বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিস্ট সরকার সারা দেশে বিএনপিসহ লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে গুম, খুনের মামলা দিয়ে জর্জরিত করা করেছিল। আমরা দেখেছি গত ১৫ বছরে উন্নয়নের নাম করে তারা কীভাবে দেশের মানুষের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে। ২০০৫ সালে আমি সিলেট এসেছিলাম, যখন সুনামগঞ্জে বন্যা হয়েছিল। তখন আমার আসতে সাড়ে চার ঘণ্টার মতো সময় লেগেছিল। কিন্তু আজ প্রায় ১০ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। সিলেটের এই পুণ্যভূমির বহু মানুষ আছেন যারা লন্ডনে যাতায়াত করেনÑলন্ডন যেতেও এত সময় লাগে না।

তিনি বলেন, বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রমাণ হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা যায়। ১৯৭১ সালে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ স্বাধীন করেছে। আর ২০২৪ সালে জনগণ দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছে। ২৪-এর গণআন্দোলনে সিলেট শহরে ১৩ জন জীবন দান করেছেন। এই প্রাণগুলোর বিনিময়ে আমরা মানুষের অধিকার আদায়ের পথে নেমেছি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে।

এর আগে সমাবেশে বক্তব্যের শুরুতে সবাইকে সালাম জানিয়ে তারেক রহমান সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় অভিবাদন জানিয়ে বলেন, ‘আফনারা ভালা আছইন নি।’

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টায় সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সিলেট ও সুনামগঞ্জ বিএনপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ১ম নির্বাচনী জনসভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, এই যে আপনারা এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছেনÑএই সমবেত হওয়ার পরিবেশ তৈরির জন্য হাজারো মানুষ গত ১৫ বছর ধরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। আপনাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আপনাদের বাকস্বাধীনতার অধিকার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজ আপনারা এখানে একত্রিত হয়েছেন। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমরা আমাদের মাঝ থেকে ইলিয়াস আলী, দিনার ও জুনেদকে হারিয়েছি। গত ১৫ বছর ধরে যারা দেশের টুঁটি চেপে ধরেছিল, বাকস্বাধীনতা, ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। তারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। তাদেরকে এই দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছে।

সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে, মহানগর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরীর যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে লক্ষ লক্ষ জনতা অংশ নেন।

এর আগে বহস্পতিবার সকাল থেকেই বিএনপির নির্বাচনী জনসভাকে ঘিরে আলিয়া মাদরাসা মাঠ ও আশপাশের সড়ক এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। সিলেট নগরীসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে দলে দলে নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হন। শীত উপেক্ষা করে বুধবার রাত থেকেই অনেক নেতাকর্মী মাঠে অবস্থান নেন।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে তারেক রহমান সভামঞ্চে ওঠেন। পরে দুপুর ১টার দিকে তিনি জনসভায় বক্তব্য শুরু করেন। সমাবেশে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার মোট ১১টি আসনের দল ও জোট মনোনীত প্রার্থীগণ বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের সহধর্মিনী ডা: জোবায়দা রহমান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান আরো বলেন, গত ১৫ বছরে আমরা দেখেছি নির্বাচনে কীভাবে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে, কীভাবে আমি-ডামি ও নিশিরাতের নির্বাচন হয়েছে। এসব তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার তথা রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আজ আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে, যারা সবার জন্য রাজপথে নেমে এসেছিলেন, বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন।

তারেক রহমান বলেন, স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে সংসার সুন্দর হয়। আমাদের মা-বোনেরা যেন আপনাদের পাশে থেকে সংসারকে স্বচ্ছলভাবে গড়ে তুলতে পারেনÑসে জন্য গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে সকল দুস্থ, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। কিন্তু এই ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করতে হলে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে হবে। বেগম খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন মা-বোনদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আগামী ধানের শীষের বিএনপি সরকার সেই শিক্ষিত মা-বোনদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চায়।

তিনি বলেন, ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ এখন মাঝপথে এসে দাঁড়িয়েছে। ধানের শীষের বিজয়ের মাধ্যমে টেক ব্যাক বাংলাদেশ সফলতার মুখ দেখবে। আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী, তরুণ সমাজের সদস্য বেকার হয়ে বসে আছেন। আমরা তাদের বেকার করে রাখতে চাই না। তাদের জন্য আমরা কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই। সিলেটের মানুষদের বড় একটি অংশ লন্ডন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যান। আমরা তাদের বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দিতে চাই। ভাষা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চাই। সরকার গঠন করলে আমরা তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলব, যাতে সারা পৃথিবীতে তাদের ছড়িয়ে দিতে পারি।

একটি দলের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, দোজখের, বেহেশতের, পৃথিবীর, কাবার মালিক আল্লাহ। যার মালিক আল্লাহ, সেটা অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। অথচ নির্বাচনের আগেই একটি দল জান্নাতের টিকিট দেওয়ার কথা বলছে-যার মালিক মানুষ নয়। সব কিছুর মালিকানা আল্লাহর, অথচ তারা শিরিক করছে। আগেই আপনাদের ঠকাচ্ছে-নির্বাচনের পরে কীভাবে ঠকাবে, একবার ভাবুন। তারা শুধু মানুষকে ঠকাচ্ছেই না, মুসলমানদের শিরিকের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, একটি চক্র বলছে অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছিÑএবার একে দেখেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই সময় কারা কী ভূমিকা রেখেছিল, কার ভূমিকার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্মানহানি হয়েছেÑবাংলাদেশের মানুষ তা দেখেছে। এই কুফরি, হঠকারিতা ও মিথ্যার বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের টেক ব্যাক বাংলাদেশে থাকতে হবে। আমরা দেশকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করেছি, এখন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু ভোট আর কথা বলার অধিকার নয়Ñমানুষকে স্বাবলম্বী করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ যেন ঠিকভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারে, নিরাপদে রাস্তায় চলতে পারেÑএই ব্যবস্থাই টেক ব্যাক বাংলাদেশ।

তারেক রহমান বলেন, যেমন দিল্লি নয়, তেমনি পিন্ডি নয়Ñনয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের মানুষই রাজনৈতিক সকল ক্ষমতার উৎস। তাই আমরা দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বিশ্বাস করি। বিএনপি শুধু ভোট ও কথা বলার অধিকার নয়Ñদেশের নারী সমাজ, মা-বোন, যুব সমাজ, কৃষকসহ প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চায়।

তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার সময়, খালেদা জিয়ার সময় যেভাবে দেশ এগিয়ে গিয়েছিল-কলকারখানা তৈরি হয়েছিল, কর্মসংস্থান হয়েছিল, মানুষ বিদেশে কাজের সুযোগ পেয়েছিল। আমরা আবার সেই ধারায় দেশ গড়তে চাই। তাই আমাদের অঙ্গীকার- করবো কাজ, গড়বো দেশÑসবার আগে বাংলাদেশ।

বক্তব্যের শেষে ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠিত হলে আমরা নবী করীম (সা:)-এর ন্যায়পরাণতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবো, ইনশাআল্লাহ।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন-বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সিলেট-৩ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী এম এ মালিক, উপদেষ্টা ও সিলেট-২ আসনের প্রার্থী তাহসিনা রুশদি লুনা, উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী, উপদেষ্টা ও সিলেট-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, উপদেষ্টা, সাবেক সিলেট সিটি মেয়র ও সিলেট-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট-৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ-৪ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী কয়ছর এম আহমদ, সুনামগঞ্জ-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুল প্রমুখ।