ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় দুই রাজনৈতিক জোটে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। চলছে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনাও। এবার জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট নিয়েই বেশি আলোচনা চলছে। জানা গেছে, নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এই জোটের পরিধি আরও বাড়ছে। তাদের জোটে যোগ দিচ্ছে আরও ৪টি দল। ফলে ৮ দল এখন পরিণত হতে যাচ্ছে ১২ দলে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), আ স ম রবের জেএসডি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে আলোচনা চলছে। সূত্রে জানা গেছে, খুব শিগগির তারা আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের ঘোষণা দিবেন।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল শনিবার রাতে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, আজ রোববার (২৮ ডিসেম্বর) এই জোটের ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, ফাইনালি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি জোটে যাচ্ছে। রোববার ঘোষণা দেওয়া হবে।
সূত্র জানিয়েছে, এনসিপি ছাড়াও আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে ৮ দলীয় জোটের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। সমমনা দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বে আছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, মানসিকতার সংকট ছাড়া আর কোনো সংকট নেই। এখানে শুধু আসন সমঝোতা নয়, রাজনৈতিক সমঝোতাও প্রয়োজন।
জানা গেছে, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডির দিক থেকেও আসন সমঝোতার লক্ষ্যে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ দেখানো হয়েছে। এর আগে ২৪ ডিসেম্বর অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি বিএনপির সঙ্গ ছাড়ার ঘোষণা দেয়। তার সঙ্গেও বিএনপির সমঝোতা হয়নি। তার দলের মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করবেন, সেই নিশ্চয়তা পেয়েছেন। আসন সমঝোতা না হওয়ায় লেবার পার্টি বিএনপির সঙ্গে ২০ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। দলটি জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছে বলেও আলোচনা আছে। লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, জামায়াতের সঙ্গে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে জামায়াতসহ সমমনা অন্য দলগুলো এলডিপির কর্নেল অলির মতো লেবার পার্টিকেও পাশে চায়।
পাঁচ দফা দাবি নিয়ে অনেক দিন ধরেই আন্দোলনে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল। এ দলগুলোর মধ্যে রয়েছে পীরসাহেব চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাগপা ও বিডিপি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থী বাছাই শুরু করে এ আট দল। জানা গেছে ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ সমঝোতার কাজ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ কিছু আসনে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, মূলত কোন আসনে কোন প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং শীর্ষ নেতৃত্ব কোন আসনে আছেন এর ওপর ভিত্তি করে প্রার্থী ঠিক করা হবে। এ জন্য প্রত্যেক দল নিজেরা ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়েও জরিপ চালিয়েছে। তার ওপর ভিত্তি করে সম্প্রতি দফায় দফায় বৈঠক করেছে দলগুলোর লিয়াজোঁ কমিটি। সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনের নেতাদের সমন্বয়ে গড়া দল এনসিপি জামায়াত জোটে আসার আলোচনা শুরু হয়েছে। জানা যায়, তাদের আসন কতটি দেয়া হতে পারে তা নিয়ে গত কয়েক দিনে জামায়াত জোটের নেতাদের সাথে আলোচনা চলে। এনসিপি ৩০টির মতো আসন দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের কতটি আসন দেয়া হবে তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
দলগুলোর নেতাদের সূত্রে জানা যায়, এনসিপির বর্তমানে মাঠপর্যায়ে তেমন নেতাকর্মী না থাকলেও জুলাই আন্দোলনে তাদের ভূমিকাকে মূল্যায়ন করতে চায় জামায়াত জোট। এ ছাড়া সংস্কারের পক্ষে এনসিপির অবস্থান এ জোটে আসার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা শুরু থেকেই একক, যৌথ বা আসন সমঝোতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের বিষয়ে ওপেন ছিলাম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াত এবং আরো রাজনৈতিক দলের সাথে আমাদের জোট গঠন বা আসন সমঝোতার বিষয়ে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতি মূল্যায়নের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংস্কার প্রশ্নে কারা বেশি আগ্রহী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সে বিষয়টিকেই এনসিপি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক আট দলের লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম সদস্য শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে সবাই অত্যন্ত আন্তরিক। ২৬০টির মতো আসনে আমরা সমঝোতায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। সর্বশেষ নতুন কিছু দলের আট দলের সাথে যুক্ত হওয়ার আলোচনা চলায় বিষয়টি চূড়ান্ত করতে কিছুটা সময় যাচ্ছে। আশা করি খুব দ্রুতই আলোচনা শেষে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করব।
খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী গণমাধ্যমে বলেন, নতুন কিছু দল যুক্ত হলে সেক্ষেত্রে সব দলকে কিছু আসন করে ছাড়তে হবে। এটি নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও সবাই জোটের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে আন্তরিক। এ জন্য জোট ভাঙার কোনো প্রশ্ন নেই। আশা করছি দু-এক দিনের মধ্যে আমরা সমঝোতায় পৌঁছে যাবো এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে।
আট দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমে বলেন, সর্বশেষ আরো চারটি দলের আমাদের সাথে যুক্ত হওয়ার আলোচনা চলছে। আরো চার দল যুক্ত হলে সেক্ষেত্রে আট দলের সব দলকেই কিছু আসন ছাড়তে হবে। এটি নিয়েই সর্বশেষ আলাপ চলছে দলগুলোর মধ্যে। তবে সবাই আন্তরিক। সংস্কারের পক্ষে ও ইসলামী শক্তির একবাক্সের নীতিতে এখনো সবাই অটল আছে। সবাই ছাড় দেয়ার ব্যাপারে আন্তরিক।