অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার দেশের মাটিতে পা রাখবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে তিনি যাবেন রাজধানীর তিনশ ফিটে সংবর্ধনাস্থলে যাবেন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে। সেখান থেকে তার গুলশানের বাসভবনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছে বিএনপি। তার প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢল নামাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। উপস্থিতির দিক দিয়ে অতীতের সব রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের রেকর্ড ভাঙার প্রত্যাশা বিএনপির। বিমানবন্দর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতাল ও গুলশানের বাসা পর্যন্ত অর্ধকোটি মানুষের সমাগম ঘটাতে চায় দলটি।

ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময় ২০০৮ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে যান তারেক রহমান। এরপর থেকে সেখানেই অবস্থান করছিলেন। তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান কয়েকবার দেশে এলেও তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারেননি। অবশেষে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিএনপি সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন তারেক রহমান।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, সংবর্ধনায় কমপক্ষে ৫০ লাখ মানুষের উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন তারা। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের শক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যও রয়েছে এই আয়োজনের পেছনে। গতকাল মঙ্গলবার সংবর্ধনা মঞ্চ পরিদর্শন শেষে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেদিন তার সংবর্ধনায় মানুষের মহামিলন হবে। আশা করছি অর্ধকোটি মানুষের উপস্থিতি হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একাধিক রাজনৈতিক নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বিপুল জনসমাগমের নজির রয়েছে। বিএনপি নেতাদের দাবি, তারেক রহমানের দেশে ফেরা উপলক্ষে যে উদ্দীপনা ও প্রস্তুতি তারা নিয়েছেন, তাতে উপস্থিতির দিক দিয়ে অতীতের সব আয়োজনকে ছাড়িয়ে যাবে এই গণসংবর্ধনা। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দেশে ফেরা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সে কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই সংবর্ধনায় অংশ নেবেন বলে তারা আশা করছেন।

সূত্র মতে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে রাজধানীর কুড়িলের ৩০০ ফুট এলাকায় গণসংবর্ধনার আয়োজন করেছে দলটি। সর্বোচ্চ জনসমাগম নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো আয়োজন সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ রাখতে কাজ করছেন নেতাকর্মীরা। নিরাপত্তা নিশ্চিতে দলের পাশাপাশি সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি পেয়েছে দলটি। মঞ্চ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দফায় দফায় দলটির শীর্ষ নেতারা অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহস্পতিবার পৌনে ১২টার দিকে তারেক রহমান দেশে নামার পর বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফুটের গণসংবর্ধনা স্থান এবং গুলশান পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, সংবর্ধনায় অংশ নিতে ইতোমধ্যে সারাদেশ থেকে নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেছেন। আজ বুধবারের মধ্যে অনেকে চলে আসবেন ঢাকায়। দলের শীর্ষ নেতারা তারেক রহমানকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাবেন। এ ছাড়া ঘোষিত সম্ভাব্য প্রার্থী, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থেকে এদিনের কর্মসূচি সফল করবেন।

এদিকে বিএনপির আবেদনের প্রেক্ষিতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ২৫ ডিসেম্বর সারাদেশের ১০টি রুটে চলবে স্পেশাল ট্রেন। কক্সবাজার থেকে পঞ্চগড়, খুলনা থেকে রাজশাহী দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্ত থেকে ঢাকামুখী হচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। রেলওয়ে জানিয়েছে, এদিন স্পেশাল ট্রেন ও অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের মাধ্যমে আনুমানিক ৩৬ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হবে। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি-২০২৫ কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার সার্বিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে ট্রাভেল পাস হাতে পেয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি ২০২০ ফ্লাইটে টিকিট বুকিং করেছেন তারেক রহমান। ফ্লাইটটি ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। সব ঠিক থাকলে বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের উড়োজাহাজটি ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবে। এই ফ্লাইটের বিজনেস ক্লাসে তারেক রহমানের পাশাপাশি আরো পাঁচ সফরসঙ্গীর টিকিট বুকিং দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। এ ছাড়া তারেক রহমানের মিডিয়া টিমের প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ, পারসনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট আব্দুর রহমান সানি ও তাবাসসুম ফারহানা নামে আরেকজন আছেন।

জানা গেছে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের দিন বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। তার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামকে। তার নেতৃত্বে চেয়ারপার্সন সিকিউরিটি ফোর্সসহ একাধিক নিরাপত্তা টিম দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি দলের বিশ্বস্ত নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে আলাদা একটি সমন্বয় টিম। বিএনপি সূত্র জানায়, নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এ নিয়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনও বৈঠক করছে। বিমানবন্দর থেকে গুলশানের বাসা পর্যন্ত তারেক রহমানকে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা দিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারেক রহমান দেশে এলে তার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ কোনো ঝুঁকির তথ্য নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার নিরাপত্তায় কোথাও যেন কোনো ফাঁক না থাকে, এ বিষয়টি জোরালোভাবে তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশে ফেরার পর তারেক রহমান যাতায়াতের সময় পাবেন পুলিশি পাহারাসহ বিশেষ নিরাপত্তা। এ ছাড়া তার বাসভবন ও অফিসেও থাকবে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে তার ধারে কাছে ভিড়তে দেবে না পুলিশ। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও গোয়েন্দারা তারেক রহমানের নিরাপত্তার দিক দেখভাল করবেন।

অন্যদিকে নিরাপত্তাজনিত হুমকির কথা উল্লেখ করে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরার আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) নিরাপত্তার আবেদন করেছে দলটি। তবে এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে নিরাপত্তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তারেক রহমানের ব্যবহারের জন্য ইতোমধ্যে দুটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনা হয়েছে। একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো এলসি ২৫০ মডেলের বিশেষ ‘হার্ড জিপ’, যা বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া একটি বুলেটপ্রুফ বাসও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এদিকে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় অন্তত ৯টি চেকপোস্ট চালু রয়েছে। তারেক রহমানের আসার আগে চেকপোস্টের সংখ্যা আরো বাড়ানো হতে পারে, প্রয়োজন অনুযায়ী তার বাসভবনের আশপাশেও নিরাপত্তা বাড়ানো হবে বলে জানা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী ২৭ ডিসেম্বর তারেক রহমান ভোটার হবেন। গত সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ২৫ তারিখ হচ্ছে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ২৬ তারিখ। শনিবার ২৭ তারিখ। নির্বাচনকালীন এই সময় নির্বাচন কমিশনের অফিস সব খোলা থাকে। সেই দিনই এই ভোটার হওয়া ভোটার আইডি বা ন্যাশনাল আইডি হওয়া সংক্রান্ত যা কিছু আছে, তিনি এই ২৭ তারিখে করবেন।

সংবর্ধনায় উপস্থিতির ইতিহাস সৃষ্টি হবে এমনটা দাবি করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবীন বলেন, ঢাকা মহানগরের সব ওয়ার্ড, থানা থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাস সৃষ্টি হবে বৃহস্পতিবার। জনসমুদ্রে পরিণত হবে ঢাকা।

যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোনায়েম মুন্না বলেন, আমরা সংখ্যা বলছি না। তবে দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে চাই। স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও সংবর্ধনায় অংশ নিতে আসবেন। আশা করি ঢাকায় অতীতের যেকোনো প্রত্যাবর্তনকে ছাপিয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জনসমাগম যত বড়ই হোক, সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করতে হবে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে প্রিয় নেতাকে শুভেচ্ছা জানাবেন। কোনো বিশৃঙ্খলা বা অরাজকতা করা যাবে না। তারেক রহমান তার মাকে দেখে বাসায় পৌঁছানো পর্যন্ত সবাই শৃঙ্খলার সঙ্গে অবস্থান করবেন।

যাত্রীদের পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে বের হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ অনুরোধ জানায় বিমান। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আগামী ২৫ ডিসেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা, বিমানবন্দর থেকে গুলশানগামী সড়ক এবং পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফিট সড়ক)-তে ব্যাপক জনসমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হতে পারে। এমতাবস্থায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের সব যাত্রীদের ওই দিন পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হল। আপনাদের যাত্রা সুষ্ঠু, সুন্দর ও নির্বিঘœ হোক।

দেশে ফেরার পর যেকোনো সময় বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে যাওয়ার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, প্রত্যাবর্তনের পরদিন শুক্রবার তিনি সেখানে যেতে পারেন। আবার কেউকেউ বলছেন, শনিবার তার ভোটার হবার কথা রয়েছে। সেদিনও তিনি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে পারেন।