ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন দাখিলের সাথে সম্পদ বিবরণী হলফনামা আকারে দাখিল করেছেন প্রার্থীরা। এসব হলফনামা পর্যালোনা করে দেখা গেছে, গত অর্থ বছরে সর্বনিম্ন আয় হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের। তিনি কৃষি খাত ও দান মিলিয়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা আয় করেছেন। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গত অর্থ বছরে শেয়ার, বন্ড ও ব্যাংক আমানত থেকে আয় হয়েছে ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা। আর পরামর্শ থেকে আয় করে শীর্ষে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি গত অর্থ বছরে ১৬ লাখ টাকা আয় করেছেন।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সম্পদ ও আয়ের তুলনায় দেখা গেছে সম্পদের হিসেবে তারেক রহমান সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলেও বার্ষিক আয়ের দৌড়ে চমক দেখিয়েছেন তরুণ নেতা নাহিদ ইসলাম। তারেক রহমানের মোট সম্পদের পরিমাণ ১,৯৬,৮০,১৮৫ টাকা এবং বার্ষিক আয় ৬,৭৬,৩৫৩ টাকা। ডা. শফিকুর রহমানের মোট সম্পদ ১,৪৯,৯৯,৪৭৪ টাকা এবং বার্ষিক আয় ৩,৬০,০০০ টাকা। নাহিদ ইসলামের মোট সম্পদ ৩২,১৬,১২২ টাকা হলেও বার্ষিক আয় ১৬,০০,০০০ টাকা, যা তিনজনের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আইনি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারেক রহমানের নামে মামলার সংখ্যা সর্বোচ্চ ৭৭টি। ডা. শফিকুর রহমানের নামে মামলার সংখ্যা ৩৪টি মামলা। অন্যদিকে, নাহিদ ইসলামের নামে হলফনামায় কোনো মামলার তথ্য নেই।
হলফনামার প্রদত্ত তথ্য থেকে আরো জানা গেছে, তিন নেতার মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বয়োজ্যেষ্ঠ, যার বর্তমান বয়স ৬৭ বছর। তিনি একজন পেশাদার চিকিৎসক এবং তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমবিবিএস। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই শীর্ষ নেতার বর্তমান বয়স ৫৭ বছর। হলফনামা অনুযায়ী তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি। এই তিনজনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বা তরুণ নেতা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, তার বয়স মাত্র ২৭ বছর। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসএস।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ঢাকা-১৫ আসন থেকে নির্বাচনে লড়ছেন। তার মোট সম্পদ: ১ কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৭৪ টাকা। নগদ টাকা: ৬০ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৭ টাকা। বার্ষিক আয়: ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা (কৃষি ও অন্যান্য খাত থেকে)। স্থাবর সম্পদ: ১১.৭৭ শতক জমিতে ডুপ্লেক্স বাড়ি (মূল্য ২৭ লাখ টাকা) এবং ২ একর ১৭ শতক কৃষিজমি। আইনি অবস্থা: ৩৪টি মামলার মধ্যে ৩২টি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, বাকি ২টি স্থগিত আছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচনে লড়ছেন। তার হলফনামার মূল তথ্যগুলো হলো: মোট সম্পদ: ১ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ১৮৫ টাকা। বার্ষিক আয়: ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা (শেয়ার, বন্ড ও ব্যাংক আমানত থেকে)। নগদ ও ব্যাংক আমানত: ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ৪২৮ টাকা (নিজের) এবং স্ত্রীর নামে ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ৭৪৭ টাকা। এফডিআর: ৯০ লাখ ২৪ হাজার ৩০৭ টাকা। আইনি অবস্থা: তার বিরুদ্ধে থাকা ৭৭টি মামলার সবকটি থেকেই তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনে লড়ছেন। তার মোট সম্পদ কম হলেও আয়ের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ। বার্ষিক আয়: ১৬ লাখ টাকা (পরামর্শক পেশা থেকে), যা তিন নেতার মধ্যে সর্বোচ্চ। মোট সম্পদ: ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকা। নগদ টাকা: ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আইনি অবস্থা: তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। অলঙ্কার: নিজের পৌনে ৮ লাখ এবং স্ত্রীর ১০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম চার কোটি টাকার মালিক
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মোট সম্পদ দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৫ টাকা ৭৩ পয়সার মালিক। তার বার্ষিক আয় ১১ লাখ ৮৩ হাজার ১৩৩ টাকা। হলফনামায় তিনি জানান, তার নামে রয়েছে মোট পাঁচ একর কৃষি জমি রয়েছে। যার অর্জনকালীন মূল্য ৬০ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ৭০ শতাংশ ও ২.১৪ একর জমি। যার মূল্য ৫১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত দোতলা বাড়ির অংশের মূল্য ১০ লাখ টাকা। ঢাকায় আছে ১৯৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, যার মূল্য ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং চার শতাংশ জমি যার মূল্য পাঁচ লাখ টাকা। ঠাকুরগাঁওয়ে স্বামী-স্ত্রীর নামে রয়েছে ১২ শতাংশ অকৃষি জমি, যার মূল্য মূল্য ৩৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা।
ঢাকার পূর্বাচলে নিজ মালিকানায় রয়েছে পাঁচ কাঠা জমি, যার মূল্য আনুমানিক ৮৫ লাখ ৪ হাজার টাকা। প্রদেয় তথ্যানুযায়ী, তিনি ‘দি মির্জাস প্রাইভেট লিমিটেডের এক হাজার ৪২৮টি শেয়ারের মালিক, যার মূল্য ১ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টাকা। পাশাপাশি তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন সঞ্চয়পত্র মেয়াদি আমানতে রয়েছে ৪৫ লাখ ১১ হাজার ৭৫০ টাকা। অস্থাবর সম্পদের তালিকায় রয়েছে দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি। এ ছাড়া ১০ ভরি সোনা, বিভিন্ন ইলেকট্রনিকসামগ্রী (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার), যার মূল্য দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আসবাবপত্র দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা।
ডাক্তার তাহেরের সম্পদ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মোট সম্পদ এক কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তার স্ত্রীর রয়েছে পাঁচ কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পদ। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, ডা. তাহের কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান। কলেজের নামে তিন কোটি ১৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকার কুমিল্লা এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া স্ত্রীর নামে ইসলামী ব্যাংকে ৯ লাখ ৪ হাজার ১০৭ টাকা, আল-আরাফা ব্যাংক ১ লাখ ৪৪ হাজার ২৬৯ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২৭ লাখ ২ হাজার ৩৪৭ টাকা ঋণ রয়েছে।
সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে ১ কোটি টাকা এবং তার স্ত্রীর রয়েছে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তার নামে মোট ১০ শতক কৃষি জমি এবং ১৫ শতক অকৃষি জমি রয়েছে। যার অর্জনকালীন মূল্য ২২ লাখ ১৬ হাজার টাকা। স্ত্রীর নামে রয়েছে ০.৮ একর ১৫ কাঠা জমি। যার মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৩২ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৫ টাকা। স্ত্রীর নামে বাড়ি রয়েছে ৩টি, যার মূল্য ৩ কোটি ২২ লাখ ৫৩ হাজার ৭০০ টাকা।
নূরের বার্ষিক আয় ২০ লাখ টাকা
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর একজন ব্যবসায়ী। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৮৯ লাখ ৮২ হাজার ৮৪১ টাকা। স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ দুই লাখ ৬৬ হাজার ৮১৮ টাকা। নূরের ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ১৫ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৬ টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে আয় চার লাখ ৫৪ হাজার ৬২২ টাকা। সব মিলিয়ে তার মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার ৪৮ টাকা। নূরের কাছে নগদ অর্থ রয়েছে ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ২১৭ টাকা।
তার স্ত্রীর নগদ অর্থ ৩০ হাজার ৯৪১ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নূরের জমাকৃত অর্থ দুই লাখ ৮৯ হাজার ৩১৩ টাকা এবং স্ত্রীর রয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৭ টাকা। কোম্পানির শেয়ারে তার বিনিয়োগ রয়েছে দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নুরের নামে ৮২ ডেসিমেল কৃষিজমি রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য ৬২ হাজার টাকা। স্ত্রী মারিয়া আক্তারের নামে রয়েছে তিন একর কৃষিজমি, যার মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। দেনা রয়েছে তিন লাখ ৮৮ হাজার ১৬০ টাকা।
গোলাম পরওয়ারের বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৬৭ হাজার টাকা
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্ত্রী দুই হাজার ৬৭৫ টাকার মালিক। তবে তার কাছে ১৫ ভরি সোনা আছে। মিয়া গোলাম পরওয়ারের রয়েছে এক কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি। রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি। তার কাছে নগদ অর্থ রয়েছে পাঁচ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ব্যাংকে রয়েছে সাত লাখ ২৪ হাজার ৭৩৩ টাকা। বার্ষিক আয় চার লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। ব্যবসায় থেকে তিনি এ আয় করে থাকেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহর বাড়ি-গাড়ি নেই
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ তার নির্বাচনি হলফনামায় জানান, তার নামে বাড়ি, গাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা ভবন কিছুই নেই। তার বার্ষিক আয় ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৩৯ টাকা। হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে জমা রয়েছে ২৬ লাখ টাকার সোনা। স্থাবর-অস্থাবর মিলেয়ে তার মোট ৫০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। এক লাখ টাকার আসবাবপত্র ও ৬৫ হাজার টাকার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য রয়েছে তার।
পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তান তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল বলে হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন। তার নামে কোথাও কোনো মামলা বা অভিযোগ নেই। তিনিসহ তার পরিবারের কারোর নামে ব্যাংক বা আর্থিক কোনো প্রতিষ্ঠানে ঋণ নেই। বর্তমানে তিনি ব্যবসা করছেন বলে হলফনামার পেশা বিবরণীতে উল্লেখ করেন। আয়কর নথি অনুযায়ী তার দেখানো সম্পদের পরিমাণ ৩১ লাখ ৬৭ হাজার ৬১৯ টাকা। এর বিপরীতে তিনি আয়কর পরিশোধ করেছেন এক লাখ ৫ হাজার ৫৩১ টাকা।