সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে কাল মঙ্গলবার গঠিত হচ্ছে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা। প্রথমে সংসদ সদস্যদের শপথের পর নতুন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথ পড়ানো হবে। নতুন মন্ত্রিপরিষদের যাত্রা শুরু হলে তাদের কর্মকাণ্ডে নজর থাকবে বিভিন্ন দিকে থেকে।
নতুন মন্ত্রীদের কর্মাকাণ্ডে নজর রাখতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানালেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।
গতকাল রোববার সকাল ১০টা ১৬ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ এ তথ্য জানান। আসিফ মাহমুদ তার পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ কী হবে, তা আসিফ মাহমুদ তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।
এর আগে শনিবার রাতে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরও ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি নিজের ফেসবুক আইডিতে লেখেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করব, ইনশাআল্লাহ।’
এ বিষয়ে মোহাম্মদ শিশির মনির রোববার সকালে আরেক পোস্টে বলেন, ‘রাজনীতিতে নতুনত্ব আনুন। সরকারিদল মন্ত্রিসভা গঠন করুক। বিরোধীদল ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করুক। সংসদের ভিতরে-বাহিরে তুমুল বিতর্ক হউক। তবেই সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।’
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ হয়।
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি। বিএনপি জোটের শরিকেরা পেয়েছে ৩টি আসন। সব মিলিয়ে এখন বিএনপি জোটের আসনসংখ্যা ২১২। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ৭৭ আসন নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় যাচ্ছে। এই জোটের প্রধান দল জামায়াত ৬৮ আসন পেয়েছে। আর এনসিপি পেয়েছে ৬টি আসন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ব্যক্তিদের গেজেট গত শুক্রবার রাতে প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার সকালে শপথ নেবেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। আর একই দিন বিকেলে হবে মন্ত্রিসভার শপথ। বিএনপির প্রধান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা এখন ব্যস্ত তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতিতে।
ছায়া মন্ত্রিসভা কী?
রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের বিকল্প নীতিনির্ধারণী কাঠামো হিসেবে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা। সংসদীয় গণতন্ত্রে এটি বিরোধী দলের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা জোরদার করে এবং সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজ নজরদারিতে রাখে।
সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার নেতৃত্বে বিরোধী দল থেকে একদল সদস্য একটা মন্ত্রিসভা গঠন করেন, যেটা সরকারের মন্ত্রিসভার বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
এখানে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রীর বিপরীতে একজন করে ‘শ্যাডো মিনিস্টার’ থাকেন। যেমন সরকারি দলের অর্থমন্ত্রী থাকলে বিরোধী দলে থাকেন ‘শ্যাডো অর্থমন্ত্রী’ বা ‘ছায়া অর্থমন্ত্রী’। তাদের কাজ হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতি, বাজেট ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরা।
এটি সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখার পাশাপাশি বিরোধী দলকে ভবিষ্যৎ সরকার পরিচালনার প্রস্তুতি দিতেও সহায়তা করে।
কোন কোন দেশে রয়েছে ছায়া মন্ত্রিসভা?
যুক্তরাজ্য: ছায়া মন্ত্রিসভার সবচেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত কাঠামো দেখা যায় যুক্তরাজ্যে। সেখানে সংসদের প্রধান বিরোধী দল আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অফিসিয়াল অপজিশন’ হিসেবে স্বীকৃত এবং তাদের ছায়া মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হিসেবেই বিবেচিত। বর্তমানে লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ পার্টি দুই প্রধান দলই ক্ষমতার বাইরে থাকলে পূর্ণাঙ্গ ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়াতেও ওয়েস্টমিনস্টার মডেল অনুসারে ছায়া মন্ত্রিসভা চালু রয়েছে। এখানে বিরোধী দল সরকারকে নিয়মিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং বিকল্প নীতিমালা উপস্থাপন করে।
কানাডা: কানাডাতেও একই ধরনের কাঠামো রয়েছে। পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলোর ছায়া মন্ত্রীরা নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর নজরদারি করেন।
নিউজিল্যান্ড ও অন্যান্য দেশ: নিউজিল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকর রয়েছে। তবে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ছায়া মন্ত্রিসভা নেই।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছায়া মন্ত্রিসভা
বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ নামে কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই। তবে সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দল চাইলে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে এ ধরনের টিম গঠন করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে বিভিন্ন সময় বিরোধী দলগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘বিকল্প নীতিমালা টিম’ বা ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করলেও পূর্ণাঙ্গ ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের নজির খুবই সীমিত।
সম্ভাব্য সুবিধা :
ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করলে সংসদে কার্যকর বিতর্ক বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা সহজ হবে। ভবিষ্যতে সরকার গঠন করতে চাইলে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় নীতি ও প্রস্তুতিতে দক্ষ হয়ে উঠবে। সর্বোপরি ভোটারদের সামনে বিকল্প কর্মপরিকল্পনা স্পষ্ট হবে।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ:
তবে, সংসদে কার্যকর বিরোধী ভূমিকা না থাকলে ছায়া মন্ত্রিসভা কাগুজে হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অনাস্থার সংস্কৃতি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। আর গণমাধ্যম ও জনসম্পৃক্ততা না থাকলে এর প্রভাব আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
কতটা কার্যকর হতে পারে?
বাংলাদেশে যদি একটি শক্তিশালী ও নীতিনির্ভর বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা নেয়, তবে ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকর রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে। এটি শুধু সমালোচনা নয়, বরং বিকল্প পরিকল্পনা উপস্থাপনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলোÍসংসদে বিরোধী দলের কার্যকর উপস্থিতি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা ছাড়া ছায়া মন্ত্রিসভা কাঠামো টেকসই হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র গড়ে তুলতে চাইলে বিরোধী দলকে কেবল আন্দোলনকেন্দ্রিক নয়, নীতিনির্ভর রাজনীতিতেও সক্রিয় হতে হবে। আর সেই জায়গায় ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।