মোঃ লাভলু শেখ লালমনিরহাট : লালমনিরহাটের ৩টি সংসদীয় আসনে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই গণসংযোগ করে আসছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। লালমনিরহাট ১ ও ২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ৫ বছর পূর্ব থেকেই স্ব-স্ব এলাকায় জনগণের মাঝে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা ও জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে থাকায় আসন ২টিতে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। লালমনিরহাট সদর-৩ আসনে সাবেক উপমন্ত্রী ও জেলা বিএনপির সভাপতি আসাদুল হাবিব দুলু কিছু দৃশ্যমান কাজ করেছিলেন। সেগুলো সামনে এনে ব্যাপক জনসংযোগ করছিলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ও জেলা আমীর এডভোকেট আবু তাহের ব্যাপক গণসংযোগ করে অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে জামায়াত ও বিএনপি প্রার্থী উঠান বৈঠক চালিয়ে আসছেন। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী দুলুর সাথে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী এডভোকেট আবু তাহেরের ভোটের মাঠে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে এ আসনের ভোটাররা জানিয়েছে। তবে সদর-৩ আসনে ভোটাররা নতুন মুখ হিসেবে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী এডভোকেট আবু তাহেরকেই চাইবেন বলে ভোটাররা জানান।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও জনতার দল একটি করে আসনে নির্বাচনের লড়াই করবেন। তবে সামগ্রিকভাবে এদের তৎপরতা কম লক্ষ্য করা গেছে। একসময়ে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটের সব আসন তাদের দখলে ছিল। বিশেষ করে লালমনিহাট-৩ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য (এমপি) হয়েছেন, জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তন এরপর জেলা জাপার কার্যালয়ে হামলা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মামলা হয়েছে তাদের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে। এমন পরিস্থিতিতে লালমনিরহাট জেলায় দলটির তৎপরতা ছিল না বললেই চলে। তবে তফসিল ঘোষণার পর জাপা নেতাদের তৎপরতা হতে দেখা যাচ্ছে। জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোহাম্মদ জাহিদ হোসেনকে লালমনিরহাট সদর-৩ আসনে এবং লালমনিরহাট-১ আসনে মশিউর রহমান (রাঙ্গা), লালমনিরহাট-২ আসনে জাপার চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এলান উদ্দিনকে মনোনয়ন দিয়েছে। লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা)

সীমান্তবর্তী ২ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ১৯৭৯ সালের নির্বাচন ছাড়া কখনো জিততে পারেনি বিএনপি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এবং ২০০১ সাল থেকে টানা জয় পায় আওয়ামী লীগ (বর্তমানে দলটি নিষিদ্ধ ঘোষিত)২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান ৭৪ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। এবার আসনটিতে লড়াই করবেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধান। ভোটাররা জানান, তিনি ঢাকায় আইনজীবী পেশায় নিয়োজিত থাকায় এলাকায় তেমন জনপ্রিয়তা নাই বললেই চলে। এ আসনটিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তরের মজলিসের শূরা সদস্য ও কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক বিভাগের সহ-সভাপতি পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা অঞ্চলের জনপ্রিয় নেতা মো. আনোয়ারুল ইসলাম রাজু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ভোটাররা জানান, তিনি জনসেবামূলক কার্যক্রম করায় এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ওই আসনের ভোটাররা আরও জানায়, যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ ও সৎ, নিষ্ঠাবান ব্যক্তি হওয়ায় নতুন কিছু সম্ভাবনার জন্য নতুন মুখ হিসেবে বিশিষ্ট সমাজসেবক রাজু কে এ আসনে নির্বাচিত করার আশা প্রকাশ করেছেন। এ আসনে এনসিপির কেউ নেই। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল কাশেম, ইসলামী আন্দোলনের ফজলুল করিম ও এবি পার্টির মোহাম্মদ আবু রাইয়ান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালিগঞ্জ)

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এ আসনে এমপি হয়েছিলেন করিম উদ্দিন আহমেদ। পরে ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন মজিবুর রহমান। পরে তিনি দল পরিবর্তন করে জাপার হয়ে ১৯৮৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে জয়লাভ করেন তিনি। ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও পরবর্তী পর পর ২টা নির্বাচনে জয়লাভ করেন করিম উদ্দিন এর ছেলে সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ। (বর্তমান নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কালিগঞ্জ উপজেলা সভাপতি)। তিনি বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়ে, কারাগারে বন্দী রয়েছেন। এ আসনটিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এডভোকেট মো. ফিরোজ হায়দার লাভলু। এ আসনে সুষ্ঠু ও নিরপক্ষ নির্বাচন হলে জয়ের মালা তারই হবে বলে ভোটাররা জানিয়েছে। এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রুকন উদ্দিন বাবুল ও কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম মারাত্মক গ্রুপিং চলছে। বিএনপির এই ২ নেতার গ্রুপিং চলমান থাকায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির এ প্রার্থীর ভোটের মাঠে জয়লাভ করাটা কঠিন হবে বলে ভোটাররা জানিয়েছে। এ আসনে এন সিপির কেউ নেই এছাড়া গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য দীপক কুমার রায়, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাহফুজুর রহমান ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি আব্দুল হান্নান এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

লালমনিরহাট-৩ (সদর)

লালমনিরহাট জেলার গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে ১৯৯১ সালের পর বিএনপি একবার, আওয়ামী লীগ দুইবার জাপার প্রার্থীরা চারবার জয়লাভ করেছে। আসাদুল হাবিব দুলু বিএনপি সরকারের আমলে উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ আসনে এবারও তাকে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে। আসাদুল হাবিব দুলু কেন্দ্রীয় বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি। এ আসনে লড়াই করবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমীর এডভোকেট আবু তাহের। এ আসনে জামায়াত ও বিএনপি হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে ভোটাররা জানান। ভোটাররা আরও জানান, বিএনপির ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করা, জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বাবলার সাথে গ্রুপিং, জেলা বিএনপিকে পারিবারিক দলে পরিণত এবং একনায়কতন্ত্র শাসন করার কারণে এ আসনে দুলুর জয়লাভ করাটা কঠিন হবে বলে ভোটাররা জানিয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এ আসনেও জামায়াতের প্রার্থী আবু তাহের -এর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এ আসনের নতুন মুখ হিসেবে আবু তাহেরকেই ভোট দিয়ে জয়লাভের কথা জানিয়েছে ভোটাররা। এ আসনে এনসিপির প্রার্থী নেই। এবি পার্টির ঢাকা মহানগরের সহ-সভাপতি মো. ফিরোজ কবির, খেলাফত মজলিসের মাওলানা ইসমাইল হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের মো. মোকসেদুল ইসলাম, সিপিবির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মধুসূদন রায় এবং জাপার মো. জাহিদ হাসান সহ ১,২ ও ৩ আসনে মোট ২৬ জন প্রার্থী লড়াই করবেন বলে জানা গেছে। লালমনিরহাট জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে,

লালমনিরহাট জেলার ৩টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৬৭ জন, নারী ৫ লাখ ৭০ হাজার ৪২২ জন এবং হিজড়া ভোটার ৭ জন।