আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দুই জোটে আবর্তিত হচ্ছে দেশের রাজনীতি। নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই নিজেদের চূড়ান্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের কেউ কেউ নির্বাচনী জোটে জায়গা করে নিচ্ছেন আবার কেউ নিজের দল বিলুপ্ত করে অন্য দলে যোগ দিচ্ছেন। আবার কেউ অস্তিত্ব রক্ষা করেই দেন দরবার করে নিজেদের আসন সমঝোতায় অংশ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে মূলত দুটি জোটেই আবর্তিত হচ্ছে দেশের রাজনীতি।
জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা ৮ দলের জোটের সঙ্গে গতকাল রোববার যোগ দিয়েছে জুলাই আন্দোলনকে ধারণ করে গড়ে উঠা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি। একইদিনে যোগ দেয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহচর বিএনপির সাবেক শীর্ষ নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত ড. অলি আহমদের দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক দল এলডিপি। এতে ৮ দল পরিণত হয়েছে ১০ দলীয় জোটে।
শুক্রবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের সঙ্গে আসন সমঝোতায় অনেকেই আসতে চায়। তাদের সবাইকে বলেছি, আমাদের সঙ্গে আসতে হলে তিনটি শর্ত মানতে হবে। অঙ্গীকার করতে হবে যে, নিজে দুর্নীতি করব না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব না। দ্বিতীয় হলো-সবার জন্য ন্যায় ইনসাফ কায়েম করতে হবে। কোনো প্রকার বৈষম্য করা যাবে না। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ সর্বস্তরে সংস্কার করতে হবে। এ সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যারা এই তিন প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের সঙ্গে আসতে চান, আসতে পারেন।
এই ঘোষণার একদিন পর গতকাল রোববার দুটি দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দলের জোটভুক্ত হলো। এর মধ্যে জুলাই আন্দোলনের আবেগকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি। ধারণা করা হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের আবেগকে কাজে লাগিয়ে সারাদেশের ভোট টানার চেষ্টা করবে এনসিপি। সেইসাথে একজন শীর্ষ বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল ওলির নেতৃত্বে গড়ে উঠা এলডিপির যোগদানের মধ্য দিয়ে জোটকে গ্রহণযোগ্যতার শীর্ষে নিয়ে যাবে।
বাস্তবতা হলে এই জোটে যারা যোগ দিয়েছেন এবং যেসব আসনে নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাবেন তাদের বিপরীতে কোন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকছে না। এজন্য যারাই এই জোটে যোগ দিবেন তারা বিদ্রোহীমুক্তভাবে নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন।
এদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতৃত্বেও বেশ কিছু দল ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। ইতিমধ্যে কেউ কেউ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। আবার কোন কোন দল নিজের অস্তিত্ব রেখেই যোগ দিচ্ছেন। বিশেষ করে বাম দলগুলোর বেশির ভাগ বিএনপির সঙ্গে যোগ হচ্ছেন। তবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও বিএনপির সঙ্গে যোগ দিয়ে ৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে।
গতকাল রোববার পর্যন্ত দেখা দেখা গেছে, আসন সমঝোতার মাধ্যমে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে ৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। বাম জোটের কয়েকজনকে আসন ছাড় দিয়েছে দলটি। এরই মধ্যে কয়েকজন নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তাঁরা হলেন, বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। আর এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সর্বশেষ শনিবার বিএনপিতে যোগ দেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান।
এদিকে জোট করার দৌড়ে এগিয়ে থাকা বাকী দলগুলো দু এক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নিবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তলে তলে আলোচনা চূড়ান্ত হয়ে আছে ইতিমধ্যেই। বাকী কেবল ঘোষনা। আজ কালের মধ্যেই তাদের জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে।
প্রসঙ্গত, ভোটের রাজনীতিতে এত দিন বড় দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিত জোটের ছোট দলের প্রার্থীরা। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে নির্বাচন কমিশন। সে অনুযায়ী, অন্য দলের সঙ্গে জোট করলেও নিজের দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে প্রার্থীকে। একারণে নিজের প্রতীকে পাশ করার নিশ্চয়তা পায়নি অনেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আদর্শগত মিল ও ভোটের কৌশল বিবেচনায় বড় দলের প্রতীকে নির্বাচন করার জন্যই যোগ দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। এ পরিস্থিতিতে বড় দলের ছায়াতলে গিয়ে নির্বাচনী সমীকরণে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল বেছে নিচ্ছেন ছোট দলের নেতারা। তবে নিজের দল বিলুপ্ত করে এরকম বড় দলের প্রতীকে নির্বাচনের নেতিবাচক প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। এই সমীকরণে বড় দলগুলো আসন ছাড় দিলেও মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক দুর্বলতা, সীমিত ভোটব্যাংকের কারণে তাঁরা নির্বাচনে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েন। এর প্রকিষ্ঠ উদাহরণ বড় দলের মাঠে থাকা প্রার্থীরা অনেক সময় বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে যান। তাতে বিপাকে পড়েন আসন সমঝোতায় প্রার্থী হওয়া ছোটদলগুলোর নেতারা।
অসুবিধার বিষয় হলো বিএনপির শরিকদের ছাড় দেওয়া আসনে অনেকে বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনের ঘোষণা দিতে পারেন। তাতে বিপাকে পড়বেন জোটের প্রার্থীরা। তবে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট এবং আসন সমঝোতা করা দলগুলোর ক্ষেত্রে এমনটা হবে না। এমনটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।