# আপিল শুনানিতে কোনো পক্ষপাত করিনি: সিইসি

# শেষ দিনে আসলাম চৌধুরী, আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও সালেহীসহ প্রার্থিতা ফিরে পেল ২১ জন

চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরী, ফেনী-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহীসহ শেষ দিনের আপিলে ২১ জনের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিগত ৯ দিনের আপিল শুনানিতে ৪২০ জনের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এদিকে কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিল করেছে ইসি। এর আগে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থীতা বাতিল করেছিল।

গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশনে শেষ দিনের আপিল শুনানিতে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এদিকে আজ সোমবার প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপর মঙ্গলবার চূড়ান্ত প্রর্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ করবে নির্বাচন কমিশন। প্রতিক বরাদ্দ শেষে বুধবার থেকে শুরু হবে প্রচার প্রচারণা বা ভোট যুদ্ধ ।

আপিল শুনানির সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল শুনানিতে কোনো পক্ষপাত করিনি। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আমরা ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিষয়টিও ছেড়ে দিয়েছি। আমরা চাই যে সবাই অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক।

সিইসি বলেন, আপনারা হয়তো আমাদের সমালোচনা করতে পারে অনেকেই। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিষয়টা আমরা কিভাবে ছেড়ে দিয়েছি, আপনারা দেখেছেন। বিকজ উই ওয়ান্ট দি ইলেকশন টু বি পার্টিসিপেটেড। আমরা চাই যে সবাই অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক। আপনারা সহযোগিতা না করলে কিন্তু হবে না।

তিনি বলেন, আই ক্যান এশিউর আমার তরফ থেকে এবং আমার টিমের তরফ থেকে কোনো পক্ষপাতিত্ব করে কোনো জাজমেন্ট আমরা দেইনি।

তিনি বলেন, আপনারা কোয়ারি করেছেন কোয়ারি জবাব দিয়েছেন, আই এম এমেজ টু সি এট দিস। এটা আমাদের আলেম ওলামারা বাহাস বলে। আপনাদেরকে আমি আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই ইসির পক্ষ থেকে। আমি আশা করবো ভবিষ্যতেও আপনাদের কাছ থেকে এ ধরনের সহযোগিতা পাবো।

এ সময় নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আমরা ঋণ খেলাপী যাদেরকে ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে নিয়েছি। শুধু আইন তাদেরকে পারমিট করেছে বিধায়।

শেষ দিনে ২৩টি আবেদন মঞ্জুর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির শেষ দিনে গতকাল রোববার ৬৩টি আবেদনের শুনানি গ্রহণ করা হয়। শুনানিতে ২৩টি আপিল মঞ্জুর হয়েছে। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে মঞ্জুর হয়েছে ২১টি আবেদন এবং মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে মঞ্জুর হয়েছে ২টি আবেদন। কমিশন ৩৫টি আপিল না-মঞ্জুর করেছে। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে না-মঞ্জুর হয়েছে ১৮টি আবেদন এবং মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে না-মঞ্জুর হয়েছে ১৬টি আবেদন। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাতিলাদেশ বহাল রাখা-সংক্রান্ত ১টি আপিল না-মঞ্জুর হয়েছে। শুনানিকালে ৩টি আপিল আবেদন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে এবং ১ জন আপিলকারী অনুপস্থিত ছিলেন। কমিশন ২টি আপিল আবেদন অপেক্ষমাণ রেখেছে।

উল্লেখ্য, প্রথম দিনের শুনানিতে প্রার্থীতা ফিরে পায় ৫১ জন প্রার্থী এরপর ১১ জানুয়ারি ২য় দিনের শুনানিতে আবারও ৭০টি আপিলের শুনানি করেছে ইসি। সেখানে প্রার্থীতা ফিরে পায় আরও ৫৮ জন প্রার্থী। ১২ জানুয়ারির শুনানিতে প্রার্থীতা ফিরে পায় ৪১ জন এবং চতুর্থ দিনের শুনানিতে প্রার্থীতা ফিরে পেয়েছে ৫৩ জন। এছাড়া ৫ম দিনের শুনানিতে ৭৩ জন, ৬ষ্ঠ দিনের শুনানিতে ৬০ জন, ৭তম দিনে ১৮ জন ও ৮ম দিনে প্রার্থীতা ফিরে পায় ৪৪ জন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনার আলোকে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গতকাল রোববার ছিল পাবনা-১ ও পাবনা-২ সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। শেষ দিনে পাবনা-১ আসনে ৭টি এবং পাবনা-২ আসনে ৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।

আসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন

শুনানীতে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা (ঋণটা) দিয়ে দিয়েন। টাকাটা না দিলে কিন্তু জনরোষ তৈরি হবে। মানুষ হিসেবে এটা আপনাকে বললাম।

আপিল শুনানিতে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়ান বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরী নিজে ঋণ নেননি তিনি গ্যারান্টার।

এর আগে, ঋণ খেলাপির অভিযোগ তুলে বিএনপির প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের জন্য জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. আনোয়ার ছিদ্দিক আপিল করেছিলেন। দুই পক্ষের আইনজীবী দীর্ঘ সময় যুক্তি তর্ক শেষে ইসির আপিল শুনানি শেষে জামায়াত প্রার্থীর আপিল না মঞ্জুর করে। এর ফলে প্রার্থীতা বহাল থেকে যায় বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর।

তবে এর পরে সবাই হট্টগোল শুরু করে। আপিল শুনানিতে একজন দাঁড়িয়ে বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপি প্রমাণিত হওয়ার পরও আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ হলো। এটা হতে পারে না।

জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. আনোয়ার ছিদ্দিকের পক্ষে আইনজীবি হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, উনি (আসলাম চৌধুরীর) কনভিক্টেড। ইসি কোনোভাবেই উনার প্রার্থিতা বহাল করতে পারে না। আমরা ইসিতে ন্যায় বিচার পাইনি, উচ্চ আদালতে রিট করবো।

চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লায়ন আসলাম চৌধুরীর স্থাবর ও অস্থাবর মিলে প্রায় ৪৫৬ কোটি ৯৫ লাখ ৭ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। তবে তার ঋণ চট্টগ্রামের অন্যান্য প্রার্থীদের চেয়ে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে তার সর্বমোট ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

এর মধ্যে, পাঁচটি ব্যাংকে ও অন্যান্য মিলে তার ঋণ রয়েছে ৩৫৪ কোটি ৪১ লাখ ৬৩ হাজার ২৬৯ টাকা। এছাড়াও জামিনদার হিসেবে তার ঋণের পরিমাণ ১,০৫৯ কোটি টাকা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ডিরেক্টর হিসেবে ২৮৫ কোটি টাকা।

তার ঋণের পরিমাণ সম্পদের তুলনায় ২৪ দশমিক ২৫ গুণ বেশি। যদিও বিএনপির এই নেতা এসব ঋণে বেশিরভাগই জামিনদার ও ডিরেক্টর হওয়ার সুবাদে হয়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আসলাম চৌধুরীর ঋণ বেশি হলেও তার নগদ অর্থও সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে তার কাছে নগদ অর্থ রয়েছে ১১ কোটি টাকা।

ফেনী-৩ আসনে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল

গতকাল রোববার ফেনী-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসি জানায়, ফেনী-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নের বৈধতা বহাল রাখা হল।

এর আগে গত শনিবার আপিল শুনানিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর বাকবিত-া হয়। আব্দুল আউয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগ এনে তাঁর মনোনয়ন গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছিল।

প্রার্থিতা ফিরে পেলেন জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী

গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী।

‎এ বিষয়ে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছিলাম। গতকাল আপিলে মনোনয়নপত্রের বৈধতা ফিরে পেয়েছি। নির্বাচন কমিশনসহ আমার নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন কুড়িগ্রাম জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ।

এ আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী নির্বাচনে লড়বেন। তারা হলেন- তাসভীর উল ইসলাম (বিএনপি), মাহবুবুল আলম সালেহী (জামায়াত), আক্কাস আলী সরকার (ইসলামী আন্দোলন-চরমোনাই), আব্দুস সোবহান (জাতীয় পার্টি), সরকার মো. নুরে এরশাদ সিদ্দিকী (গণঅধিকার পরিষদ), মামুন অর রশিদ (বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস) এ ‎আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩২ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০২ জন।

বিএনপির প্রার্থী গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিল

গতকাল রোববার চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের পর এবার কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিএনপির প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়া নির্বাচনি হলফনামায় নিজের দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি উল্লেখ করেননি। এ কারণে কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট-লালমাই) আসনে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে রোববার আপিল শুনানির শেষ দিনে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়ন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। ঋণখেলাপির কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়।