আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মানিকগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সেক্রেটারি এস এ জিন্নাহ কবীর একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি ‘ভোট না দিলে সংখ্যালঘুদের দেশ ছাড়া করার হুমকি’ সংবলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এছাড়া জেলাজুড়ে ‘কনসার্ট’ করার ঘোষণা দিয়েও আলেম সমাজের তোপের মুখে পড়েছেন তিনি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে জিন্নাহ কবীরকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশ্যে চরম আপত্তিকর মন্তব্য করতে শোনা যায়। ভিডিওতে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে তিনি বলেন, আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—যদি আওয়ামীলীগার কেউ থাকেন এবং সনাতনী ধর্মের যারা রয়েছেন, আগামীতে যদি ভোট না দিয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ না দেন, আমি জিন্নাহ বলে যাচ্ছি, আপনারা কেউ এই বাংলার মাটিতে বসবাস করতে পারবেন না, এই বাংলার কোনো স্বাধীনতা থাকবে না!
তাঁর এই সাম্প্রদায়িক ও উসকানিমূলক মন্তব্য কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, বরং জাতীয় পর্যায়েও তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার জন্ম দিয়েছে।
কেবল সংখ্যালঘুদের হুমকিই নয়, এর আগে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে জিন্নাহ কবীর ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি মানিকগঞ্জ জেলাকে ‘কনসার্টে কনসার্টে ভরিয়ে দিবেন’। তাঁর এমন সস্তা বিনোদননির্ভর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি মানিকগঞ্জের স্থানীয় আলেম-ওলামা এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
আলেমদের মতে, এটি কেবল এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থীই নয়, বরং একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর কাছে উন্নয়নমূলক বা গঠনমূলক আলোচনার বদলে এমন অপসংস্কৃতির প্রসার কোনোভাবেই কাম্য নয়। ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা একে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে, জিন্নাহ কবীরের এই অবিবেচক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে অপপ্রচারের নতুন সুযোগ পেয়েছে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি। জিন্নাহ কবীরের এই মন্তব্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নানা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ।
শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী তিলোত্তমা শিকদারের মতো ব্যক্তিরা এই ভিডিও শেয়ার করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি ‘অস্থিতিশীল ও সংখ্যালঘু নিপীড়ক’ রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন।
শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের ভেরিফাইড পেজ এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি তিলোত্তমা শিকদার ভিডিওটি শেয়ার করে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করছেন যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একে "সংবিধান ও গণতন্ত্রবিরোধী ভয়ংকর বক্তব্য" হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন যে, ভোট দেওয়া নাগরিকের মৌলিক অধিকার, সেখানে এমন ‘দেশছাড়া’ করার হুমকি সরাসরি সংবিধান ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের মন্তব্যের ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
সাঈদ খান নামে এক ব্যাক্তি লিখেছেন, মানবাধিকার আজকে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! এখানে মব জাস্টিস সাজিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি জুলুম নির্যাতন করা হচ্ছে!
আরেক ব্যাবহারকারী লিখেছেন, মানিকগঞ্জ-১ আসনের মনোনীত প্রার্থী জিন্নাহ কবিরের বক্তব্য সরাসরি হুমকি ও সাম্প্রদায়িক উসকানি। বাংলাদেশ কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি কর্মীরা বলেন, এসব মন্তব্যের জন্য দলের ক্ষতি হচ্ছে। আশা করি সিনিয়র লিডাররা ব্যবস্থা নেবেন। এসময়, মানিকগঞ্জের একাধিক বিএনপি নেতা জিন্নাহ কবীরের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মানিকগঞ্জের একাধিক বিএনপি নেতা অভিযোগ তুলেছেন যে, জিন্নাহ কবীরের সাথে বসুন্ধরা গ্রুপ এবং বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির গোপন সখ্য রয়েছে। বিশেষ করে স্বৈরাচার পতনের পরেও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহচরদের আত্মীয়দের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ ও মেলামেশার সংবাদ স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। তাঁদের দাবি, তাঁর বলয়ে এখনো আওয়ামী ঘরানার লোকজনের আধিপত্য রয়েছে এবং তাঁর বর্তমান উসকানিমূলক বক্তব্যগুলো দলের ক্ষতি করতে পারে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সুশীল সমাজ ও সচেতন মহল মনে করেন, রাজনৈতিক বক্তব্যে শিষ্টাচার রক্ষা করা বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশে অত্যন্ত জরুরি। জিন্নাহ কবীরের মতো প্রার্থীরা যদি এভাবে দায়িত্বহীন ও উসকানিমূলক কথা বলেন, তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেমন নষ্ট করে, তেমনি ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র করার রসদ জুগিয়ে দেয়।
তারা বলেন, বক্তব্য বিকৃত হোক বা না হোক, একজন দায়িত্বশীল প্রার্থীর মুখে এমন কথা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
বিশিষ্টজনেরা আহ্বান জানিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে দেশকে আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত করার চক্রান্ত রুখতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আরও সতর্ক, ধৈর্যশীল এবং দূরদর্শী হওয়া প্রয়োজন।