ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আজ মঙ্গলবার শপথ নিতে যাচ্ছেন। সেই সাথে নতুন সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্যরাও শপথ নেবেন। তবে কারা মন্ত্রীসভায় স্থান পাচ্ছেন তা জানানো হয়নি। সংসদ সদস্যগণ এমপি পদের দায়িত্বের শপথের পর সংবিধান সংস্কার কাউন্সিলের শপথও নেবেন বলে জানা গেছে। আজ সকাল দশটায় সংসদের শপথ কক্ষে এমপিদের এবং বিকেলে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের শপথ পাঠ করানো হবে। মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনদের দাওয়াত দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক স্মারক পত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। ওই পত্রে জানানো হয়, মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সংসদ সচিবালয়ের শপথ গ্রহণ কক্ষে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। এর মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু হবে।
পত্রে জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের যাবতীয় প্রস্তুতি এরইমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সংসদ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুলিপি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), সব মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি), বিজিবি, র্যাব ও কোস্টগার্ডসহ সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মহাপরিচালকরা।
সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের উপস্থিতিও এই অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণত আগের সংসদের স্পিকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গত ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেননি।
সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নতুন স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত আগের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য করা হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে তাদের মাধ্যমে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন সম্ভব না হওয়ায় বিকল্প সাংবিধানিক বিধান কার্যকর হচ্ছে।
সংবিধানের ১৪৮(১) ও ১৪৮(২) অনুচ্ছেদে স্পিকার বা তার মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শপথ পাঠের বিধান থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হচ্ছে ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদ।
এতে বলা হয়েছে, গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তার মনোনীত কেউ শপথ পড়াতে না পারলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাতে পারবেন।
এছাড়া সংবিধানের তফসিল-৩ অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়েই দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়ানোর ক্ষমতা রাখেন।
নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়ে নাসিমুল গনি বলেন, মঙ্গলবার সকালে দুই দফায় সংসদ সদস্যদের শপথ হবে। প্রথমে তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন, পরে সংস্কার সংক্রান্ত শপথ নেবেন। বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ হবে। সেটার ব্যবস্থা করার জন্য এই মুহূর্তে ক্যাবিনেট ডিভিশন উঠেপড়ে লেগেছে।
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম কবে প্রকাশ করা হবেÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি নির্ভর করবে যিনি নতুন প্রধানমন্ত্রী হবেন তার সিদ্ধান্তের ওপর। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। যখন নির্দেশনা আসবে, তখনই নামগুলো জানানো হবে।’
মন্ত্রিসভা কত সদস্যের হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য নেই। কতজনের মন্ত্রিসভা হবে, সেটা রাজনৈতিক নেতৃত্বই ভালো জানেন। আমাদের প্রস্তুতি থাকে, পরে কম-বেশি হতে পারে।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকা পাওয়ার পর তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করতে হয়। গাড়ি, দেহরক্ষী, বাসভবন, নিরাপত্তা, দফতর অবহিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয় দেখতে হয়।
সরকার প্রস্তুত কি নাÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার সব সময় প্রস্তুত থাকে। সরকার ফেল করে না।’
এদিকে প্রথমবারের মতো দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে এবার নতুন সরকারের শপথ বঙ্গভবনের বাইরে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এদিন শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে জোরদার করা হচ্ছে দক্ষিণ প্লাজার পাশাপাশি পুরো সংসদ ভবন এলাকায়।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে পরিচ্ছন্ন কর্মীদেরও। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রয়োজনে অন্য কোনো স্থানে অতিরিক্ত ক্যামেরা স্থাপন করলেও সেগুলোর মনিটরিং করছেন নিরাপত্তায় নিয়োজিত দায়িত্বশীলরা। এছাড়া সংসদ ভবন এলাকায় সব সময় গোয়েন্দা পুলিশ ডিউটি করে থাকে পাশাপাশি শপথ অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে গোয়েন্দা পুলিশের বাড়তি নজরদারিতে ঢাকা আছে পুরো সংসদ ভবন এলাকা, এমনটাই জানিয়েছেন একটি সূত্র পাশাপাশি অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীরা তো আছেই।
গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সংসদ ভবন এলাকাজুড়ে ছিল ব্যাপক কর্মব্যস্ততা। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে ভবনের ভেতরে ও বাইরে চলছে জোরদার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রস্তুতি। দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় নতুন করে বসানো হচ্ছে সিসি ক্যামেরা, যা স্থাপনের কাজে র্যাব–এর সদস্যদের সক্রিয়ভাবে কাজ করতে দেখা যায়। একই সঙ্গে দক্ষিণ প্লাজার সামনে দেশীয় গণমাধ্যমকর্মীদের পাশাপাশি বিদেশী সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ হয়। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট গ্রহণ স্থগিত রয়েছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে দুটি আসনে জয়ী বিএনপির প্রার্থীর ফলাফল প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নির্বাচনে বিএনপি জোট ২১২ আসনে জয় পেয়েছে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। আজ ১৯৭ সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানো হবে।