মহিব্বুল আরেফিন, রাজশাহী : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দলীয় সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থী বাছাই এবং স্থানীয় ইস্যুর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত একাধিক জনমত জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্নমাত্রার চিত্র। জরিপে দেখা গেছে, রাজশাহীর ৬টি আসনের মধ্যে ১, ৩ ও ৫ নম্বর আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এগিয়ে রয়েছে, ৬ নম্বর আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। অপরদিকে ২ ও ৪ নম্বর আসনে লড়াই হতে যাচ্ছে হাড্ডাহাড্ডি, যেখানে শেষ মুহূর্তের কৌশল ও ভোটার উপস্থিতিই নির্ধারণ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।

রাজশাহী বিএনপি এবং জামায়াতের ঘাঁটি বলে দেশব্যাপী পরিচিত। তবে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ৯ম সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনের সবকটিতে জয় পান আওয়ামীলীগসহ ১৪ দলীয় জোট। আর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের নির্বাচনে পাঁচটি আসনের সবকটিতেই জয় পায় বিএনপি ও চারদলীয় জোট। এর আগে ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি, একটিতে আওয়ামীলীগ ও একটিতে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) জয় পান। এছাড়া ২০১৪ ও ২০২৪ সালের দশম ও দ্বাদশ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে করে একতরফা জয় পায় আওয়ামীলীগ ও তার সমর্থিত প্রার্থীরা। তবে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাঠের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। গত কয়েক সপ্তাহে রাজশাহী মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক, বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিবর্গসহ তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশান মানুষের সাথে আলাপ করা হয়। মতামত প্রদানকৃতদের মধ্যে শহর ও গ্রামাঞ্চল উভয় এলাকার ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করে বয়স, পেশা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। জনজরিপে ভোটারদের কাছে দলীয় পছন্দ, প্রার্থী গ্রহণযোগ্যতা, বিগত সময়ের কর্মদক্ষতা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। এদিকে রাজশাহীর সংসদীয় ৬টি আসনেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামায়াত। বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী), রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর), রাজশাহী-৪ (বাগমারা), রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) এই ৪টি আসনে তীব্র হয় দলীয় কোন্দল। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে স্থানীয় বিএনপির ৪টি আসনের নেতা-কর্মীরা মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এমন কি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিপর্যস্থ অবস্থায় পড়ে বিএনপি। এদিকে হাইকমান্ডের নির্দেশে বিদ্রোহী প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখনও প্রকট অবস্থায় রয়েছে।

রাজশাহী-১: জামায়াতের শক্ত অবস্থান

রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনে জনমত জরিপে জামায়াতে ইসলামী স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে। এ অঞ্চলে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সংগঠিত কর্মী নেটওয়ার্ক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তার কারণে দলটির প্রতি ভোটারদের আস্থা তুলনামূলক বেশি। এখানে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৮৬ সালে এ আসনে এ আসনে বিজয়ী হন। আর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ২৫ হাজার ৯১৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। এখানে ২০১৮ সালে মোট ভোটার সংখ্যা ছিলো ৩লাখ ৮৩ হাজার ৩৫২, ২০২৩-২৪ সালে ৪ লাখ ৪০ হাজার ২১৮ জন এবং এবার বৃদ্ধি পেয়ে ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬২ জন। যা বছরের তুলনায় ২৮ হাজার ১শ ৪৪ ভোটার বৃদ্ধি হয়েছে। এক হিসেবে দেখা যায় নতুন ভোটার সংখ্যা ২৮ হাজারের অধীক। এই নতুন এবং তরুণ ভোটারা আগামী নির্বাচনে যথেষ্ট প্রভাব রাখবে বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রাপ্ত তথ্য উপাত্বে উঠে এসেছে। জন জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের বড় একটি অংশ জানিয়েছেন, স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের প্রার্থী নিয়মিত জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। বিএনপির নতুন প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিন মনোনয়ন পান। এই আসনে আরো নেতৃবৃন্দ দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এমন কি বিদ্রোহী হিসেবে গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সদস্য এ্যাডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেক মনোনয়ন উত্তলোন করেন। এখানে শক্ত অবস্থান থাকলেও দলীয় কোন্দলে বিএনপি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এখানে শরীফ উদ্দিন এবং তারেকের অনুসারীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ ঘটে। গত ২৭ মার্চ দলীয় ইফতার কর্মসূচি শেষে দুই পক্ষের তীব্র সংঘর্ষ হয়। এতে বিএনপি কর্মী গণিউল হক এবং কৃষক দল নেতা নেকশার আলী ২ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনার জের এখনও চলমান রয়েছে। এদিকে সাধারণ ভোটারা দুর্নীতি মুক্ত ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে জামায়াত প্রার্থীদের ভোট দেবার কথা ব্যক্ত করছেন। তানোর-গোদাগাড়ী অঞ্চলের ভোটারদের সাথে আলাপ করে দেখা গেছে, রাজশাহীর ৬টি আসনের মধ্যে এই আসনটি সবচেয়ে সম্ভাবনায় অন্যতম একটি আসন।

রাজশাহী-২ (সদর) : হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

রাজশাহীর সংসদীয় আসনের মধ্যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন রাজশাহী-২ (সদর)। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় উপস্থিতির কারণে জাতীয় রাজনীতিতেও এই আসনের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। জনজরিপ বলছে, এখানে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমানে সমান লড়াই হবে। নগর ভোটারদের একটি অংশ উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, আবার একটি অংশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। তরুণ ভোটার ও পেশাজীবীদের ভোট এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শেষ পর্যন্ত প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ এবং ভোটের দিন উপস্থিতিই ফলাফল নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী বেগম জিয়ার উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র-এমপি মিজানুর রহমান মিনু। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মিনু কিছুটা চাপে থাকলেও দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় রাজনীতিতে মিনুর ‘ক্লিন ইমেজ’ এবং অভিজ্ঞতা আসনটিতে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। তবে দলের ভেতর তার বিরুদ্ধে চাপা বিরোধীতা কাজ করছে বলে জানা গেছে। তথ্যমতে বিএনপির বড় একটি অংশ মিনু পক্ষে ভোটের মাঠে চুপচাপ রয়েছেন। এতে করে বাড়তি সুবিধায় রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও মহানগরীর নায়েবে আমির ডাঃ মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আসনটিতে নগরভিত্তিক শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত ভোটারের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি। তরুণ ভোটার, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং নারী ভোটার এখানে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি এবার জুলাই বিপ্লবসহ নাগরিক ইস্যু, দলীয় কোন্দল এবং আওয়ামীলীগের ভোট ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সাথে দেশের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ভোটারদের রাজনৈতিক ধারা ও ইস্যু ভিত্তিক মনোভাবের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। পাশাপাশি ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তা, সংগঠনের শক্ত অবস্থান এবং সাম্প্রতিক জনমত বিবেচনায় এবারের নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যেই হাড্ডা-হাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) : জামায়াতের এগিয়ে থাকা

রাজশাহী-৩ আসনটি ২০০৮ সালে সিটি করর্পোরেশনের উপকণ্ঠ পবা ও মোহনপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানে ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার ৯শ’ ৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ দু’লাখ ৭ হাজার ৮০, মহিলা দু’লাখ ৯ হাজার ৮শ’ ২৪ ও থার্ড জেন্ডার ৫ জন। বিগত ১২টি নির্বাচনের বিতর্কিত ৬টি নির্বাচনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী। এছাড়া বিএনপি চার বার এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী দু’বার নির্বাচিত হয়। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটিতে এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিএনপি প্রার্থী মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা-কর্মীদের অসন্তোষ আর অসহযোগীতায় দলীয় ভাবে বেকায়দায় রয়েছেন। আবার এখানে নগর ও গ্রামের দুই ধরনের ভোটারের সমন্বয় রয়েছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, সরকারি চাকরিজীবী ও কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এখানে উল্লেখযোগ্য। অতীতের নির্বাচনেগু ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি এবং দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদিক থেকে এখানে জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং মাঠপর্যায়ের অবস্থা জামায়াতকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মনোনয়ন দিয়ে জামায়াতে ইসলামী কৌশলগত ভাবে শুরুতেই এগিয়ে রয়েছে। জামায়াত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ গত ২৭ বছর ধরে টানা হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দ্বায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর কাশিয়াডাঙ্গা থানা শাখার সুরা কর্মপরিষদ সদস্য। বিগত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির সরকারের আমলে উভয় দলের নানা কৌশল ও কারিশমা কখনো অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদকে জনতার রায় বঞ্চিত করতে পারেননি। যার কারণে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ জামায়াতের বিপক্ষে অভ্যন্তরীণ চাপে থাকা বিএনপির আসনটির জয় নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আর নিরপেক্ষ ভোটারদের বড় অংশ জামায়াতের প্রার্থীকে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য মনে করছেন।

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) : অনিশ্চিত সমীকরণ

রাজশাহীর সবচেয়ে আলোচিত আসন এটি। এক সময়ের ‘রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত বাগমারা আসনটি ২০০৮ সালে গঠিত হয়। এর আগে মোহনপুর-বাগমারা উপজেলা নিয়ে ছিল রাজশাহী-৩ সংসদীয় আসন। উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌর এলাকা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৪। ভোটার সংখ্যা ৩ লক্ষ ৫৪ হাজার ৬ শ ৬৪। এ নির্বাচন ঘিরে শুরু থেকেই এখানেও বিএনপির তৃণমূল বিভক্ত। বিএনপি মধ্যে বিভক্ত আর ভাঙনের লাভবান হয়েছে জামায়াত। আবার দলীয়ভাবেই বিএনপি প্রার্থী ডি এম জিয়াউর রহমান ও ভাই আউচপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাফিকুল ইসলাম শাফির বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির অসংখ্য অভিযোগ উঠায় স্থানীয়রা। স্থানীয় বিএনপির একাংশের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেই বাগমারা বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ দখলবাজিতে নামে। উপজেলা জুড়ে চলছে পুকুর দখলের মহোৎসব। এসব মিলিয়ে চাপে রয়েছেন তিনি। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজশাহী-৪ আসনে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত। জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হতে যাচ্ছে। কৃষিভিত্তিক এই এলাকায় সেচ, সার, ফসলের ন্যায্যমূল্য ও কর্মসংস্থান প্রধান ইস্যু। ভোটারদের একাংশ বলছেন, যিনি এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারবেন, তিনিই সুবিধা পাবেন। এখানে কোনো দলই এখনো নিরঙ্কুশ সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। দেখা যাচ্ছে, নারী এবং আওয়ামীভোটারদের উপর নির্ভর করছে আগামী জনপ্রতিনিধি কে হবেন?

রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) : জামায়াতের প্রাধান্য

বিগত ১২টি নির্বাচনের মধ্যে এই আসনে আ’লীগ ছ’বার, বিএনপি পাঁচবার এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী একবার নির্বাচিত হয়। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা কমিটির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল। এই আসনেও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ছিলো ছড়াছড়ি। আর সে সাথে রয়েছে দলীয় বিভক্তি। এখনকও বি্েনপির বড় একটি অংশ মাঠে নিশ্চুপ রয়েছে। দেখা গেছে, বিএনপি এখানে ভোটের দৌড়ে থাকলেও দলীয় বিভাজন ও মাঠে কর্মী সক্রিয়তার ঘাটতি তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ ভোটারগণ বলছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা। তারা দলীয় কোন্দলের রাজনীতি নয় বরং এমন একজন জনপ্রতিনিধি চান যিনি নির্বাচিত হয়ে দল বা গোষ্ঠীর নয়, সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবেন। এখানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ নির্মূলে সোচ্চার তরুণ ভোটাররা। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আবারো প্রতিষ্ঠিত হোক গণতন্ত্র এমনই প্রত্যাশা তাদের। সার্বিক পর্যালোচনা দেখা যায়, রাজশাহী-৫ আসনে জনমতে জামায়াত এগিয়ে রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক কাজ এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা দলটিকে এগিয়ে দিয়েছে।

রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) : বিএনপির শক্ত ঘাঁটি

রাজশাহী-৬ আসনে বিএনপি তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তঘেঁষা এই এলাকায় কৃষক ও শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন ঐতিহাসিকভাবেই বেশি। ভোটাররা জানিয়েছেন, সরকারবিরোধী মনোভাব ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা এখানে বিএনপিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। জামায়াত দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও ব্যবধান এখনও কাটিয়ে ওঠার মতো রয়েছে। এ আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন আবু সাঈদ চাঁদ। এখানে জামায়াতে ইসলামীর কাছে বিএনপি দল হিসেবে নয় বরং ব্যক্তি চাঁদ মূল ফ্যক্টর হয়ে আছে। অপর দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী নাজমুল হক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ। জামায়াত এখানে তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করে এগোচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির ভেতরের বিভক্তি বাড়লে জামায়াতের ভোট এককভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটারদেও মতামতে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কৃষিপণ্যের দাম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তরুণ ভোটাররা পরিবর্তন ও স্বচ্ছ রাজনীতির কথা বলছেন আর প্রবীণ ভোটাররা স্থিতিশীলতা ও অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজশাহীর আসনগুলোতে এবারের নির্বাচন একতরফা নয়। জামায়াত ও বিএনপি উভয় দলের জন্যই সুযোগ এবং ঝুঁকি রয়েছে। শেষ মুহুর্তের প্রচারণা, স্থানীয় দলীয় সমীকরণ এবং ভোটার উপস্থিতিই ফল নির্ধারণ করবে। সব মিলিয়ে জনমতে দেখা গেছে, রাজশাহীর ছয়টি আসনে একটি বহুমাত্রিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আভাস মিলছে। ১, ৩ ও ৫ আসনে জামায়াত এগিয়ে থাকলেও ২ ও ৪ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং ৬ আসনে বিএনপির শক্ত অবস্থান নির্বাচনকে করে তুলছে উত্তেজনাপূর্ণ। এখন সকলের নজর থাকছে শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক কৌশল ও ভোটার সিদ্ধান্তের উপর। তবে প্রতিটি আসনের ভোটাররা প্রত্যাশা করছেন, দলীয় কোন্দলের রাজনীতি নয় বরং এমন জনপ্রতিনিধি চান যিনি নির্বাচিত হয়ে দল বা একটি গোষ্ঠীর নয় বরং সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবেন।