ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বিভিন্ন দল ও জোট এবং ব্যক্তিগতভাবে ৫৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যুগ্ম সচিব মো. মঈন উদ্দীন খান সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের যারা প্রার্থী, তাদের মনোনয়ন পত্র দাখিলের শেষ তারিখ বিকাল চারটায় শেষ হয়েছে। তো আমরা এখানে বিএনপি এবং জোট থেকে ৩৬ টা মনোনয়ন পত্র আমরা পেয়েছি এবং বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর জোট থেকে ১৩ টা মনোনয়ন পত্র পেয়েছি। এছাড়া স্বতন্ত্র জোট থেকে একটি মনোনয়ন পত্র পেয়েছি। উনার নাম হচ্ছে মিস সুলতানা জেসমিন। আর এর বাইরে আমরা তিনজনের মনোনয়ন পত্র পেয়েছি। শামমা আক্তার, মোছাম্মদ মেহরুন্ নেসা ও মাহবুবা রহমান। এই তিনজনে আসলে কোনো দল বা জোট থেকে আবেদন করেননি। উনারা নিজেদের মত করে নিজেরা জমা দিয়েছে। এটা আমরা যখন বাছাই করব তখন আপনাদের সাথে শেয়ার করব।

তিনি বলেন, আমাদের এই তফসিল অনুযায়ী আমরা রিটার্নিং অফিসারের এখানে বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। ২২ এপ্রিল বিকেল ২ টা থেকে ৪টা, ২৩ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর‌্যন্ত বাছাই হবে। আর এরপরে বাছায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে মাননীয় কমিশনের নিকট। এটা হচ্ছে ২৬ শে এপ্রিল সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৪টা পর‌্যন্ত। আর কমিশন আপিল নিষ্পত্তি করবেন ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। এটা হবে সকাল ১১ টা থেকে শেষ না হওয়া পর্যন্ত।

রিটার্নিং কর্মকর্তা আরো বলেন, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ এপ্রিল, প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল আর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ মে।

একটা প্রশ্ন সেটা হচ্ছে যে জাতীয় নির্বাচনে যখন ভোট হয় সেই প্রার্থীর যোগ্যতা, অযোগ্যতা এবং সংরক্ষিত নারী আসলে ভোট একই কিনা এবং একই একই কিনা এবং ওই কেউ যদি সরকারি কোনো পদে থাকেন বা সরকারি যদি কোনো কর্মকর্তা হন কতদিনের মধ্যে কতদিন পর সে নির্বাচন করতে পারবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ডকুমেন্ট দেখে ডিসিশন দিবো। মনোনয়ন পত্র আমরা যাচাই বাছাই করব।

নিয়মটা কী-এমন প্রশ্নের জবাবে মো. মঈন উদ্দীন খান বলেন, এটা নিয়ম হচ্ছে, মনোনয়ন পত্র দেখতে হয়, মনোনয়ন পত্র দেখে তারপর ডিসিশন দিতে হয়।

বিধিটা কী, আইনটা কী-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিওতে) যেভাবে বলা আছে এখানে সেটাই প্রযোজ্য।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, ২২ এপ্রিল জামায়াত জোট ও স্বতন্ত্র জোটের মনোনয়ণপত্র বাছাই হবে। পরের দিন বিএনপি জোটের মনোনয়নপত্র বাছাই হবে।

আইন অনুযায়ী, সংসদের সাধারণ নির্বাচনের প্রাপ্ত আসন অনুযায়ী সংরক্ষিত ৫০টি আসন বিভিন্ন ও জোটের মধ্যে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এবার বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি ও স্বতন্ত্রদের মোর্চা একটি আসন পাচ্ছে। প্রার্থীর সংখ্যা বেশি না হলে সাধারণত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে থাকেন।

মনোনয়নপত্র জমা দিলেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মনোনীত ১৩টি আসনের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ঢাকার আগারগাঁওস্থ নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে যান তারা। মনোনয়নপত্র জমা শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশে ব্রিফিং করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি এ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দসহ ১৩টি আসনের মনোনীত প্রার্থীগণ।

১১ দলীয় ঐক্যের সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীগণ হলেন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দীকা, সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম, আইন ও মানবসম্পদ বিভাগীয় সেক্রেটারি এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী, প্রচার ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিভাগীয় সেক্রেটারি নাজমুন নাহার নীলু, কেন্দ্রীয় ইউনিট সদস্য ও সিলেট মহানগরী ও জেলার সাবেক সেক্রেটারি অধ্যাপক মাহফুজা হান্নান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও বগুড়া অঞ্চল পরিচালিকা সাজেদা সামাদ, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সেক্রেটারি শামছুন্নাহার বেগম, নারী অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ, জুলাইয়ের শিশু শহীদ জাবির ইব্রাহীমের মা রোকেয়া বেগম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা আলম মিতু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবা হাকিম।

ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণা করেছে। তফসিল অনুযায়ী আজ ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। সে অনুযায়ী ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য তাদের প্রাপ্য ১৩টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংসদের ৩০০ সাধারণ আসনের ভিত্তিতে প্রতি ৬টি আসনের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন নির্ধারিত হয়। সে হিসাবেই ১১ দলীয় ঐক্য ১৩টি আসনের ন্যায্য অংশীদারিত্ব পেয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসন বন্টন অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আসন সংখ্যা ১২টি হলেও সংগঠনের পক্ষ থেকে ৮টিতে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট আসনগুলো শরিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়েছে। এর মধ্যে এনসিপি ২টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১টি ও জাগপা থেকে ১টি এবং জুলাই শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে উত্তরায় শহীদ জাবের ইব্রাহীমের মা রোকেয়া বেগমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব মনোনয়নপত্র গ্রহণের কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন জমা সম্পন্ন হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ মে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধান অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের ভোটার হচ্ছেন সংসদ সদস্যরা। ফলে এসব আসনে সরাসরি ভোট নয়, বরং সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, জমাকৃত তালিকার বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় ১৩টি আসনেই প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। ড. আযাদ আরও বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সময়মতো সংসদে যোগ দিতে পারলে নারীদের অধিকার, সমস্যা ও প্রত্যাশা যথাযথভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। তারা আইন প্রণয়নসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। তিনি বলেন, সংসদে ন্যায়সংগত ও জনকল্যাণমূলক সব বিষয়ে ১১ দলীয় ঐক্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সাংবিধানিক পরিষদ গঠনের দাবি আদায়ে তারা সংসদ ও রাজপথ- উভয় ক্ষেত্রেই আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

সংরক্ষিত আসনে বিএনপির পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন মনোনীতরা : জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সেলিমা রহমান। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন ভবনে মনোনয়নপত্র জমা দেন তিনি। বিএনপির এবারের মনোনয়নপ্রক্রিয়া অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে করা হয়েছে উল্লেখ করে সেলিমা রহমান বলেন, এখানে প্রবীণ ও নবীনের সমন্বয় করা হয়েছে। এই সমন্বিত দলটি সংসদে অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করেন তিনি।

মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সফলতার জন্য সেলিমা রহমান দলীয় নেতৃত্বের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা এ জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের দলের চেয়ারম্যানকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’ মনোনয়ন জমা দেওয়া শেষে আরেক প্রার্থী সানসিলা জেবরিন (প্রিয়াঙ্কা) বলেন, তিনি সংসদে গিয়ে নারী অধিকার ও দেশের স্বাস্থ্য খাতে ভূমিকা রাখতে চান। নারী জাগরণ, স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়ে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সানসিলা জেবরিন শেরপুর-১ আসনে প্রার্থী ছিলেন। তিনি শেরপুর সদরের বর্তমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সেখানে হাসপাতাল, রেললাইন, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, রাস্তাঘাটের উন্নয়নÑকিছুই নেই। যে সদর হাসপাতালটা আছে, সেটাও বেহাল। তিনি আরও জানান, নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তার প্রথম কাজ হবে নির্বাচনী প্রচারে ভোটারদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা এবং শেরপুর সদরকে নতুন করে গুছিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।

নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সেলিনা সুলতানা নিশিতা বলেন, দেশে নারীদের প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও বুলিং বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভালো পরিবারের নারীরা রাজনীতিতে আসবেন না।

গতকাল সকাল থেকে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা পৃথকভাবে নিজেদের মনোনয়নপত্র জমা দেন। মনোনয়নপত্র জমা দেন ১১ দলের মনোনীত নারী প্রার্থীরাও।