আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ময়দানে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। এই পরিবর্তনের পালে নতুন হাওয়া যোগ করতে ‘মানবিক ইসলামি সুশাসন’ প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শীর্ষ শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।

গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় পুরানা পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে দলটির আমীর আল্লামা মামুনুল হক ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ইশতেহার ঘোষণা করেন।

‘জনগণের সুখ-শান্তির নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে ঘোষিত এই ইশতেহারে ২২টি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি এবং ৬টি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে। আল্লামা মামুনুল হক তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং গুম-খুন ও দুর্নীতির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণই তাঁদের মূল লক্ষ্য।

অগ্রাধিকারমূলক ছয় কর্মসূচি: রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন রূপরেখা

ইশতেহারে খেলাফত মজলিস ছয়টি বিষয়কে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে:

মৌলিক অধিকার ও সুষম উন্নয়ন: ইশতেহারে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ন্যায়বিচারÑএই ছয়টি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার পূর্ণ দায়ভার রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। মামুনুল হক বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ হিসেবে অভিহিত করে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দূর ও ন্যায্য সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে একটি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার করেন।

দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা: দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (তবৎড় ঞড়ষবৎধহপব) ঘোষণা করে ইশতেহারে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মানসম্মত জীবনমান নিশ্চিত করা হবে যাতে অভাবের কারণে কেউ দুর্নীতিতে লিপ্ত না হয়। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে ক্ষমতাকে ভোগের পরিবর্তে ‘আমানত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।

শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা: পররাষ্ট্রনীতিকে আধিপত্যমুক্ত ও স্বাধীন করতে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে কারো করুণানির্ভর নয়, বরং নিজ শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি: ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’Ñএই নীতির পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বসহ সকল রাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সম্পর্ক গড়ার কথা বলা হয়েছে।

সার্বজনীন ও নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা: বর্তমানের ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় ঐক্যের পথে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সার্বজনীন জাতীয় কারিকুলাম প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে কওমি মাদ্রাসাসহ বিশেষায়িত শিক্ষার মানোন্নয়নে স্বাধীন শিক্ষাকমিশন গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান গ্যারান্টি: দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে ‘এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি’ কর্মসূচি চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে বছরে ন্যূনতম নির্দিষ্ট সময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকবে।

আদর্শিক অবস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচার

ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ে ধর্মীয় ও সামাজিক নীতিমালার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে আকিদাগত সুরক্ষা, কাদিয়ানী সম্প্রদায় সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট নীতি এবং আজমতে সাহাবা রক্ষার বিষয়ে দলের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া রেমিট্যান্স যোদ্ধা তথা প্রবাসীদের সুরক্ষা, মাদক ও চাঁদাবাজি নির্মূল এবং টেন্ডারবাজি ও দখলবাজি বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

নারী অধিকার ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে আল্লামা মামুনুল হক বলেন, “ইসলামি সুশাসনে নারীর প্রতি কোনো বৈষম্য থাকবে না। শিক্ষা, ব্যবসা ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।”

বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ ও জুলাই বিপ্লবের চেতনা

ইশতেহারের ভূমিকায় বিগত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থাকে ‘ফ্যাসিবাদী’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের শহিদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানায় দলটি। মামুনুল হক বলেন, “আমরা রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, বরং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর প্রতিটি দাবি বাস্তবায়নে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।”

শান্তির ঠিকানা ও আগামীর অঙ্গীকার

ইশতেহার ঘোষণা শেষে এক আবেগঘন বক্তব্যে মামুনুল হক বলেন, এই ইশতেহার আমাদের কাছে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। আমরা বিশ্বাস করি, যে রাষ্ট্র আল্লাহভীতি, সৎ নেতৃত্ব ও মানবিক সুশাসনের ওপর দাঁড়ায়, সেই রাষ্ট্রই হয় শান্তির ঠিকানা।

সাংবাদিক সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, যুগ্ম মহাসচিব আবু সাঈদ নোমানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি-র পর খেলাফত মজলিসের এই আধুনিক ও জনবান্ধব ইশতেহার ২০২৬ সালের নির্বাচনে ইসলামী ধারার দলগুলোর প্রভাবকে আরও জোরালো করবে।