অবিলন্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জ্বালানি সংকট নিরসনের দাবিতে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় জোট। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মগবাজারস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ বৈঠক শেষে এই কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। বৈঠকে অংশ নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বিডিপির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, এনসিপির ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি আদিলুর রহমান আদিল, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, লেবার পার্টির সেক্রেটারি খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দিন, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা প্রমুখ।
সাংবাদিক সম্মেলনে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের পর নতুন সরকার গঠিত হয়ে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গণভোটে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচিত সরকার গণভোটের রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের ছলচাতুরি এবং টালবাহানার আশ্রয় নিচ্ছে। মানুষের ম্যান্ডেটকে শুধু উপেক্ষা নয়, উপহাস, অপমানকর নানা ধরনের বক্তব্য জাতীয় সংসদের ভিতরে এবং বাইরে অব্যাহতভাবে দিচ্ছেন। আমাদের প্রত্যাশ্যা ছিলো, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে যে জনআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিলো অন্তর্বর্তীকালীন, সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করেছে- তা নির্বাচন পরবর্তী সময় অন্তত সংস্কার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য থাকবে। সরকারি দল এবং বিরোধী দল আন্তরিকভাবে সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করবে।
তিনি বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিশ্চিত করতে যে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ ছিলো, তার মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ বর্তমান সরকার পাস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেটি বাংলাদেশের মানুষকে মর্মাহত করেছে। দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে ১১ দলীয় ঐক্য এ পরিস্থিতিতে তারা নীরব থাকতে পারে না। ঐকমত্য কমিশনে যে সমস্ত প্রস্তাবনা গৃহীত হয়েছে, জুলাই সনদ হয়েছে এবং যে সব অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, সেগুলো আইনে পরিণত করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছে।
মামুনুল হক আরও বলেন, সরকার সংসদ অধিবেশন আহ্বান করতেই বিলম্ব করে দেশবাসীকে সময়ের বাধ্যবাধকতার একটা জালে আটকে দিয়েছে। বর্তমান সরকার দেশের জনআকাক্সক্ষা উপেক্ষা করে বিপজ্জনক একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। তারা আবার ভিন্নরূপে ফ্যাসিবাদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। ফ্যাসিবাদের এই প্রত্যাবর্তনকে আমরা আবার যেকোনো মূল্যে রুখে দেবো, ইনশাআল্লাহ। আমরা গণভোটের রায় কার্যকর করার এই দাবি যেকোনো মূল্যে আদায় করবো।
দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় ১১ দলের পক্ষ থেকে। বলা হয়- জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ১১ দলের পক্ষ থেকে ৯ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগে বিকেল ৫টায় লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৯ এপ্রিল থেকে সপ্তাহব্যাপী গণসংযোগ এবং লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি দেশব্যাপী পালিত হবে। ১১ এপ্রিল দেশের সকল মহানগরীতে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে। ১২ এপ্রিল সকল জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে। ১৩ এপ্রিল ঢাকায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় সেমিনার হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি একদিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ক্ষমতাসীন দল বিএনপি জাতিকে বিস্মিত করে জাতির কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না। সকলের সম্মতিতে ৯ মাস ধরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা করা হয়। বিএনপির প্রতিনিধি পুরো সময়ই সেখানে ছিলেন। কিভাবে জুলাই সনদে একমত বিষয়গুলোকে আইনিভিত্তি দেয়া যাবে। উনারা সব ব্যাপারে আলোচনা করেছেন এবং একমত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ৮৪টি ঐকমত্যের বিষয় তার মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়- এগুলো আইনি ভিত্তি দিতে গেলে একটা প্রেসিডেন্টসিয়াল অর্ডারের প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতির আদেশ তারপর এটা গণভোটে যাবে, সেখানে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সরকারের গেজেট অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে এবং সেখানে অনুমোদন হবে। পরে সেটি সংশোধিত হিসেবে সংবিধানের তফসিল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু হতবাক ও বিস্মিত জাতি জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দল রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনে মৌলিক বিষয়ে উনারা নোট অব ডিসেন্ট দিলেন। গণভোটে ৫ কোটি মানুষ ভোট দিয়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট খারিজ করে দিয়েছে। সংবিধানের আর্টিকেল ৭ বলা হয়েছে জনগণের অভিপ্রায় হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন। গণভোটে ভোট দিয়েছে প্রায় ৫ কোটি মানুষ। গণভোট সংবিধানে থাকতে হয় না। গণভোট পূর্বেও বারবার হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একজন ব্যক্তিই শুধু সংবিধান সম্পর্কে তার ইচ্ছেমতো ব্যাখ্যা দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে। আজ ১১ দলীয় বৈঠকে এটা নিয়ে খুবই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নিন্দা করি, দেশের বড় আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পার্লামেন্টের বাইরে গোলটেবিল ও সেমিনার করছেন। তাদের এই ব্যাখ্যা যে ঠিক নয়, জনগণের অভিপ্রায়ের ওপরে আইন চলে না- তার যথেষ্ট আইনি ব্যাখ্যা তারা দিচ্ছেন।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, এই সংকট বিএনপি তৈরি করেছে। আবার এই সংকট তাদেরকেই সমাধান করতে হবে এবং এই সমাধানের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়নি। পার্লামেন্টে আমাদের ১১ দলীয় নেতৃবৃন্দ পরিষ্কার কথা বলছেন। বিএনপি রাষ্ট্রপতি আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার কথা, শপথ নেয়ার কথা- বিরোধী দল শপথ নিয়েছে, উনারা নেননি। উনারা সে শপথ নিতে পারেন এখনও। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংস্কার পরিষদ বৈঠক আহ্বান করতে পারেন এখনও। সেই সংস্কার পরিষদের অধিবেশনেই জুলাই সনদের গণভোটের ৫ কোটি মানুষ হ্যাঁ ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে- সেই জুলাই সনদকে আইনে রূপান্তরিত করে সংবিধানের তফসিলে তারা অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন, সে সময় এখনও আছে।
তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা এ পথে হাঁটছেন কেন, জাতি সেটা বুঝতে পেরেছে। সব ইস্যুতে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন, সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা নেগেটিভ করেছেন। যেমন- প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারবেন না। কমিশন ও অন্য সব দল একমত, কিন্তু উনারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে একটা পার্টে উনাদের নোট অব ডিসেন্ট আছে। উচ্চকক্ষ পিআর পদ্ধতি হবে সেখানেও উনাদের নোট অব ডিসেন্ট আছে। তারপর কয়েকটি সাংবিধানিক পদ প্রধান বিচারপতি, তত্ত্বাধায়ক সরকারের প্রধান, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, নির্বাচন কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক নিয়োগের ব্যাপারে বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো যেটা আগের সংবিধানে ছিল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছেই এখানে পূরণ হতো। কিন্তু ঐকমত্য কমিশন এবং ৩৩টি দল আমরা একসাথে লম্বা সময় মিটিং করে একমত হয়েছি যে, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে অসীম ক্ষমতার অধিকারকারী করা যাবে না। যে কারণে প্রশাসনে দলীয়করণ, দুর্নীতি কর্তৃত্ববাদী শাসন বাসা বাঁধে এগুলো ভাঙতে কমিশন গঠন হয়েছিল। সেখানে বিএনপি উপরের কয়েকটি পয়েন্টে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।
গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, যে সংকট পার্লামেন্টে সমাধান করা সম্ভব, যে বিতর্ক এখানে নিষ্পত্তি করা সম্ভব সেটাকে যদি রাজপথে ঠেলে দিতে চান- তাহলে তো আমাদের আর কোনো পথ থাকবে না। জনগণ আমাদের রায় দিয়েছে। জুলাই সনদে গণভোটে তারা রায় দিয়েছে, পার্লামেন্টে ভোট দিয়েছে। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদি সরকারি দলের কাছে জনরায় তুচ্ছ হয়, গৌন হয়, উপাখ্যাত হয়- তাহলে আমাদের আর কোনো পথ নেই, আমাদের যে জনগণ রায় দিয়েছে, আমাদের সেই জনগণের কাছেই যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, রাজপথের আন্দোলনকে তারা দমন করবেন। সরকার গঠন না করতেই তারা আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদী ভাষায় কথা বলা শুরু করেছেন। একটা দায়িত্বশীল বিরোধী দলকে কথা বলতে দিচ্ছেন না। মুলতবি প্রস্তাব আনা হলে টকড আউট করে দিচ্ছেন। বিরোধী দলের আনীত মূলতবি প্রস্তাবের মোকাবিলায় আপনারা আরেকটি মূলতবি প্রস্তাব এনে তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এসব অগণতান্ত্রিক কারণে আমরা জনগণের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত, গণভোটের রায় বাস্তাবায়িত না হওয়া পর্যন্ত, আমাদের এই গণতান্ত্রিক আন্দোলন চলতেই থাকবে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সহমর্মিতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সন্ত্রাস ও সহিংসতামুক্ত, বৈষম্যমুক্ত, মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তরুণরা যে রক্ত দিয়েছে, সেই দিকে আবার তাদের ঠেলে দেবেন না। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অব্যবস্থাপনা জিইয়ে রেখে এ সরকারের পক্ষে দেশ চালানো সম্ভব নয়। সরকার নিজেদের ভাগ্য বদলের ধান্দায় আছেন, জাতির ভাগ্য বদলাবার তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। যদি তাই থাকতো সরকারের অবহেলার কারণে হামে আক্রান্ত হয়ে এতগুলো শিশুর মৃত্যু হতো না।
ভোলায় সামান্য একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে প্রতিবন্ধী একটা সন্তান রেখে আমাদের এক মহিলা কর্মীকে ন্যক্কারজনকভাবে রাতের আঁধারে গ্রেফতার করা হলো। লজ্জা, এ সরকারের জন্য লজ্জা। পুলিশের কাছে এ ঘটনার কারণ জানতে চাইলে বলা হয়, ‘উপরের নির্দেশে’ গ্রেফতার করা হয়েছে। এই অমানবিক ঘটনার মাধ্যমে সরকারের ফ্যাসিবাদী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মত বীর বিক্রমকেও রাজাকার বলার সমালোচনাও করেন গোলাম পরওয়ার।