জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া ‘হারাম’—হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী (বাবুনগরী) এর সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে এই বক্তব্য ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ফতোয়ার সার্বজনীনতা, আলেম সমাজের ভূমিকা এবং দ্বীনের নামে রাজনীতির ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন দেশের বিশিষ্ট আলেম ও জনপ্রিয় বক্তা মাওলানা আব্দুর রহিম আল মাদানী।

নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে মাওলানা আব্দুর রহিম আল মাদানী বলেন, ফতোয়া যদি দ্বীনের বিজয় ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার না হয়ে কোনো ফাসিক বা জুলুমবাজ শক্তিকে ক্ষমতায় নেওয়ার মাধ্যম হয়, তাহলে সেই ফতোয়া তার গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলে।

তিনি বলেন, যদি কোনো ‘গোমরাহ’ বা আদর্শগতভাবে ভ্রান্ত দলকে ভোট দেওয়া হারাম হয়, তাহলে সেক্যুলার ও কুফুরি আকিদায় বিশ্বাসী শক্তিকে ভোট দেওয়া তো আরও বড় অপরাধ বা ‘ডাবল হারাম’ হওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে—গত ১৬ বছর ধরে এমন শক্তির শাসনামলে আলেম সমাজ কেন নীরব ছিল?

মাওলানা আব্দুর রহিম আল মাদানী বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এই সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড, জুলুম-নির্যাতন ও খোদা দ্রোহীতার অসংখ্য নজির দেখা গেছে। গুম, খুন, হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও রাহাজানি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। হাজার হাজার আলেম-ওলামাকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে, রিমান্ডে নির্যাতন করা হয়েছে, মসজিদ-মাদরাসা থেকে উৎখাত করা হয়েছে, ওয়াজ মাহফিলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং মঞ্চ থেকে নামিয়ে গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে।

নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকেও একটি ওয়াজ মাহফিল থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করা হয় এবং মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি করা হয়। অথচ সেই সময় এসব জুলুম ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া হারাম—এমন কোনো ফতোয়া আলেম সমাজের পক্ষ থেকে আসেনি, এমনকি তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর অবস্থানও দেখা যায়নি।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা চরম জুলুম, নির্যাতন ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের সময় নীরব ছিলেন, তারা আজ আদর্শগত অমিলের অজুহাতে কোনো নির্দিষ্ট দলকে ভোট দেওয়া হারাম ঘোষণা করার নৈতিক অধিকার রাখেন কি না।

পোস্টের শেষাংশে মাওলানা আব্দুর রহিম আল মাদানী বলেন, ফতোয়া অবশ্যই সার্বজনীন, ন্যায়ভিত্তিক ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। ব্যক্তি, দল বা রাজনৈতিক স্বার্থে ফতোয়া ব্যবহৃত হলে তা দ্বীনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। তিনি দোয়া করে বলেন, “ফতোয়া যেন দ্বীন বিজয়ের হাতিয়ার হয়, কোনো ফাসিক শক্তির ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম না হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ভুলত্রুটি থেকে হেফাজত করুন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন।”

উল্লেখ্য, হেফাজতে ইসলামের আমির বাবুনগরীর পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া হারাম—এমন বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। মাওলানা আব্দুর রহিম আল মাদানীর প্রকাশ্য ও স্পষ্ট অবস্থান এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং আলেম সমাজের নিরপেক্ষতা, দায়িত্ব ও ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

প্রসঙ্গত, একজন আলোচিত ইসলামী বক্তা হিসেবে মাওলানা আব্দুর রহিম আল মাদানীর ব্যাপক সুখ্যাতি রয়েছে। তিনি গাজীপুর মহানগরীর বোর্ডবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সাবেক খতিব ছিলেন। সত্য, ন্যায় ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হওয়ার কারণে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলেন এবং একটি ওয়াজ মাহফিল থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।