রিয়াজুল ইসলাম বাচ্চু, ঝালকাঠি সংবাদদাতা : আওয়ামী শাসনামলে রাত ভোটের কারণে ঝালকাঠির রাজনীতির কলকাঠি ছিল আ’লীগের দখলে। আ’লীগের হেভীওয়েট নেতা আমীর হোসেন আমু ছিলেন এ আসনের সংসদ সদস্য, তার ইশারা ছাড়া যেন গাছের পাতাটিও নড়ত না। তাই বিএনপির কর্মসূচি সীমাবদ্ধ ছিল দলীয় কার্যালয়, কোন নেতার বাড়ী গ্রামের নির্জন কোন জায়গায়। জামায়াতও ছিল না প্রকাশ্যে। নিরবে নিভৃতে লোকচক্ষুর আড়ালে চুপিশারে তারা চালিয়ে যেত কর্মসূচি। ছাত্র জনতার কঠোর আন্দোলনে ৩৬ জুলাই স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার পতন ও ফ্যাসিবাদ বা নেতাদের পালায়নের পর ঝালকাঠির রাজনীতির দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়েছে বহুগুণ। বিএনপি’র সাথে পাল্লা দিয়ে জামায়াতে ইসলামী প্রতিদিনই গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, সদস্য সংগ্রহ ছাড়াও বিএনপির ৩১ দফা এবং জামায়াতের দাওয়াতপত্র নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে ভোটারদের বাড়ী বাড়ী যাওয়া শুরু করেছেন। মাঠ পর্যায়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঝালকাঠির দু’টি সংসদীয় আসনে বিএনপি’র মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী। রাজাপুর ও কাঠালিয়া উপজেলা নিয়ে ঝালকাঠি-১ আসন, ঝালকাঠি সদর এবং নলছিটি উপজেলা নিয়ে ঝালকাঠি-২ আসন।

ঝালকাঠি-১

ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঠালিয়া) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামালকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এ আসনে বিএনপি থেকে সদ্য পদত্যাগী নেতা ড. ফয়জুল হককে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। টকশো ব্যক্তিত্ব তরুণ ও মেধাবী ড. ফয়জুল হক, দক্ষিণবঙ্গের পীরে কামেল কায়েদ ছাহেব হুজুরের নাতি এবং নেছারাবাদ দরবার শরীফের পীর মাওলানা খলিলুর রহমান নেছারাবাদী হুজুরের ভাগ্নে। ফলে এ আসনে ফয়জুল হকের কিছু ভোট ব্যাংক রয়েছে। এছাড়াও তরুণ ও ছাত্র সমাজের মধ্যে ফয়জুল হকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ আসনে জামায়াতের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী কার্যক্রম সক্রিয়ভাবে চালাচ্ছে। বিএনপি’র প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলামের ব্যক্তি জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে তার দলের মধ্যে চরম কোন্দল বিরাজ করায় ভোটের হিসাব নিকাশ পাল্টে যেতে পারে। কোন্দলের কারণে বিএনপি’র হাত ছাড়া হতে পারে এ আসনটি। এ আসনটি বিএনপি’র শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টিকে দেয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে দেয়া হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। আসনটি’র অন্য ৫ জন বিএনপি প্রার্থী একতাবদ্ধ হয়ে রফিকুল ইসলাম জামালের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে কোন্দল না থাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। ১/১১ সরকারের সময় তৎকালীন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর যখন বিদেশে ছিলেন, তখন রফিকুল ইসলাম জামালকে ঝালকাঠি-১ আসন থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী বজলুল হক হারুনের কাছে পরাজিত হন। সেই থেকে অদ্যাবধি তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। ২০১৮ সালেও তিনি মনোনয়ন চেয়েছিলেন কিন্তু তখন শাহজাহান ওমরকে এ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়। রফিকুল ইসমলাম জামাল ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন।

ঝালকাঠি-২

ঝালকাঠি-২ সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে সাবেক এমপি ইসরাত জাহান ইলেন ভট্টোকে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা শেখ নেয়ামুল করিমকে (১) শেখ নেয়ামুল করিম দক্ষিণাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বরিশাল বিএম কলেজের বিপুল ভোটে নির্বাচিত এজিএস ছিলেন। এ আসনে দু’জন প্রার্থীই নলছিটি উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় ভোটের সমীকরণে প্রভাব বিস্তার করবে। এ আসনে বিএনপি’র মধ্যে তিনটি গ্রুপ সক্রিয় থাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। অপরদিকে বিএনপি’র পরিবার জ্বলছে বিদ্রোহের আগুনে। এ আসনে বিএনপি’র অভিযোগ ইলেন ভুট্টো জাতীয় পার্টি ও আওয়ামীলীগের লোকজন নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ কারণে বিএনপি’র একটি বড় অংশ নির্বাচনী প্রচারণায় ইলেন ভুট্টোর সাথে এখনো মাঠে নামে নাই। এ নিয়ে বিএনপিতে চলছে কাঁদা ছোড়াছুড়ি। তবে ব্যক্তি ইলেন ভট্টোর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। ২০০৮ সালে বিএনপির মনোনয়ন দেয়া হয় ঝালকাঠির-২ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক প্রয়াত সাংসদ জুলফিকার আলী ভুট্টোর স্ত্রী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোকে। তিনি সে সময় আ’লীগের প্রার্থী আমির হোসেন আমুর কাছে হেরে যান। এর আগে তিনি ২০০১ সালে আমির হোসেন আমুকে হারিয়ে এমপি হন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তাকে প্রথমে মনোনয়ন দেয়া হয়। তবে তিনি তখন আ’লীগের চাপে নির্বাচন থেকে সরে যান। দলকে ঐক্যবদ্ধ করে মাঠে নামতে পারলে জয়ের সম্ভবনা রয়েছে।

জামায়াতের প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ ও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নলছিটির সন্তান শেখ নেয়ামুল করিম জামায়াতের ব্যবসায়ী সংগঠনের ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবন থেকে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। শান্ত প্রকৃতির সাদামনের হাস্যোজ্জ্বল নেয়ামুল করিম নির্বাচনী প্রচারণায় ঝালকাঠির অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন।

এদিকে গত ৫ আগষ্টের পরে ইলেন ভুট্টো নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা চালালেও নেতা কর্মীদের অভিযোগ, ইলেন ভুট্টো ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে নেতাকর্মীদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখেননি। গত ১৫ বছরেই মুলত ইলেন ভুট্টো এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। গত ১৫ বছরে তার নামে কোন মামলা হয়নি এবং আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে ময়দানে দেখা যায়নি। ২০১৮ সালে ইলেন ভুট্টো নির্বাচন থেকে সরে গেলে মনোনয়ন দেয়া হয় জীবা আমিনা আল গাজীকে। ২০২০ সালে জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠনের পর হতে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন ঝালকাঠির মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

ঝালকাঠি-১ ও ২ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার মত অবস্থা এখনও প্রতীয়মান হয় নাই। তবে বিএনপি ত্যাগী ব্যারিষ্টার শাহজাহান ওমর স্বতন্ত্র বা এনসিপি’র ব্যানারে নির্বাচনে প্রার্থী হলে ঝালকাঠি-১ আসনের হিসাব নিকাশ পাল্টে যেতে পারে। তবে ঝালকাঠির দ’ুটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে নির্বাচনী লড়াই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।