বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ে সংসদের ভিতরে-বাইরে আমাদের লড়াই চলবে। ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ-এর দক্ষিণ গেইটে সমাবেশের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাস থেকে ১৪০ বছর বিদায় নিয়েছে। শিকাগো শহরে যে বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে, সারা বিশ্বে তা প্রতি বছর পালিত হয়। জাতিসংঘ এটাকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিভিন্ন দেশে শ্রমিক সমাবেশে সরকারি দল ও বিরোধী দল হাজির হয়, বক্তৃতা দেয়, বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেয়— এই দেবো, সেই দেবো বলে; কিন্তু ১৪০ বছরে যদি তাদের ওয়াদার দশ ভাগের এক ভাগও বাস্তবায়ন করত, তাহলে এতদিনে শ্রমিকদের আর কোনো দাবি-দাওয়া অবশিষ্ট থাকত না।
ডা. শফিক বলেন, ৩৬৪ দিন সব আমরা ভুলে থাকি, আর পহেলা মে আসলে আমরা সবাই এই দাবিগুলো নিয়ে দরদি হয়ে মাঠে-ময়দানে নেমে পড়ি। আমাদের অবস্থাও তার ব্যতিক্রম কি না, আল্লাহ ভালো জানেন। সাধারণত দুনিয়ায় যদি প্রাপ্তবয়স্ক ও জনসংখ্যার হিসাব করা হয়, তাহলে প্রত্যেকটি সমাজেই অন্যান্য সকল পেশার চেয়ে শ্রমিকদের সংখ্যা হবে নিঃসন্দেহে বেশি। এ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন এবং মর্যাদাকে উপেক্ষা করে একটা সমাজ কখনো টেকসই হতে পারে না। সত্যিকারের উন্নয়ন আসতে পারে না। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে যারা নিজেদেরকে বামপন্থী বলে দাবি করেন, তারা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বেশি সংগ্রাম করেন। পাকিস্তান, এরপর বাংলাদেশ— ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। নেতা-নেত্রীরা আন্দোলনের সামনে চলে আসে, মাঠ গরম হয়, মানুষ নিহত হয়, আহত হয়, কিছু মানুষের চাকরি যায়। নেত্রীরা আড়ালে ভাগটা বুঝে নিয়ে যায়, তাদের ভাগ পেয়ে তারা সন্তুষ্ট হয়ে যায়। তখন গড়ে ওঠা আন্দোলনকে তারা ব্ল্যাকমেইল করে। এভাবে যুগ যুগ ধরে নেতা-নেত্রীর কপালের পরিবর্তন হলেও শ্রমিকের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা আবার শ্রেণিসংগ্রামের আওয়াজ তোলে। শত্রুপক্ষ খতম করতে হবে? মালিকরা যদি না থাকে, শ্রমিকরা কাজ করবে কোথায়? আমরা ওই খতমের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও ভালোবাসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আমরা বিশ্বাস করি, মালিক যদি শ্রমিকের ওপর ইনসাফ করে, শ্রমিকরা সমস্ত যোগ্যতা উজাড় করে মালিককে সহযোগিতা করবে, কাজ করবে। কিন্তু মালিক যদি শ্রমিককে ঠকায়, ওই শ্রমিক আর মালিকের জন্য সমস্ত যোগ্যতা উজাড় করে কিছু করবে না। এতে উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা কারও ক্ষতি চাই না।

তিনি আরও বলেন, আজকে বাংলাদেশে ১৬ কোটি, ১৮ কোটি, ২০ কোটি— বিভিন্ন কথা বলা হয়। এর মধ্যে বিশাল অংশজুড়ে শ্রমিকদের পদচারণা। শুধু দেশের ভিতরে নয়, বাইরেও অনেক শ্রমিক আছে।
তারা সামান্য রুটি-রুজির আশায়, একটু আশ্রয়ের আশায়, ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রের নৌকার ওপর চড়ে বসে। তারপর সমুদ্রের একটি ঢেউ এসে তাদেরকে সমুদ্রের পেটের মধ্যে হজম করে বসে। আর কেউ ভাগ্যবশত চলতে চলতে, ঘুরতে ঘুরতে কোনো রকমে কোনো একটি বন্দরে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। ওখানে ভিড়ার পর কারও জায়গা হয় জেলখানায়, কারও জায়গা হয় বন-জঙ্গলে। তারপর আস্তে আস্তে পথ খুঁজে নেয়। তারা দেশের মাটিতে প্রাসাদ করার চিন্তা করে না, তাদের জীবনের অর্জিত সম্পদ আপনজনদের জন্য দেশে পাঠিয়ে দেয়। আর যারা বৈধ পথে বিদেশ যায়, তারা সিন্ডিকেটের হাতে, দালালদের খপ্পরে পড়ে। প্রয়োজনের তুলনায় তিন গুণ, চার গুণ বেশি টাকা দালালদের দিয়ে যেতে হয়। যারা সেই টাকাটা শোধ করতে পারে না, তারা মানবেতর জীবন যাপন করে। বিদেশে তাদেরকে আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। তিন জনে একটি সিট ভাগাভাগি করে শিফট করে। এই সিটের প্রস্থ হচ্ছে আড়াই হাত। একজন ঘুমাইলে আরেকজন ঘুমাইতে পারে না। একজনের ঘুম না ভাঙলে আরেকজনকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। তাদের সুখ স্যাক্রিফাইস করে দেশে টাকা পাঠায়। আমরা খুব সুন্দর করে বলি ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’, কিন্তু এই যোদ্ধাদের আমরা মর্যাদা দিই না। তারা যখন পাসপোর্ট রিনিউ করতে যায়, তখনও দালালদের খপ্পরে পড়ে কষ্ট পায়। বছরের পর বছর যায়, মিশন আছে, হাইকমিশন আছে— সেখানকার কর্মকর্তাদের কাজ কী তাহলে? তারা থাকতে আমাদের ভাই-বোনদের সেখানে ভোগান্তি পোহাতে হয়। যে সমস্ত এম্বাসি সেখানে কাজ করতে না পারে, সেই সমস্ত এম্বাসি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
জামায়াত আমির বলেন, রাজনীতি হলো সংশোধনের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। গতকাল সংসদে আপনাদের পক্ষে কথা বলেছি। আমরা ওখানে গালমন্দ করতে যাইনি, ইতিহাসের ছাত্র কিংবা মাস্টার হতে যাইনি। আমরা ওখানে গিয়েছি এ দেশের দুঃখী মানুষের পক্ষে কথা বলতে। আপনারা দোয়া করবেন, যতদিন সংসদের ভিতরে থাকব, ততদিন যেন আপনাদের জন্য লড়াই করে যেতে পারি। আর বাইরের লড়াইও চলবে ইনশাআল্লাহ। শ্রমিক অঙ্গনের ন্যায্যতা ও মর্যাদা যতদিন প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক লস্কর মো. তসলিমের সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন ফেডারেশনের সদ্যবিদায়ী সভাপতি সাবেক এমপি আ ন ম শামছুল ইসলাম, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-এর সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ সিবগা, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন। এতে আরও বক্তব্য রাখেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুন খান, কবির আহমদ, মজিবুর রহমান ভূইয়া, সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, আব্দুস সালাম, মুহিব্বুল্লাহ, আখতারুজ্জামান, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নুরুল আমিন। এসময় উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ আজহারুল ইসলাম, ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, প্রকাশনা সম্পাদক জামিল মাহমুদ, প্রচার সম্পাদক হাফিজুর রহমান প্রমুখ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আ. ন. ম. শামছুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক বাঁচলে মালিক বাঁচবে, শিল্পও বাঁচবে। এজন্য শ্রমিকদের জন্য সকলে একযোগে কাজ করতে হবে। সব সময় শ্রমিকদের বিপদে তাদের পাশে থাকতে হবে। আমি আশা করি, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। তারাই শ্রমিকের মুখে হাসি ফোটাতে পারবে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এসেও আজও শ্রমিকের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি। তার অন্যতম কারণ একশ্রেণির তথাকথিত নেতা, যারা বিভিন্ন ইস্যুতে শ্রমিকদের উসকিয়ে দিয়ে মালিক-ফ্যাক্টরির ক্ষতি সাধন করে। আবার রাতের আঁধারে মালিকের সঙ্গে সমঝোতার নামে নিজেদের পকেট ভারী করেছে। ফলে শ্রমিকের কোনো উন্নয়ন হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী শ্রমনীতির বাস্তবায়ন ছাড়া শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশে সবাই ক্ষমতায় যাওয়ার আগে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলে, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তাদের কথা ভুলে যায়। এ সরকারও তেমনি শ্রমিকদের কোনো অধিকার নিয়ে আইন পাস করেনি এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রতি ক্ষেত্রে শ্রমিক আজ অবহেলিত। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে শ্রমিক। সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছে শ্রমিক জনশক্তি। কিন্তু তারা আবারও উপেক্ষিত হচ্ছে।
সেলিম উদ্দিন বলেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন এ দেশের শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধি। শ্রমিক দিবসের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমেই শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।
ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ বলেন, জুলাই বিপ্লবের প্রধান নিয়ামক শক্তি ছিল শ্রমিক জনগোষ্ঠী, কিন্তু তারা বরাবরই বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ছাত্রসমাজ আবারও প্রয়োজনে মাঠে নামবে ইনশাআল্লাহ।