আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সরকার আমাদেরকে রাজপথে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা ৭০ শতাংশ জনগণের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে এসেছি। সংসদে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিলে রাজপথেই সমাধান হবে। সরকারের যাত্রা দেখে মনে হয় সরকার ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করছে। তিনি জনগণের মুখোমুখি না হতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।”

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিকেলে দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রাজধানীর শাহবাগে গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দীন বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে একই তফসিলে দুটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের পর বিএনপি একটি নির্বাচনকে বৈধ বলছে আরেকটি নির্বাচনকে অবৈধ বলছে! বিএনপির দ্বিচারিতা আচরণ জনগণের সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতার সামিল।”

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, “বিএনপি জনগণের গণভোটের রায়কে অস্বীকার করে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন দুর্বার গতিতে চালিয়ে যেতে হবে। বিএনপি সহজ ভাষা বুঝবে না। গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপিকে বাধ্য করতে হবে।”

জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি’র যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, “বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা গণভোটে জনগণের রায় মেনে নেবে। তারা ৫১ শতাংশ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে গণভোটে ৭০ শতাংশ জনগণের রায়কে মেনে নিচ্ছে না। বিএনপি ৭০ শতাংশ জনগণের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে ৫১ শতাংশ জনগণের রায়কেও আমরা বৈধ বলতে পারি না। তিনি বিএনপিকে বিগত ১৭ বছরের কথা স্মরণ করে দিয়ে বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণ আপনাদের পক্ষে ছিল। কিন্তু আপনাদের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে আগামীতে জনগণকে পাশে পাবেন না। জনগণকে পাশে পেতে হলে গণবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিহার করে জনরায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে তিনি বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।”

ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মিনহাজ বলেন, “আমরা জনগণের কাছে ক্লিয়ার করে দিতে চাই বিএনপি কিভাবে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা রিপোর্ট বিএনপিকে জানানো হয়েছে। গণভোটের পক্ষে অবস্থান না নিলে জনগণ বিএনপিকে ভোট দেবে না। পরবর্তীতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনগণকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু তারা ক্ষমতায় গিয়ে গণভোটে ৭০ শতাংশ জনগণের রায় উপেক্ষা করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে।”

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী বলেন, “ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে উচ্ছেদ করতে জনগণ যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আজ এবং আগামীতেও কেউ ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চাইলে জনগণ আবারও একইভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নব্য ফ্যাসিবাদকে দেশ থেকে বিতাড়িত করবে।”

এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা বলেন, “শুধুমাত্র সংসদে সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে যারা ৭০ শতাংশ জনগণের গণভোটের রায় উপেক্ষা করে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে তাদের পরিণতি আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।”

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি’র (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজী বলেন, “শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতা এসে ২০১৪ সালে ফ্যাসিবাদী হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসে এক মাস হতে না হতেই ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে।”

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, “৭০ শতাংশ মানুষের গণভোটের রায় উপেক্ষা করে নতুন ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে আরেকটি ৫ আগস্টের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।”

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের পরিচালনায় গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান, বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টির সভাপতি এডভোকেট আনোয়ারুল হক চাঁন, লেবার পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নিয়ামুল বশির সহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরীর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পরে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ, রাজধানীর শাহবাগে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার লোকজনের মাঝে লিফলেট বিতরণ করেন।

উল্লেখ, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জ্বালানি সংকট নিরসনের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ৯ এপ্রিল থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে গণসংযোগ অভিযান কর্মসূচি পরিচালিত হবে।