বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংসদের ভেতরে যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে পারব, কথা বলতে পারব, ততদিন সংসদে থাকব। লড়তে না পারলে, কথা বলতে না পারলে এক মিনিটও থাকব না। যখনই বিএনপি সরকার গুম ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ, দুদক অধ্যাদেশ, পুলিশ অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করেছে, তাৎক্ষণিক আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে ঘৃণার সঙ্গে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি। ফ্যাসিবাদের পক্ষে বিএনপি দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়ায় আমরা এক মুহূর্তের জন্যও সংসদে থাকিনি; সঙ্গে সঙ্গে ওয়াকআউট করেছি। সংসদে টু-থার্ড ক্ষমতাবলে বিএনপি গায়ের জোরে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করে বিএনপি নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার নিজেরাই লঙ্ঘন করেছে।
গতকাল রোববার সকালে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ-এর মুক্তিযোদ্ধা হলরুমে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেনের যৌথ পরিচালনায় মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নেয়ামুল বসির, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রমুখ।
আমীর জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগামীতে চূড়ান্তভাবে পরাজয় হবে ফ্যাসিবাদের, বিজয় হবে জনগণের। সেই চূড়ান্ত আন্দোলনের জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এক পা কেটে ফেলার পরও জুলাই যোদ্ধার অনুভূতি- প্রয়োজন হলে পুরো শরীরই দেবো! কিন্তু জুলাই কাউকে ছিনিয়ে নিতে দেবো না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই সনদকে সরকার উপেক্ষা করছে। সরকারের প্রতি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম গণভোটও সংবিধানে ছিল না। সংবিধান যদি জনগণের জন্য হয়, তবে জনগণের ম্যান্ডেট মেনেই সংবিধান সংস্কার করতে হবে। গণভোটে ৭০ শতাংশ জনগণের রায় মেনে জুলাই সনদ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের পক্ষে কাজ করলে আমরা সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করব। কিন্তু সরকার জনগণের বিপক্ষে গেলে আমাদের ফাঁসিতে ঝুলালেও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে আমরা পিছু হটব না।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ কার্যত ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এ দেশে খুনের রাজনীতি শুরু করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তারা খুন, গুম, গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু টিকে থাকতে পারেনি। আওয়ামী লীগের পর নতুন করে যারা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে, তাদের পরিণতি আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়াবহ হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, বাংলাদেশকে সংস্কারের মাধ্যমেই পরিবর্তন করতে হবে। সংস্কারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপি সরকার। আমরা মনে করি, জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা জুলাইকে রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করিনি, করবও না। বিএনপি জুলাইকে রাজনৈতিক ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। সরকার নিজেদের কাজের বৈধতার জন্য কখনো একাত্তর, কখনো চব্বিশকে ব্যবহার করছে। বিএনপি কোনো আন্দোলনে ছিল না; তারা কেবল আন্দোলনের ফসল ভোগ করেছে। বিএনপি জুলাই সনদ কিংবা নিজেদের ইশতেহারের ৩১ দফার কোনোটিই পালন করছে না। যার কারণে তারা সর্বস্তরে দলীয়করণের মিশনে নেমেছে। তারা সংস্কারের কথা মুখে বললেও কাজে তার কোনো প্রমাণ নেই; বরং তারা ফ্যাসিবাদী শাসনের সকল কালো আইন-কানুন ও নিয়মনীতি বহাল রাখতে উঠেপড়ে লেগেছে। আজকের এই মতবিনিময় আমাদের করণীয় নির্ধারণের জন্য। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পরামর্শে আমরা তা নির্ধারণ করতে পেরেছি। আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজপথে নামব। এবার আংশিক নয়, পরিপূর্ণ সফলতার জন্যই রাজপথে নামব।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি সরকার কর্তৃক সৃষ্ট চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করার লক্ষ্যে আজকের এই মতবিনিময় সভা। আজ শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের যে অনুভূতি প্রকাশ করেছে, তাতে আমাদের করণীয় নির্ধারণ সহজ হয়েছে। আমরা জাতির স্বার্থে আপসহীনভাবে নিঃস্বার্থ ভূমিকা অব্যাহত রাখব। এজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসে জাতির সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নব্য ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। আমরা চলমান সংকট সংসদে সমাধান চাই, কিন্তু সরকার সেই উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির স্বার্থে করণীয় নির্ধারণে আজকের এই মতবিনিময় সভা। এখান থেকে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা যেভাবে চাইবে, ১১ দলীয় ঐক্য সেভাবেই করণীয় নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বাংলাদেশে যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা না হয়, সেজন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। বিএনপি ৭০ শতাংশ জনগণের রায় মেনে না নিলে আমরাও বিএনপি সরকারকে মেনে নেব না।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, জুলাই যোদ্ধাদের অসম্মান করেছে। তিনি বলেন, দিল্লির পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগের অসমাপ্ত কাজ বিএনপি করতে যাচ্ছে। বিএনপিকে দিল্লির পরিকল্পনায় বাংলাদেশে কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান বলেন, যে প্রত্যাশা নিয়ে জুলাই অর্জিত হয়েছে, সরকার তা মুছে দিতে চায়। সরকার সভ্যতাকে মুছে দিতে চায়। আজকের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি নিজের ইচ্ছায় দেশে আসতে পারছেন না। অথচ এখন তাকে সংসদে বসে পত্রিকা পড়তে ও মোবাইল টিপে সময় কাটাতে দেখা যায়। এর অর্থ, প্রধানমন্ত্রী কার্যত সরকার পরিচালনা করছেন না; সরকার পরিচালিত হচ্ছে অন্য কোনো শক্তির দ্বারা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বলেন, জুলাই সনদে ৮৪টি প্রস্তাব ছিল, যার মধ্যে ১০টিতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যে ২০টি বিএনপি বাতিল করেছে, সেগুলো অন্যান্য অধ্যাদেশের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখনই বিএনপি গুম, দুদক ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে বিএনপিও আওয়ামী লীগের মতোই একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা বহাল রাখতে চায়। তিনি বিএনপিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিরোধী দলের জন্য কবর খুঁড়তে যাবেন না- সেই কবরে আপনাদেরই আগে ঢুকতে হবে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার বলেন, বিগত ১৭ বছর ধরে নির্যাতিত বিএনপি ক্ষমতায় বসেই সব ভুলে গেছে। আজকের বিএনপি শহীদ জিয়ার বা বেগম জিয়ার বিএনপি নয়; বরং এটি ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভাষায় কথা বলছে। আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী বলেন, সরকার জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় এলেও তাদের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছে না। সরকার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পথ ছেড়ে না এলে রাজপথে নামতে আমরা বাধ্য হব। খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সরকার সংসদে উদ্যোগ না নিলে রাজপথেই সমাধান করতে হবে। এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুল্লাল আল মামুন বলেন, বর্তমান সরকার নতুন নামে ও নেতৃত্বে আবার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
শহীদ আলিফের পিতা গাজীউর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ যা করতে ২ বছর নিয়েছিল, বিএনপি তা দুই মাসেই করেছে। জুলাইয়ের স্লোগান ছিল “উই ওয়ান্ট জাস্টিস (আমরা ন্যায়বিচার চাই)”, কিন্তু সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রধান বিচারপতি ও চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দিয়েছে। আরেকটি স্লোগান ছিল “কোটা না মেধা, মেধা মেধা”; অথচ বর্তমান সরকার মেধা ও কোটা- দুটোই উপেক্ষা করে পরিবারতন্ত্র কায়েম করছে।
শহীদ মেহেরুন নেছার পিতা মোশারফ হোসেন স্পিকারের সমালোচনা করে বলেন, স্পিকার একাত্তরের যোদ্ধা, আর হাসনাত আবদুল্লাহরা জুলাই যোদ্ধা। তিনি জুলাই যোদ্ধাদের কারণেই স্পিকার হতে পেরেছেন। তাই জুলাই যোদ্ধাদের অসম্মান করে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে স্পিকারসহ সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের সতর্ক করেন। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সংসদ সচিবালয় ঘেরাও করা হবে। শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ বলেন, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নতুন বাংলাদেশ গড়া। সেই স্বপ্ন ও চেতনার প্রতিফলন রয়েছে জুলাই সনদে। কিন্তু তা উপেক্ষা করে পুরোনো ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আমরা মেনে নিতে পারি না। জুলাই যোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গণভোটে জনগণের রায় পাওয়ার পরও বিএনপি তা মানছে না। জুলাই সনদ থেকে একটি দাঁড়ি বা কমাও বাদ দেওয়া যাবে না।
জুলাই যোদ্ধা কামরুল আহসান গণভোট, গুম ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিলের তীব্র নিন্দা জানান। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন শেখ জামাল হোসেন, সানজিদা খানম দ্বীপ্তি, লাখী বেগম, শহিদুল ইসলাম, কবির হোসেন, তাজুল ইসলাম প্রমুখ। তারা বলেন, আমরা আমাদের সন্তানের রক্তের বিনিময়ে ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে আমরা পরিবারসহ রাজপথে নামব।