প্রতিনিয়ত বহিষ্কারসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও বিএনপিতে কোন্দল যেন থামছেই না। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নানাভাবে কোন্দলে জর্জরিত দলটি। ঐতিহাসিক ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও বাড়তে থাকে। ফুটপাতের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার কেবল টিভির লাইন দখল ও নানামুখী চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপির কোন্দল বেড়েই চলেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত যেন আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নিজেদের কোন্দলে খুন-জখম যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা হলেও এটির দায় কোনভাবেই দল এড়াতে পারেন বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, দলের এ কোন্দলের প্রভাব পড়বে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও। এছাড়া ব্যাপক অভ্যন্তরীণ কোন্দলের পাশাপাশি নির্বাচনকেন্দ্রিক একাধিক নেতার নানামুখী পদচারণা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এমনকি কিছু নেতাকর্মীর অনৈতিক কর্মকান্ডে সময়ের ব্যবধানে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা নিয়ে সংশয় আছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে।
সূত্র মতে, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠানে এক মাসও বাকি নেই। দলীয় প্রধানের দেশে আসার পরও বিএনপি নেতাকর্মীদের কর্মকান্ডে জনমনে এখনো কিছু অনিশ্চয়তাসহ নানা প্রশ্ন তৈরী হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। এমনকি দলীয় কোন্দলকে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব বলেও মন্তব্য করছেন পর্যবেক্ষক মহল। একশ্রেণির নেতাকর্মীদের অনৈতিক কর্মকান্ডের দুর্ভোগ আমজনতাকে ভোগ করতে হলেও দায় মেনে নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানোরসহ তা প্রতিরোধের মতো নেতার সংকট সৃষ্টি হয়েছে দলটির মাঝে।
এদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একের পর এক নেতাকর্মী হত্যায় বিএনপির হাইকমান্ডের ভূমিকায় তৃণমূলে হতাশা বাড়ছে। তারা বলছেন, মাত্র এক মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দলের অনেক নেতাকর্মী। কয়েকজন খুনের পর প্রতিক্রিয়া দেখালেও সবশেষ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির হত্যায় গা ছাড়া মনোভাবের কারণে অনেকেই আশাহত।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হযেছে, রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতায় ২০২৫ সালে ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শুধু ডিসেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৭০টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৩ জন। তালিকায় রয়েছে ঢাকা, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ একাধিক জেলা।
সূত্র মতে, গত ৩ জানুয়ারি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে গুলী করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৯ জানুয়ারি জয়পুরহাটে যুবদল নেতা ইয়ানুল হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত ১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরে এক বিএনপি নেতা কুপিয়ে হত্যার শিকার হন। ১৭ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীতে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক বিরু মোল্লাকে গুলী করে হত্যা করা হয়। সবশেষ ঢাকায় কাওরান বাজারে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা। দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির নেতাকর্মীরা এমন হামলা-হত্যার শিকার হলেও আগের মতো দৃঢ় বা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না দলটির হাইকমান্ড। শোক জানিয়ে অনেকটা দায় সারা হচ্ছে। হত্যার বিচার দাবিতে জোরালো কোনো আন্দোলন, সভা-সমাবেশ কিংবা মানববন্ধনও দেখা যায়নি। মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডে কিছু প্রতিক্রিয়া, দলীয় কার্যালয়ের সামনে জানাযা হলেও সেখানে দলের শীর্ষ নেতাদের কাউকে অংশ নিতে দেখা যায়নি। এছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে হত্যাকান্ডকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন বলেও মনে করছেন কেউকেউ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা হামলা ও খুনের শিকার হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই নিজেদের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই হচ্ছে। তাই এসব বিষয় নিয়ে তেমন কিছু করতে পারছে না বিএনপি। এছাড়া আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরব হচ্ছে না, যাতে নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি নেতিবাচক না হয়। এই নীরবতা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুর রহমান মুসাব্বির এবং চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার হত্যাকাণ্ডের পর। বিএনপি এসব হত্যাকান্ড বা হামলার ঘটনাকে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক ও নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পরও দুষ্কৃতকারীরা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। এই হত্যাকাণ্ড সেই অপতৎপরতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছেন, রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হত্যার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব ঘটনা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না।
দলের শীর্ষ নেতাদের এমন বক্তব্যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মোরশেদ আলম। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি সালাহউদ্দিন আহমদ ও নিহত মুসাব্বিরের ছবি শেয়ার করে লেখেন, ‘প্রিয় নেতা, শ্রদ্ধার সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনি যখন গুম হয়েছিলেন, তখন এই মুসাব্বিররাই রাইফেলের মুখে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল আপনার সন্ধান ও মুক্তির জন্য। তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে আমরা কিছুটা আশাহত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি। তার প্রথমেই সরাসরি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা উচিত ছিল।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় নেতাকর্মীরা আক্রান্ত হলেও দলের জোরালো প্রতিবাদ হচ্ছে না। জড়িতদের বিচার দাবিও করা হচ্ছে না। কারণ হিসেবে অনেকেই বলছেন, যাদের বিচার দাবি করা হবে, তারাও দলীয় লোক। এখানে স্থাণীয় রাজনিিতও কাজ করে। তাই এখন সেভাবে হচ্ছে না। সেভাবে আন্দোলনও গড়ে উঠছে না।
এ ধরনের নীরবতা শুধু ঢাকা নয়, অন্য এলাকায়ও প্রশ্ন তুলছে। গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা জানে আলম শিকদার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি। যুবদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি রেজাউল কবির পল বলেন, প্রতিবাদ হচ্ছে, দল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। অনেক সময় কেন্দ্রীয় সংগঠন জানেও না।
জানা গেছে, অন্তকোন্দলের কারণে অনেকেই নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করছেন। অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চেয়ে আবেদনও করেছেন। গোপালগঞ্জে নিজের নির্বাচনী এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে চলছেন। গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসনে বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী এক মতবিনিময় সভায় প্রকাশ্যে তার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখিয়ে বলেন, আমাদের জীবনের হুমকি আছে,এটা সত্য। তারপরও জনগণের পাশে থাকার ঝুঁকি আমি নিয়েছি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়পুরহাট-২ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন মো. আব্বাস আলী। তিনি বলেন, সবশেষ জয়পুরহাটে যুবদলের যে নেতা হত্যার শিকার হলেন সেখানে কেন্দ্র থেকে কোনো প্রতিবাদ বিবৃতি আসেনি। কেন আসেনি সেটা আমি জানি না। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারাদেশে বিএনপির অন্তত ২৫-৩০ জন নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। ইনকিলাব মঞ্চের শরিফ ওসমান হাদি হত্যার পর যেভাবে প্রতিবাদ হয়েছে, বিএনপি নেতাকর্মী হত্যায় সে হিসেবে প্রতিবাদ হচ্ছে না। দলের উচিত সরব হওয়া।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঠেকাতে কিছু অপশক্তি বাধা সৃষ্টি করতে চায়।অনেকেই নানাভাবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্থ করতে চায়। তবে এ দেশের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামে পরিশুদ্ধ। এভাবে হামলা বা খুন করে গণতন্ত্রের যাত্রা থামানো যাবে না। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। এটি সরকারের দায়িত্ব। আমরা সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছি।
রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অনেকগুলো হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এগুলো রাজনৈতিক না ব্যক্তিগত, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অনেকেই এগুলোকে না দেখার ভান করছেন। তবে এমন ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাই তুলে ধরছে। নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি থানায় সেনাবাহিনী মোতায়েন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জানা গেছে, বর্তমান সময়ে কোন্দল মূলত নির্বাচনের প্রার্থীতাকে ঘিরেই। প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে চট্টগ্রামের অর্ধেক আসনেই দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত ও মনোনয়নবঞ্চিতদের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, প্রার্থী তালিকা বৈধ হবার পর বিরোধ মিটে যাবে। দলীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে সব ধরনের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাতে উদ্যোগ নেয়া হবে। অন্যদিকে সিলেটে মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে কোন্দল সামনে এসেছে বিএনপিতে। প্রায় আসনে বিএনপিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। একই অবস্থা দেশের প্রায় সব বিভাগীয় আসনেই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন, মূলত চাঁদাবাজি ও দখলবাজিকে কেন্দ্র করেই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়াচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। যেহেতু আগামীতে এমপিদের আস্থাভাজনরাই প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তাই মনোনয়নকে কেন্দ্র করে কোন্দল আরও বাড়ছে। এ অবস্থায় জনগণকে ক্রমশ বিতশ্রদ্ধ করে আস্থার পরিস্থিতিকে ক্রমশ তলানিতে পৌঁছে দিচ্ছে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। পাশাপাশি চাঁদাবাজ-দখলবাজদের কঠোরভাবে দমনসহ প্রার্থী মনোনয়নে ত্যাগীদের অবমূল্যায়নে ব্যর্থতা হিসেবেও বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।