বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরাধ ও অন্যায় করা হয়েছে সাতক্ষীরাবাসির ওপর। সাতক্ষীরাবাসীর সাথে সাড়ে ১৪ বছর সৎ মায়ের মত আচরণ করা হয়েছে। বুলডোজার দিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সাতক্ষীরার মানুষের অপরাধ ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।

তিনি বলেন, সাতক্ষীরার মানুষ ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে থাকায় বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় এখানে কোন উন্নয়ন হয়নি। সাতক্ষীরা ছিল সবচেয়ে অবহেলিত জেলা। সাতক্ষীরাকে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তারা ভেবেছিল এই অবস্থা চিরকাল থাকবে। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সম্মান দেন, আর যাকে ইচ্ছা সম্মান কেড়ে নেন। জামায়াত ইসলাম ক্ষমতায় এলে সাতক্ষীরার উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে।

satkhira-meeting-

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলা জামায়াত আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা, শফিকুর রহমান বলেন, ন্যায়, ইনসাফ, জনগণের সরকার ও মদিনার শাসন আমলের সুশাসন কায়েম করার জন্য আপনারা যদি আমাদের উপহার দেন তাহলে আপনাদের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো। এবং এই ঋণ পরিশোধ করার জন্য পুরো সময় জুড়ে আমরা চেষ্টা করবো। আপনাদের সাথে আলোচনা করে আপনাদের সমস্যাগুলো সমাধান করবো। উপর থেকে কিছুই চাপিয়ে দেওয়া হবে না। এই টুকু আমরা নিশ্চয়তা দিতে পারি, আল্লাহ যদি তার মেহেরবাণীতে আপনাদের ভোটে সরকার গঠনের সুযোগ আমাদের দেন, তাহলে কোনো শিক্ষিত চোরের হাত আপনাদের কোন অংশ খেয়ে ফেলতে পারবে না। এই দুখী বাংলাদেশের সম্পদ লুট করে কিছু লোক কিছু রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত এবং কিছু লোক জনগণের সেবক হয়ে এমন এমন কাজ করেছে যে তারা দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করেছে। ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। যার ডকুমেন্ট আছে। আর যেটার ডকুমেন্ট নাই সেটার কোনো হিসাব নাই।

তিনি বলেন, আমরা দেশবাসীকে কথা দিচ্ছি, আল্লাহ আমাদেরকে সুযোগ দিলে ওদের পেটের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে জনগণের সম্পদ বের করে আনবো ইনশাল্লাহ। যা পারি যতটুকু পারি কোনো ক্ষমা নেই এই ব্যাপারে। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের ব্যাপারে আমাদের কোনো দয়াও নেই, ক্ষমাও নেই। এখানে আমরা কঠোর, এখানে আপোষ নয়। আর ভবিষ্যতের বার্তা হবে এখন থেকেই- যখন এই সরকার শপথ নিবে অতীতে যা করেছে এটা পরে দেখা যাবে, এখন থেকে কেউ আর কালো টাকার দিকে হাত বাড়াতে পারবা না।

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, যুবকদের হাতে আমরা বেকার ভাতা উঠিয়ে দেব না। আমরা মনে করি তাদের হাতে বেকার ভাতা উঠিয়ে দেওয়া মানে তাদের অপমান করা। যুবকরা সম্মানের সাথে লড়াই করে দেশ গড়তে চাই। সেই যুবকদের হাত আমরা দক্ষ নাগরিক, দেশ গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করবো উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে এবং এর দায়িত্ব পালন করবে রাষ্ট্র। এরপর তাদের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দেব। তখন তারা বলবে আমরা গর্বিত নাগরিক।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা জামায়াতের বিজয় চাইনা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে নির্যাতিত রাজনৈতিক দল। আমাদের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে, অনেককে অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে। দলের নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল করা হয়েছে এবং একপর্যায়ে দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বহু মানুষকে আটক রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। মা বোনদেরকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন ও অত্যাচার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘৫ তারিখে আল্লাহ যখন আমাদের এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তখন আমরা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছি। জননিরাপত্তা রক্ষায় নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালনের কথা বলেছি। কোথাও অমাদের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজিতে ঝাপিয়ে পড়েনাই। মামলা করে নাই। আমরা প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।’

দলের নেতা-কর্মীদের স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছে কোনো ব্যক্তির বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করা যাবে না। আামাদের নেতা-কর্মীরা কোনো চাঁদাবাজি করেনি। অন্যায়ভাবে কাউকে মামলা দেয়নি। যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলও গত ১৫ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিক, আলেম-ওলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। “অনেক সময় জুলুমের শিকার মানুষই পরে জালিম হয়ে যায়। তাই ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি,” বলেন তিনি।

সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সরকার গঠনের লক্ষ্যে সমর্থন চান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, মদিনা সনদের আদলে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুইটা দুষ্টু চক্রের কারণে আজ দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। একটা চাঁদাবাজ, আরেকটা সিন্ডিকেট। আমরা আপনানাদের কথা দিচ্ছি আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিলে প্রথমে চাঁদাবাজদের হাত শক্ত করে ধরে ফেলবো। তারপর সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেব। কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রাখা হবে না।

তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিতদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে এবং যারা দেশের জন্য অধিক সময় দায়িত্ব পালন করেন, তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা হবে।

জামায়াত আমীর বলেন, দেশের তরুণ সমাজ পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্খা ক্রমেই বাড়ছে। ভোট প্রসঙ্গে বলেন, হা অর্থ আজাদী না অর্থ গোলামী। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে হা ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন হা ভোট দিলে বাংলাদেশ জিতে যাবে না ভোট দিলে বাংলাদেশ হেরে যাবে বলে মন্তব্য কনে তিনি।

এর আগে ২০১৫ সালে সাতক্ষীরায় সফরের স্মৃতিচারণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে এসেছিলেন। “যে মায়েরা সন্তান হারিয়েছেন, যে শিশুরা বাবাকে হারিয়ে কষ্টে আছে তাদের চোখের পানি আমি দেখেছি,” স্মৃতিচারণ করেন তিনি। তিনি ভারতকে ইঙ্গিত ও আইসিসির সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনা করার আহবান জানিয়ে বলেন, আমরা প্রতিবেশীদেরকে বন্ধু হিসেবে দেখতে চাই। তবে কাউকে প্রভূ হিসেবে আসতে দেয়া হবে না বলে হুশিয়ার উচ্চারণ করেন তিনি।

সমাবেশে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম মুকুলের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতেরক্রেটারী জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী রবিউল বাশার এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলামসহ জামায়াত ও ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, বাংলাদেশ মসজিদ মশিনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওঃ খলিলুর রহমান মাদানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ জেলা সভাপতি মুহাদ্দিস মোস্তফা কামাল, আমার বাংলাদেশ (এবি) পাটি সদস্য সচিব জি এম সালাউদ্দীন শাকিল, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পাটির জেলা সভাপতি সাইফুজ্জামান মিঠু, সাতক্ষীরা শহর শাখা শিবিরের সভাপতি আর মামুন, সাতক্ষীরা জেলা শিবিরের সভাপতিজুবায়ের হোসেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এর জেলা আহবায়ক আরাফাত হোসেনসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃৃত্ব বৃন্দ। সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান।

২৭,০১,২৬

ছবি(১)ঃ সাতক্ষীরা জনসভায় বক্তব্য লাখছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।