মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস ঃ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরের ৬টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হেভিওয়েট প্রার্থীরা এখন মাঠ দাপিয়ে নির্বাচনী প্রচারনা চালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এসব আসনে জামায়াতে ইসলামীর জোট প্রার্থীরা ভিন্ন মাত্রার চমক দেখাতে পারেন বলে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার, নতুন প্রজন্মের এবং ভিন্ন দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ভোটারগন মন্তব্য করছেন।

ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ্য থেকে ৫ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও প্রাথমিকভাবে ৬ জন প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি বিএনপির প্রার্থীরা মাঠে সরব হলেও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর মাঠে উপস্থিতি রয়েছে। তারপরও মাঠে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিটি আসনে দলের প্রার্থীরা।

বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেও বিএনপির একাধিক প্রার্থী সকলেই নিজেদের অবস্থান থেকে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এক সময়ের জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরে দলটির সেই সোনালী দিন আর নেই। জাতীয় রাজনীতির ঋতু চক্রে জাপার নানান ডিগবাজি, নেতৃত্বের কোন্দল, দলের নেতাদের বহিস্কার, পাল্টা বহিস্কার, শীর্ষ নেতৃত্বের অদুরদর্শী কর্মসুচী, ফ্যসিষ্ট আওয়ামী লীগের লেজুরবৃত্তি, ভারতের দালালী সব মিলিয়ে অনেক আগেই জাতীয় পার্টির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এই অঞ্চলের মানুষ। বিগত ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর নির্মম পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখানে নির্বাচনে অংশ নিলেও জনগনের

কালের বির্বতনে রাজনৈতিক দেউলিয়াপনায় জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর অঞ্চলের জনমনে এখন জাপার ভালবাসায় ধু ধু বালু চরের বিরাণভুমিতে পরিনত হয়েছে ।

নির্বাচনী মাঠে চলছে এখন জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং এনসিপির সহ অন্যান্য দলের নেতাদের দৌড়ঝাঁপ।

রংপুরের ৬টি নির্বাচনী আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন এবং পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার সংখ্যা এবারে বেশী ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন । এখানে মোট ভোট কেন্দ্র ৮৭৩ টি এবং কক্ষ্য সংখ্যা রয়েছে ৪ হাজার ৯৮৮ টি। এখানে বিভিন্ন দলের ৫৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন।

রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটি কর্পোরেশনের ১ থেকে ৯ নং ওয়ার্ড)

রংপুর-১ আসনে ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী অধ্যাপক মাওলানা রায়হান সিরাজী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী এটিএম গোলাম মোস্তফা বাবু। বিএনপির প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোকাররম হোসেন সুজন। গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা হানিফ খান সজিব, জাপা প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি ঘরানার ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলী, জাতীয় নাগরিক পার্টির আল্ মামুন, খেলাফত মজলিশের মমিনুর রহমান এবং বাসদের আহসানুল আরেফিন তিতু। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক রায়হান সিরাজী প্রচারনায় এবং গ্রহনযোগ্যতায় একক ভাবে এগিয়ে আছেন। অন্যান্য দলের সাম্ভব্য প্রার্থীরাও তাদের মত করে প্রচারনা চালাচ্ছেন।

এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২২৭ জন। এর মধ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলায় ২ লাখ ৫১ হাজার ২ জন এবং সিটি কর্পোরেশনের ১ থেকে ৯ নং ওয়ার্ডের ভোটার ১ লাখ ২৪ হাজার ২২৫ জন।

রংপুর -২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ)

এটটিএম আজাহারুল ইসলাম, জামায়াত। মোহাম্মদ আলী সরকার, বিএনপি। আনিছুল ইসলাম মন্ডল, জাপা।

রংপুর-২ আসনে ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন দলের অন্যতম কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মজলুম জননেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম। বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী সরকার। জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাবেক এমপি আনিছুল ইসলাম মন্ডল। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী মাওলানা মোহাম্মদ আশরাফ আলী এবং জেএসডির প্রার্থী আজিজুর রহমান।

এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মজলুম আজহারুল ইসলাম দীর্ঘ দেড় দশক মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে জালিম শাহীর কারাগারে চরম নিপিড়িত হয়ে গত বছর মুক্তি পেয়েছেন। বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার মানুষ এবারে এই মজলুম মানুষটির দিকে ভালবাসা এবং স্বপ্নপুরনের আকাংখা নিয়ে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছেন। আম জনতা তাঁকে বিজয় মালা পরানোর প্রহর গুনছেন। এই আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা তাদের প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯২১ জন। এর মধ্যে বদরগঞ্জ উপজেলায় ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫৫৩ জন এবং তারাগঞ্জ উপজেলায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৮ জন।

রংপুর-৩ (রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ১০ থেকে ৩৩ নং ওর্য়াড)

রংপুর-৩ আসনে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মাহবুবার রহমান বেলাল। জাতীয় পার্টির প্রার্থী দলীয় প্রধান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। বিএনপির প্রার্থী দলের মহানগর আহবায়ক সামসুজ্জামান সামু, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী মুহাম্মদ আমিরুজ্জামান পিয়াল, স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মরহুম সিনিয়র মন্ত্রী মশিয়ার রহমান যাদু মিয়ার কন্যা বিএনপি নেত্রী রিটা রহমান, খেলাফত মজলিশের প্রার্থী তৌহিদুর রহমান রাজু, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের আনোয়ার হোসেন বাবলু, তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী, বাসদের আব্দুল কুদ্দুস এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী মোহাম্মদ নুর আলম সিদ্দিক। প্রার্থীরা তাদের সরব প্রচারনা কার্যক্রম অব্যহত ভাবে চালাচ্ছেন।

এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৮ হাজার ২২৪ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৯০ জন। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের ১০ থেকে ৩৩ নং ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫৯ জন এবং ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৪৭৫ জন রয়েছেন।

রংপুর-৪ (কাউনিয়া ও পীরগাছা)

রংপুর-৪ আসনে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। এর মধ্যে এখানে এনসিপি’র হেভিওয়েট প্রার্থী তরুন প্রজন্মের আইকন জুলাই যোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন। বিএনপির প্রার্থী রংপুর জেলা কমিটির সদস্য ও উপজেলা সভাপতি ইমদাদুল হক ভরসা। জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবু নাসের শাহ মোহাম্মদ মাহবুবার রহমান। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা মুহাম্মাদ জাহিদ হাসান। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী আবু সাহমা। বাসদ এর প্রগতী বর্ম্মন তমা। জাপার (আনিস-রুহুল) আব্দুস সালাম। বাংলাদেশ কংগ্রেসের উজ্জল চন্দ্র রায় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ্ আলম বাসার ও জয়নুল আবেদীন। এখনে সকল দলের সাম্ভব্য প্রার্থীরা বিরামহীন প্রচারনা চালিয়ে ভোটারদের মনোযোগ আর্কষন করছেন। এনসিপি’র প্রার্থী আখতার হোসেনকে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী পূর্ন সর্মথন জানিয়ে আসনটি তাঁকে ছেড়ে দেয়ায় হিসেব নিকেশ পাণ্টে যাচ্ছে ভোটারদের।

এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৯ হাজার ৯০৬ জন। এর মধ্যে পীরগাছা উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫৪ জন। এছাড়া কাউনিয়া উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৫২ জন।

রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর)

রংপুর-৫ আসনে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের রংপুর জেলা আমির সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম রব্বানী। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ফখর উজ জামান জাহাঙ্গীর। বিএনপির প্রার্থী উপজেলা সভাপতি গোলাম রব্বানী। আমার বাংলাদেশ পার্টির প্রার্থী আব্দুল বাছেত মারজান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী অধ্যাপক গোলজার হোসেন। নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী মোফাখ্খারুল ইসলাম নবাব। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী আনোয়ার হুসাইন, বাসদের প্রার্থী মমিনুল উসলাম। সিপিবির প্রার্থী আবু হেলাল। বাংলাদেশের সমাজতান্তিক দলের প্রার্থী বাবুল আক্তার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী খন্দকার মুকিত আল মাহমুদ । এই আসনের বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা প্রচারনা কার্যক্রম অব্যাহত ভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তরুন প্রজন্ম সহ মিঠাপুকুরবাসী এবারে এই মজলুম জননেতা অধ্যাপক গোলাম রব্বানীকে বিজয়ের এই আসনে মিঠাপুকুর উপজেলার ১৭ টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৯ হাজার ১৮৯ জন।

রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ)

রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের জেলা মজলিশে শুরা সদস্য অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মদ নুরুল আমিন। বিএনপি’র প্রার্থী রংপুর জেলা আহবায়ক সাইফুল ইসলাম। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী সুলতান মাহমুদ। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। জাতীয় পার্টির প্রার্থী নুরে আলম যাদু। আমার বাংলাদেশ পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ ছাদেকুল ইসলাম। সিপিবির প্রার্থী কামরুজ্জামান এবেং স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ, খন্দকার শহিদুল ইসলাম, এস এম শাহ্ জামান রওশন ও তাকিয়া জাহান চৌধুরী। পীরগঞ্জ আসনের বিভিন্ন দলের সাম্ভব্য প্রার্থীরা প্রচারনা চালাচ্ছেন নানা কৌশলী ভুমিকায়। সম্ভাব্য প্রার্থীরা এরইমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। এখানে জামায়াতের প্রার্থী রয়েছেন শক্ত অবস্থানে।

এই আসনে পীরগঞ্জ উপজেলার ১৫ টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩৫ জন।