আহসানুল হক জুয়েল, কিশোরগঞ্জ থেকে : জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, সেটির পুরোটা মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশের বাস্তবায়ন দেখতে চাই না। গতকাল রোববার দুপুরে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশ সংসদ থেকেই পরিচালিত হবে। সংসদে একটি দল সরকার ও আরেকটি দল বিরোধী দল হিসেবে থাকবে। সমাজে এক চাকায় গাড়ি চলে না, অন্তত দুটি চাকা লাগে। সরকারি দল ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করলে তাদের সহযোগিতা থাকবে। তবে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে জামায়াত জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবে। তাদের অবস্থান স্পষ্ট থাকবে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় তারা যেসব কথা বলেছেন, সেগুলো মুখের কথা নয়, অন্তরের কথা। তিনটি শর্ত সবাইকে মানতে হবে। প্রথমত, সমাজ দুর্নীতিগ্রস্তÑদুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঋণখেলাপিরা কীভাবে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। যারা জনগণের টাকা পরিশোধ করতে পারেন না, তারা কীভাবে দেশের নেতৃত্ব দেবেন। সংসদে এমন ব্যক্তিদের যাওয়া উচিত, যারা ব্যক্তিস্বার্থ নয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থ দেখবেন। কারও প্রতি সামান্য অবিচার হলেও তারা প্রতিবাদ করবেন বলে জানান তিনি।

আরেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কে কী নিয়ে আলোচনা করবেন, তা তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে কেউ আলোচনায় এলে দেশ ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা হবে। তিনি আরও বলেন, সংসদ কার্যকর রাখতে সরকার ও বিরোধী দলের প্রয়োজন। দেশ সঠিক পথে চললে সহযোগিতা থাকবে, আর ভুল পথে গেলে সমর্থন দেওয়া হবে না। জাতীয় পার্টি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলটি এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে না পারায় তারা জনসমর্থন হারিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী সেই ভুল করবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ সময় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি ড. সামিউল হক ফারুকী, জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক মো. রমজান আলী, সাবেক নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মোসাদ্দেক ভূঞা, কাপাসিয়ার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবী এবং ঢাকা উত্তর মহানগর জামায়াতের মজলিসে শূরা সদস্য অ্যাডভোকেট রোকন রেজা শেখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিন আমীরে জামায়াত কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতির চর ইউনিয়নের জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আব্দুস সালামের কবর জিয়ারত ও পরিবারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের পর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অথিতির বক্তব্য রাখেন।

সেখানে ডা. শফিকু রহমান বলেন, আমার দেশ ভাল নেই, বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি, হিংসা হানাহানিতে জড়িয়ে গেছি, হিংসা দূর হোক,হানাহানি দূর হোক, অশান্তি দূর হোক, আমরা প্রত্যেকেই যেন প্রত্যেককে ভালবাসতে পারি। আমরা প্রত্যেককে প্রত্যেকেই যেন শ্রদ্ধা করতে পারি। কারণ আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, মানুষ তো সৃষ্টির সেরা। এখানে কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান এগুলো আল্লাহতায়ালা হিসাব নিবেন। এ দেশ আল্লাহর দান, আমরা কেউ দরখাস্ত করে মায়ের পেট থেকে পয়দা হইনি। আল্লাহ যাকে যেখানে পছন্দ করেছেন সেখানেই পয়দা করেছেন। আমরা আমাদের দেশ নিয়ে অনেক সন্তষ্ট। আমাদেরকে আল্লাহ শান্তি দিয়ে ভরপুর করে দিক।

এসময় তিনি আরো বলেন, সবাই মায়ের জাতিকে সম্মান করবেন, এই নারী কারো মা,কারো স্ত্রী,কারো বোন,কারো মেয়ে। মায়ের পেটে যখন ২৮৫দিন ছিলাম, এক আউন্স অক্সিজেন মাকে ফিরিয়ে দিতে পারবো না। এত ক্ষমতা আমাদের নাই, রক্তের একটা ফোঁটা প্রতিদান আমরা মাকে দিতে পারবো না। বুকের দুধের যে ফোঁটা দিয়েছে ঐ ফোটারও প্রতিদান দেওয়ার শক্তি আমাদের নাই। সেই মায়ের জাতির সাথে যারা সম্মানজনক আচরণ করবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের এবং জাতির সম্মান বাড়িয়ে দিবে। আপনি যেমন আপনার মাকে সম্মান করেন,তেমনি অন্য সন্তানের মাকেও সম্মান করবেন। আপনার মাকে যখন কেউ অসম্মান করবে,আপনার কলিজায় আঘাত লাগবে, অন্যের মাকেও যদি ঠিক তেমনি অন্যের মাকেও যদি আপনি অপমান করেন তার কলিজায় আঘাত লাগবে। এসময় তিনি কৃষকদের প্রতি বলেন, আমি কৃষকের সন্তান,আমি কৃষক এবং শ্রমিকদেরকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি, কারণ আমি আমার বাবাকে শ্রদ্ধা করি,আমি যদি কৃষক শ্রমিককে শ্রদ্ধা করতে না পারি তাহলে আমি আমার বাবাকে অপমান করবো। আমার কারণে যাতে এই জাতির কখনো ক্ষতি না হয় সেজন্য সকলেই আমাকে দোয়া করবেন।

সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সামিউল হক ফারুকী,বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবী, কিশোরগঞ্জ জেলা আমীর অধ্যাপক রমজান আলী, সাংবাদিক শামসুল আলম সেলিম, জেলা সেক্রেটারি মাওলানা নাজমুল ইসলাম, ইসলামী ছাত্রশিবির কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সভাপতি খালিদ হাসান জুম্মান, কিশোরগঞ্জ শহর শাখার আমীর আ ম ম আবদুল হক, মাওলানা.আবদুর রাজ্জাক,বাজিতপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর ইয়াকুত আলী, নিকলী উপজেলা জামায়াতের আমীর আবুল হোসেন, সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম, উপজেলা ছাত্রশিবিরে সভাপতি খাইরুল ইসলাম বকুল, নিকলী উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি হিমেল খানসহ জামায়াতের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র শিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াতে ইসলামীর আমীর নিকলীর হাওড় অঞ্চলে আগমন উপলক্ষে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী,নিকলী থানা পুলিশের বিভিন্ন টিম নিরাপত্তা বিধানে তৎপর থাকতে দেখা যায়। এ সময় নিকলী সেনা ক্যাম্পের মেজর মোঃ আছিব, জেলা ডিএসবির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফ,বাজিতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার,তৃপ্তি মন্ডল, থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, জামায়াতে ইসলামী কর্মী মোঃ আব্দুস সালাম ৩ রা ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াত ইসলামী আয়োজিত কটিয়াদী উপজেলার কলেজ মাঠে এক নির্বাচনী জনসভায় অংশগ্রহণ করে বাড়ি ফেরার পথে বাজিতপুর উপজেলার উজানচর নামক স্থানে বাস দুর্ঘটনায় নিহত হন। একইদিনে ইটনা উপজেলার শিমুলবাক গ্রামে জামায়াতে ইসলামির কর্মী রিকশাচালক মরহুম শাহ আলম ভূঁইয়ার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। এ সময় জামায়াতে ইসলামির আমীর বলেন, ‘এবার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে আমি অনেক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। শ্রমিক, কৃষক সাধারণ মানুষেরা আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন। আমার নিজ নির্বাচনী ঢাকা-১৫ এলাকায় মাঝেমধ্যে যখন যেতাম, ছোট বাচ্চারা দৌঁড়ে এসেছে। ওরা আমার পিঠে ঝুলেছে, গলায় ঝুলেছে, কাঁধে চড়েছে। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে ওই দৃশ্যগুলো। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে ওরা আমাকে ‘দাদু’ খেতাব দিয়ে দিছে।’

শাহ আলম ভূঁইয়ার স্মৃতিচারণ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একদিন আমার নির্বাচনীয় আসন ঢাকা-১৫ এর কাফরুল এলাকায় আমি ক্যাম্পেইন করছিলাম, পাশে কয়েকটা রিকশা সারি সারি দাঁড়ানো। মানুষের সাথে হাত মিলাচ্ছি, সালাম দিচ্ছি। হঠাৎ করে রিকশার হাতল ছেড়ে আমার বুকের ভেতরে ঝুঁকে গেলেন এক লোক। আমীর তাকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। তারপর বললাম আসেন। কয়েক দিন পর শুনলাম তিনি ইটনায় গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন জামায়াতের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা করার জন্য। এ সময় হার্টের স্ট্রোকে তিনি মারা যান।

জামায়াতের আমীর বলেন, ‘দুই শ্রেণীর মানুষের সাথে মিশে দারুণ আনন্দ পাই। এক. ছোট বাচ্চারা। ওরা নিষ্পাপ। ওদের কোনো গুনাহ নেই। ওরা কাছে এলে মনে হয় আমি ফেরেশতাদের সাথে আছি। আরেক দল লোক কঠোর পরিশ্রম করে। দিন আনে দিন খায়। রক্ত পানি করে ঘাম ঝরায় পরিবারের মুখে হালাল খাবার তুলে দেয়ার জন্য। অনেক সময় সাদা ভদ্রলোক নামধারী লোকেরা একটু তাদেরকে এড়িয়ে চলে। তাদের গায়ের গন্ধ লেগে যায় কি না। তাদের গায়ে তো ঘাম লেগে থাকে। আমার কাছে এইটা ঘাম না। শতভাগ হালাল রুজির মানুষের গায়ের ঘাম আমার কাছে আতর।

জামায়াতের আমীর বলেন, ‘আমি আজকে আমার ভাইয়ের পরিবারের কাছে এসেছি। তিনি আমাদের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। অতি সাধারণ মানুষ ছিলেন। ঢাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। তাকে সম্মান করা, তার পরিবারের খোঁজ-খবর নেয়া আমার ঈমানের অংশ, আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’ এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘বিশাল হাওড় আপনাদের সামনে। হাওড় পাড়ের মানুষের মন বড় হয় এটা আমি জানি। প্রকৃতির সাথে আপনারা বেড়ে ওঠেন। এই বড় মনের মানুষগুলোর কাছে ছোট্ট একটা অনুরোধ থাকবে আমার, এই পরিবারটাকে আপনারা দেখে রাখবেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ইটনায় জামায়াতে ইসলামীর একটি নির্বাচনী জনসভায় যাওয়ার পথে নৌকায় স্ট্রোক করে মারা যান শাহ আলম ভূঁইয়া (৫০)।

এদিন সকাল ১০টায় স্পিড বোটে করে ও পরে হেঁটে শাহ আলম ভূঁইয়ার গ্রামের বাড়ি শিমুলবাক যান। জামায়াত আমীর। তিনি প্রথম শাহ আলমের কবর জিয়ারত করেন, পরে পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন কুশলাদি বিনিময় করেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন। এ সময় জামায়াত আমীর দলের পক্ষ থেকে শাহ আলমের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। এছাড়াও শাহ আলমের অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই মেয়ের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত পড়ালেখা থেকে শুরু করে সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি যতদিন সংগঠনের দায়িত্বে আছি, ততদিন এই দায়িত্ব পালন করব। ভবিষ্যতে যারা দায়িত্বে আসবেন, তারাও তা পালন করবেন বলে আশা রাখি।