বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের মানুষ বহু নির্বাচনে তাদের প্রকৃত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা আজ বাস্তবে প্রতিফলিত হতে যাচ্ছে। সারাদেশ থেকে সুসংবাদ আসা শুরু করেছে বলে জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মহান আল্লাহ যদি জামায়াতকে বিজয় দান করেন তবে সবাইকে সাথে নিয়ে দেশ গড়ার কাজ করবো, ইনশাল্লাহ।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকা-১৫ আসনের প্রধান নির্বাচনি কার্যালয়ে সাংবাদিকদেরকে ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান তিনি। এসময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবাররক হোসেন, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান, গাজীপুর মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আবু সাঈদ মুহাম্মদ ফারুক, ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল অব. হাসিনুর রহমান, মেজর অব. আখতারুজ্জামান, ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার কবির প্রমুখ।

জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ এরইমধ্যে দেখা গিয়েছে আমাদের ১১ দলীয় আসনের যারা ক্যান্ডিডেট ছিলেন তারা এগিয়ে আছেন। কিন্তু আমি আগেই বলেছি, এটিকে নিশ্চয়তা করার মতো পর্যায়ে আসেনি, আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। নির্বাচনের সার্বিক অবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বড় কোনো ঝামেলা ছাড়া ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। এতে আমরা সন্তুষ্ট। বিজয় একজনের হবে তাই হার জিত মেনে নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি সরকার গঠনের সুযোগ পাই তবে সব দল নিয়ে একসঙ্গে দেশ গড়ার কাজ করবো। সব দেশের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক আছে থাকবে, প্রতিবেশী দেশসহ।

এ সময় জনগণ ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে জামায়াতের আমীর বলেন, আপনাদের আমার অনেক প্রয়োজন। আপনাদের আমার পাশে পেতেই হবে। আপনারা যদি আমাকে সাহায্য করেন তাহলে ইনশাআল্লাহ আমরা দেশের জন্য ভালো কিছু করতে পারবো। আপনারা আমাদের যৌক্তিক সমালোচনা করবেন। ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন। গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘মিডিয়া রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। দেশ গড়ার কাজে আমরা গণমাধ্যমকে পাশে চাই। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আপনাদের ভালোবাসা ও সহযোগিতায় আমরা আগামী দিনগুলোতে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একই সংবাদ বিভিন্ন মাধ্যমে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। কেউ যদি অপরাধ করে থাকে, সে আমি হলেও আমি অপরাধের বিপক্ষে। কিন্তু যা অপরাধ নয়, সেটিকে জোর করে অপরাধ বানানো আরও বড় অপরাধ।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি যারা শাসনে থাকেন, মিডিয়া তাদের মন্দ-দিক, সমালোচনা সহজে তুলে আনেন না। অথবা আনতে পারেন না। যেটাই হোক আমরা চাইবো আমাদের মিডিয়া যেন পূর্ণ স্বাধীনতা পায়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলন এবং গত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় যারা অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং জীবন দিয়ে নতুন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন, তিনি তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। আল্লাহতায়ালার কাছে তাদের শহীদী মর্যাদা কামনা করেন। তিনি আরও বলেন, অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন, তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং তাদের জন্য দোয়া করছি। মহান আল্লাহ যেন তাদের জান্নাতের নেয়ামত দান করেন। জামায়াত আমিরের ভাষ্য, শহীদ ও আহতদের সাহসী লড়াইয়ের ফলেই আজকের এ বাংলাদেশ। তারা যদি সেদিন জীবন উৎসর্গ না করতেন কিংবা আহত না হতেন, তাহলে ১২ তারিখে ভোটগ্রহণ সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, মহান স্রষ্টার ইচ্ছাতেই বিশ্ব পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালে এমন পরিবর্তন ঘটবে এটি কেউ কল্পনাও করেনি, কিন্তু সেটিই এখন বাস্তবতা।

নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে নির্বাচন হলে তার মতো দলের নেতাসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা কারাগারে ছিলেন। তিনি নিজেও কারাবন্দি ছিলেন। ছয়-সাত মাস আগেও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বলে কেউ ভাবেনি, কিন্তু এখন বাস্তবতা বদলে গেছে।

জুলাই বিপ্লবের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতি এ ঘটনাকে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। যারা তা করবে না, তারা অকৃতজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হবে। বড় ধরনের সংকট থেকে আল্লাহতায়ালা জাতিকে মুক্ত করেছেন, তাই সেই বীরদের যথাযথ সম্মান জানানো সবার দায়িত্ব। ডা. শফিকুর রহমান জানান, চলমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামী তাদের নীতি ও ইশতেহার প্রকাশ করেছে এবং জনগণের সামনে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে।

দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে জামায়াতের আমীর: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা চাই, সরকারটা হোক জনগণের, কোনো দলের নয়, ব্যক্তির নয়, পরিবারের নয়। দল, ব্যক্তি ও পরিবারের গণ্ডি অতিক্রম করে ১৮ কোটি মানুষের সরকার কায়েম হবে আগামীকাল থেকে, সেটাই আমরা আশা করি।’ গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় ঢাকা-১৫ আসনে নিজের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন জামায়াতের আমীর।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ভালো নির্বাচন হলেই একটা ভালো সরকার তৈরি হবে। যে সরকার এ দেশের মানুষকে নিয়ে ভাববে। যে সরকার হবে জনগণের সরকার। আর জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে যদি কোনো সরকার গঠিত হয়, তাহলে ওই সরকার জনগণের দুঃখ-দরদ বুঝবে না এবং জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো সেতুবন্ধ থাকবে না।’

ভোট দেওয়ার পর জামায়াত আমীর যা বলেন: গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকায় মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের বালক শাখা কেন্দ্রে ভোট দেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ভোটের পরিবেশ নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, তখন সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজমান দেখেছি এবং ভোটার উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। এরপরে আমি ক্রমান্বয়ে অনেকগুলো সেন্টার দেখার চেষ্টা করেছি। আমি যেখানে যেখানে গিয়েছি, (তার মধ্যে) দু-একটা সেন্টার ছাড়া বাকি সেন্টারগুলোর টার্নআউট ছিল খুবই সন্তোষজনক। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে মণিপুর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

জামায়াত আমীর অভিযোগ করেন, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকেরা জোর করে ঢুকে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এই আসনের (ঢাকা-১৫) সর্বাধিক সংখ্যক ২৬ হাজার ভোট রয়েছে ওই কেন্দ্রে। সেই জায়গায় হঠাৎ করে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কিছু লোক বেপরোয়াভাবে ঢুকে পড়েন। তাঁরা ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং অহেতুক হস্তক্ষেপ করেন। এমনকি আমাদের যারা ভোটার এবং সমর্থক, তাদের শারীরিকভাবে নাজেহাল করেন।’ খবর পেয়ে জামায়াত আমীর ওই কেন্দ্রে যান বলে জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে গিয়ে দেখলাম যে সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিষয়টা হ্যান্ডেল করছেন। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করে বললেন যে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’

জামায়াত আমীর আরও বলেন, ‘আমি তখন তাঁকে (সেনা কর্মকর্তা) বলেছি যে ভোট আওয়ার শেষ হওয়ার পরে শুধু ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকারের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন আর যাঁরা বিভিন্ন প্রার্থীর এজেন্ট আছেন, তার বাইরে যেন কেউ ঢুকতে না পারে। ভেতরের পরিবেশটা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাইরের কেউ যেন অহেতুক জটলা এবং টেনশন সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবেন। ভোট শান্তিপূর্ণ হোক, সেটাই প্রত্যাশা করেন বলে জানান জামায়াতের আমীর। তিনি বলেন,‘ প্রত্যেকটি মানুষ পছন্দমতো ভোট দেবেন। ভয়ের সংস্কৃতি যেন তৈরি না হয়।’

জামায়াতের আমীর আরও অভিযোগ করেন, ‘এ পর্যন্ত সারা দেশের যে খবর আমরা পেয়েছি, বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি দলীয় যারা প্রার্থী, তাদের কর্মী-সমর্থকেরা বেশ কিছু জায়গায় সমস্যা তৈরি করেছে। ভোট শেষ হওয়ার পর গণনার সময় কোনো বিশৃঙ্খলা যদি তৈরি হয়, তাহলে জন আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হবে না বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের আমীর।

কিছু সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘আমরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেছি কিছু কিছু মিডিয়া খুবই হতাশাব্যঞ্জক রিপোর্ট করেছে। যে মিডিয়াগুলো চব্বিশের (জুলাই অভ্যুত্থান) পরিবর্তনে ভালো ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু কিছু মিডিয়ার ভূমিকা হতাশাব্যঞ্জক ছিল বলে আমি মনে করি। আমরা আশা করব মিডিয়া তার নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার জায়গায় অটল থাকবে। জামায়াত আমীর সকালে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ছোটখাটো কোনো বিষয় হলে অবশ্যই ইগনোর করব (এড়িয়ে যাব), কিন্তু বড় কোনো বিষয় হলে আমরা ছাড় দেব না। আমাদের যা করা প্রয়োজন, তা-ই করব। কারণ, মানুষের ভোটের অধিকার হারিয়ে যায়, এটা আমরা কোনোভাবেই চাই না।’

ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে রায় মেনে নেবো : ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে সেই রায় আমরা মেনে নেবো। অন্যদেরও তা মানতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বলে জানান জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াত আমীর আশা প্রকাশ করেন, এবারের ভোট শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু, সন্ত্রাস ও দখলমুক্ত এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

আগামী সরকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন সরকার গঠিত হোক, যা কোনও ব্যক্তি, পরিবার বা দলের সরকার হবে না বরং ১৮ কোটি মানুষের সরকার হবে। আমরা সেই সরকার গঠনের ব্যাপারে আশাবাদী। ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর বলেন, আমি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা ঘর থেকে বেরিয়ে আসুন, নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন এবং রাষ্ট্র গঠনের গর্বিত অংশীদার হোন।