আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। সেই সাথে একইদিন গণভোট আয়োজনেরও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই ঘোষণার পর জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। রাজধানীসহ সারাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো মিছিল করে উচ্ছাস প্রকাশ করেছে। একদিকে দীর্ঘদিন পর মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের আয়োজন অপরদিকে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সংস্কারের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল না। একতরফা নির্বাচনের তফসিলগুলো ঘোষণার পর জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হতো। রাজনৈতিকদলগুলোও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামত। বিগত ১৭ বছর পর এবারই সকল রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তফসিলকে স্বাগত জানানো হয়েছে। অপরদিকে তফসিল ঘোষণার পর পরই ঢাকাসহ সারাদেশে পোস্টার ও বিলবোর্ড অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা নিজ উদ্যোগে ব্যানার, পোস্টার ও বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনে শক্ত অবস্থান ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তারপরও, নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশায় ছিলেন অনেকে। সেই অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে, বৃহস্পতিবার সিইসি ঘোষণা দেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট করবেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হলো। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠান। তফসিলের বক্তব্যে গণভোটের বিষয়টি আরো স্পষ্ট করার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন অনেকে। কমিশন যে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম তার প্রমাণ দিতে হবে শুরু থেকেই।
তফসিল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উচ্ছাস
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনে শক্ত অবস্থান ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তারপরও, নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশায় ছিলেন অনেকে। গণতন্ত্রের পথে যাত্রার প্রমাণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, মনে করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি বলেছে, এর মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।
রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে বিএনপি লড়াই-সংগ্রাম করেছে জানিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তফসিলের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে বাংলাদেশ কাঙ্খিত গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা হয়েছে তাতে আমরা মোটামুটিভাবে সন্তুষ্ট। শব্দের একটা এদিক-ওদিক থাকতে পারে। সেবিষয়গুলোকে আমি খুব বড় করে দেখি না। মূল বিষয়টা হচ্ছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে নির্বাচনের ঘোষণা হয়েছে-একইসঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের নির্বাচন। সেটা আমি মনে করি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিসন্দেহে একটি বড় উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছাত্র-জনতা, তার বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে শিগগির। এই ইলেকশনের মধ্য দিয়ে নতুন একটি যুগে বাংলাদেশ প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন যাতে সর্বজনগ্রাহ্য হয়, সেজন্য সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করতে হবে এবং কোনো ধরনের দুর্বলতা প্রদর্শন করা যাবে না।
পাল্টে গেছে মাঠের চিত্র
তফসিল ঘোষণার পর পরই পাল্টে গেছে মাঠের চিত্র। সারাদেশে মানুষের ভোটের উচ্ছাসের ঢেউ লক্ষ্য করা গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো রাস্তায় মিছিল করে উচ্ছাস প্রকাশ করেছে। অপরদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। সর্বত্রই ভোটের আলোচনা। সেই সাথে গণভোট মানুষের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করছে। অনেকের মধ্যে এ বিষয়ে কৌতুহল দেখা দিয়েছে। তফসিল ঘোষনার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রার্থীদের প্রচারণার যাবতীয় পোষ্টার সরানোর জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো ও সরকারের পক্ষ থেকে সেসব পোস্টার সরানো হচ্ছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকার পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলছে বলে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।
খুলনা ব্যুরো
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই খুলনার বিভিন্ন আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নের তৎপরতা জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে খুলনা ২ আসনে শুক্রবার ভোর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাশ্রমে ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ও অন্যান্য প্রচারসামগ্রী অপসারণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও আচরণবিধি-সম্মত রাখতে এ উদ্যোগে প্রধান ভূমিকা রাখছে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
তফসিল ঘোষণার পরপরই বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু দলের সব পর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা পাঠান, কোনোভাবেই যেন আচরণবিধি লঙ্ঘন না হয়। তার নির্দেশনার পর রাত থেকেই অনুসারীরা খুলনার বিভিন্ন সড়ক, ওয়ার্ড ও বাজার এলাকায় প্রচারণা উপকরণ অপসারণে মাঠে নামেন। শুক্রবার সকালে শহরের শিববাড়ী মোড়, নিউমার্কেট ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় দেখা যায়, বিএনপির কর্মীরা ব্যস্তভাবে পোস্টার খুলছেন ও ফেস্টুন নামিয়ে ফেলছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরাও সক্রিয়ভাবে একই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। সকালে খুলনার বাইতিপাড়া এলাকায় দেখা যায়, দলটির বিভিন্ন ফেস্টুন ও ব্যানার নিজ উদ্যোগে খুলে নিচ্ছেন কর্মীরা। জামায়াতে ইসলামী খুলনা সদর থানা আমীর এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা আমরা স্বাগত জানাই। সকাল থেকেই আমাদের কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে প্রচারসামগ্রী অপসারণে কাজ করছেন। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সব এলাকা পরিষ্কার হয়ে যাবে। খুলনা- আসনের জামায়াতের প্রার্থী এড. শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালও কর্মীদের অপসারণের কাজে সহযোগিতা করেন।
পাইকগাছা-কয়রা (খুলনা ৬) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল সহকারী পরিচালক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নিজ উদ্যোগে সকল প্রচার নির্বাচনী ব্যানার ফেস্টুন সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। এ কাজে দলীয় কর্মীদের সাথে নিজেই হাত লাগান।
জামায়াতে ইসলামী খুলনা জেলার ডুমুরিয়া-ফুলতলা (খুলনা-৫) নির্বাচনী আসনের পরিচালক মুন্সী মিজানুর রহমান ও সদস্যসচিব মিয়া গোলাম কুদ্দুস এক যৌথ বিবৃতিতে তাদের সব ইউনিটকে পোস্টার, ফেস্টুন, প্যানা, প্রতীকসহ সব প্রচার উপকরণ দ্রুত অপসারণের আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী ২২ জানুয়ারির আগে যেকোনো ধরনের প্রচারণা নিষিদ্ধ। তাই দলীয় সকল জনশক্তিকে নির্দেশনা মেনে প্রচারসামগ্রী সরিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে।
শহরের নিউমার্কেট, নিরালা, শিববাড়ী মোড়সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ইতোমধ্যে পোস্টার অপসারণের দৃশ্য চোখে পড়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাদের তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে বেশিরভাগ দল স্বেচ্ছায় কাজে নেমে পড়ায় এখনো কোনো জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। অতিরিক্ত বিভাগীয় নির্বাচন কর্মকর্তা রাজু আহমেদ বলেন, আমরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে আছি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতামূলক মনোভাব কাজটি আরও সহজ করে দিয়েছে।
সবশেষে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা আশা করছেন, তফসিল ঘোষণার পর নির্ধারিত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পুরো খুলনা–২ আসনসহ আশপাশের এলাকায় সব প্রচারসামগ্রী অপসারণ সম্পন্ন হবে। এতে নির্বাচনী পরিবেশ আরও শান্ত, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও বিধি-নিষিদ্ধ প্রচারণামুক্ত থাকবে বলে তারা মনে করছেন।
কুমিল্লা অফিস : কুমিল্লা ৬ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদ শুক্রবার সকাল ১০টায় সরকারি তফসিল অনুযায়ী তার এলাকায় পোস্টার অপসারণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিজ নামে ছাপানো পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেন কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। তিনি তার কর্মী-সমর্থকদের আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন নির্বাচনী আচরণবিধি ও নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী নিজ ব্যয় ও দায়িত্বে অপসারণ করার জন্য দিকনির্দেশনা দেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন সদর দক্ষিণ উপজেলা জামায়াত আমীর মো. মিজানুর রহমান সহ স্থানীয় শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।
এসময় কুমিল্লা-৬ আসনের জামায়াতের প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন আইনের (আরপিও) নির্দেশনা মেনে চলাই আমাদের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। কার্যক্রম পরিচালনা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নির্বাচনী প্রচারের–পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন অপসারণ করা আইনগত বাধ্যবাধকতা, তাই আমরা তা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করছি। স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ী সমাজ প্রার্থীর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “এতে সমন্বিত ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে উঠবে।”
লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) সংবাদদাতা : বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কতৃক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরি মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গীবাড়ী) আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মুন্সীগঞ্জ জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিমের নির্বাচনী ব্যানার, ফেস্টুন অপসারণ করছেন প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় জামায়াতের প্রার্থীর উদ্যোগে মুন্সীগঞ্জ ২ নির্বাচনী আসনের লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজার ও মহাসড়কসহ সকল যায়গার নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন তাদের নিজ এলাকার কর্মী সমর্থকরা সরিয়ে ফেলছে।
এ ব্যাপারে লৌহজং উপজেলা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মো: জামাল উদ্দিন জানান নির্বাচন কমিশনের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে লৌহজং উপজেলার সমস্ত স্থানের এ নির্বাচনী ব্যানার, ফেস্টুন অপসারণ করা হচ্ছে।