জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যেদিন গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করা হয়েছে সেই দিনই নতুন করে আবার বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, সংসদ আমাদের জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি, সম্মান করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এই ফ্যাসিবাদের কদম কদম যাত্রা থামিয়ে দেব। আমরা এগোতে দেব না।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ৪৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে গতকাল সোমবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি(জাগপা) দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান।
সংসদের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৪৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে জাগপাকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় জীবনের প্রতিটি সংকটে সবার আগে যার দ্বরাজ কণ্ঠ শোনা যেত তিনি প্রিয় নেতা শফিউল আলম প্রধান। আমাদের আহ্বানের দাওয়াতে শামিল হয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার সেই বক্তব্যকে বিকৃত করে জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে তার বিরুদ্ধেও ধর্ম অবমাননার মামলা করেছিল। সেই মামলায় শফিউল আলম প্রধান আসামি হয়ে আদালতে উঠেছেন, জেলে গিয়েছেন, কষ্ট স্বীকার করেছেন। কিন্তু তিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। এজন্য তিনি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন।
জামায়াত আমীর বলেন, বাংলাদেশ যে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে আজকে এরকম মানুষের বড় প্রয়োজন ছিল। যিনি জোর কদমে সামনে এসে বলবে জাতির সঙ্গে যেটা করা হচ্ছে এটা অন্যায়।
তিনি বলেন, বর্তমান সংসদের প্রায় সবাই মজলুম। এর মধ্যে কেউ জেল খেটেছেন। কেউ ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছেন। আবার এর মধ্যে কেউ নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। এরকম লোকদেরকে নিয়েই আমাদের বর্তমান সংসদ। এই সংসদ যদি মজলুম জনগণের দুঃখ না বুঝে তাহলে কোন দিন কোন সংসদ বুঝবে? এটি হবে চরম লজ্জা। ৫৪ বছরের দফায় দফায় যে ফ্যাসিবাদ জাতিকে এগিয়ে যেতে দেয়নি, সেই ফ্যাসিবাদকে ২৪ এর বিপ্লবীরা ছুড়ে মেরেছিল বঙ্গোপসাগরের নর্দমায়। এখন সেই নর্দমা থেকে এটাকে তুলে আনতে চায় কারা মনে রাখা দরকার।
তিনি বলেন, এই প্রজন্ম প্রমাণ করে দিয়েছে, এ প্রজন্ম যখন জেগে উঠে তখন মাসের পর মাস আর বছরের বছর আন্দোলন করার প্রয়োজন হয় না। তখন ওদের বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্তই ফ্যাসিবাদীদের কলিজায় কাপন ধরিয়ে দেওয়ার জনই যথেষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি এই প্রজন্ম যথাযথভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এখনো তাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা তাদের সঙ্গে আছি। তারাও আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা কথা দিচ্ছি রক্তমূল্য, জীবনমূল্য, জেল মূল্য, যত মূল্য দিতে হয় ফ্যাসিবাদকে আর আমরা ফিরে আসতে দেব না। এই লড়াই কোন দলের জন্য নয়, দল বা ব্যক্তির জন্য নয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মদ জায়গায় থাকবে আর শুধু বোতল পরিবর্তন করা হবে এটা আমরা চাই না। আমাদের জেনজিরা একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে বসানোর জন্য এখানে আন্দোলন করেনি। ব্যক্তির এবং লিঙ্গের পরিবর্তন করার জন্যই যুদ্ধ করেনি। তারা লড়াই করেছে যে বন্দোবস্ত এই জাতিকে ফ্যাসিবাদের যাতাকলে পিষ্ট করেছিল সেই বন্দোবস্ত পরিবর্তনের জন্য। আমাদের লড়াই তাই।
তিনি বলেন, ন্যায় এবং ইনসাফের ভিত্তিতে একটা দেশ এবং জাতি গঠন করতে হলে একটা দলের নিজের ভেতরে আগে ন্যায় ইনসাফ এবং গণতন্ত্রের চর্চা হতে হবে। যারা নিজের দলের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারে না। যাদের নিজেদের নেতা-কর্মীদের হাতে নিজেদের নেতা-কর্মীরাই নিরাপদ নয়। তারা ১৮ কোটি মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তারা জনগণকে গণতন্ত্র উপহার দিতে পারবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কেয়ারকেটার সরকার সহজে আসে নাই। ওই রকমই আমাদের আনা বিল ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা চেয়েছিলাম সংসদে প্রতিকার, আমাদেরকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। আমরা জনগণকে নিয়েই দাবি আদায় করবো। সংসদের ভেতরে ইতিবাচক গঠনমূলক বিতর্কের অবসান চাই। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হোক। সংসদ আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি করতে সম্মান করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, ‘আমাদের রায়কে হাইজ্যাক করা হয়েছে, ডাকাতি করা হয়েছে, জনগণকে অপমান করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই তার রাজসাক্ষীও পাওয়া গেছে। হ্যাঁ, ঘুঘু বারবার আসে ধান খেয়ে চলে যেতে। কিন্তু কপাল যখন মন্দ, তখন কিন্তু জালে বেঁধে যায়। ঘুঘু তুমি একবার জনগণের ধান খেয়েছ, আবার খাওয়ার চিন্তা কোরো না। এবার এলে ঠিকই তোমার লেজ, ঠিকই তোমার পা, ঠিকই তোমার ডানা অবশ করে দেওয়া হবে।’
এরপর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বলবেন যে জনগণ আপনাদের ভোট দিয়েছে, তার প্রমাণ কী? ৭০ ভাগ জনগণ “হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেÑএটাই তার প্রমাণ। আমরা “হ্যাঁ”-এর পক্ষে ছিলাম। আমরা “হ্যাঁ”-এর পক্ষে আছি। আমরা দেখিয়ে যাব, এই সংসদ মানুক আর না মানুক, গণভোটের রায় আমরা বাস্তবায়ন করব।’
জনগণের রায় বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল সংসদ থেকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বলেন শফিকুর রহমান। গত শনিবার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এটা শুরু বলে জানান তিনি।
জামায়াত আমীর বলেন, সংসদে সরকারি দল কথা বললে মনে হয় দেশে সোনার নহর বয়ে যাচ্ছে। তবে বিরোধী দল জ্বালানিসংকট নিয়ে কথা বলতে চাইলে নোটিশ আলোচনায় আসতে দেওয়া হয় না। তারা ভয় পায়, এর মাধ্যমে জনগণের কাছে সত্য প্রকাশ পেয়ে যাবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এই মৌসুমে খামারিরা হাঁ করে চেয়ে আছেন। তাঁদের ফসলে সেচ করবেন, কিন্তু পানি নেই। এখন আবার খোলা তেলও দেয় না। কার্ড নিয়ে আসতে বলে। তাঁরা কার্ড আনবেন কীভাবেÑএমন প্রশ্ন তোলেন তিনি। দেশ খাদ্যঘাটতিতে পড়বে, বলেন তিনি।
জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করার জন্য শিশুদের স্কুল বন্ধ করে দিয়ে তাদের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমীর। তিনি বলেন, করোনার সময় পড়াশোনা ব্যাহত হয়ে অনেক শিশু ড্রপআউট হয়ে গেছে। অনেকে বিপথে চলে গেছে। এখন আবার যদি একই পথে সরকার হাঁটে, তাহলে জাতিকে অন্ধত্ব ও মূর্খতার চাদরে ঢেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে। এটা রুখে দেওয়া হবে।
জাগপার সহ-স ভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান এর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জাগপার সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবীর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাসিনুর রহমান, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য আসাদুর রহমান খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
আইনজীবী এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে সংস্কার বাস্তবায়ন করার জন্য। তবে সরকার এখন ১৬টি অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন না করার চিন্তা করছে। ১২ এপ্রিলের মধ্যে সনদ বাস্তবায়িত না করলে এর পরিণতি ভালো হবে না।
জাগপা সভাপতি তাসমিয়া প্রধান বলেন, যাঁদের রক্তের বিনিময়ে দেশে পরিবর্তন এসেছে অনেকে মন্ত্রী-এমপি হয়ে তাঁদের ভুলে গেছেন। জুলাইয়ে তরুণেরা প্রাণ না দিলে এখনো লন্ডন থেকে অনেককে দল পরিচালনা করতে হতো। জুলাইকে অস্বীকার করলে দেশের মানুষ চব্বিশের মতো আরেকটা গণ-অভ্যুত্থান করবে। সেই অভ্যুত্থানে জাগপা পাশে থাকবে।
সভাপতির বক্তব্যে জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে বলেছিল, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। এখন তারা গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল করে দিতে চায়। তারা ৫১ শতাংশ জনসমর্থন পেয়ে ৭০ শতাংশ জনসমর্থনের গণভোট বাতিল করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
আলোচনা সভার সঞ্চালক ছিলেন যুব জাগপার সভাপতি নজরুল ইসলাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম অলিউল আনোয়ার।