সাইফুল ইসলাম, টাঙ্গাইল
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে টাঙ্গাইল জেলার ৮টি সংসদীয় আসনে প্রধান দুটি দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দলীয় প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। তফসিল ঘোষণার আগেই উভয় দল এবং তাদের শরিকরা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকহারে শুরু করেছেন।
টাঙ্গাইলের ৮টি সংসদীয় আসনেই জামায়াতে ইসলামী অনেক আগেই তাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। অপরদিকে বিএনপি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতকে উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় হাই কমান্ডের সিদ্ধান্তে প্রার্থী মনোনয়ন দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে টাঙ্গাইল-১, টাঙ্গাইল-৩, টাঙ্গাইল-৪ ও টাঙ্গাইল-৫ এই কয়েকটি আসনে তৃণমূলের মতামতকে উপেক্ষা করে দলীয় হাই কমান্ড তথাকথিত ‘হাইব্রিড’ প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এসব প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন প্রার্থীর অপেক্ষায় রয়েছেন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এসব আসনে বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি এনসিপি, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও কোন কোন আসনে মাঠে নেমেছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলাসহ নানামুখী কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। জোটবদ্ধভাবে নেতাকর্মীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এরপরও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা জামায়াত ব্যতীত প্রায় সব দলের প্রার্থীকেই একাধিকবার সংসদ সদস্য হিসেবে দেখেছেন। এবার তারা নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের সংসদে পাঠাতে চান বলে মত প্রকাশ করেছেন।
টাঙ্গাইলের আটটি সংসদীয় আসনে অনেক আগেই জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী ঘোষণা করলেও বিএনপি প্রথমে ৭টি আসনে প্রার্থীর ঘোষণা দেয় এবং একটি আসন খালি রেখে সম্প্রতি সেই আসনেও প্রার্থী চূড়ান্ত করে।
টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী)
টাঙ্গাইল-১ মধুপুর-ধনবাড়ী আসনে তফসিল ঘোষণার বহু আগেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর টাঙ্গাইল জেলা কর্মপরিষদ সদস্য ও মধুপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোন্তাজ আলী দিন-রাত প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফকির মাহবুব আনাম স্বপন। তবে দলের আরেক নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলীও প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। দল তাকে মনোনয়ন না দিলেও তিনি স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র ক্রয় করেছেন। এছাড়া বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আরেক নেতা সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল আসাদুল হক আজাদও স্বতন্ত্র মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এ আসনে এনসিপির মনোনয়ন ফরম কিনেছেন সাইদুল ইসলাম আপন।
বিগত সংসদগুলোতে এ আসনে ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ একচেটিয়াভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের পতনের পর এ আসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি। তবে জামায়াতের একক প্রার্থী এবং বিএনপিতে বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে জামায়াতে ইসলামী এখানে ব্যাপক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
প্রায় প্রতিদিনই বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারির কারণে সাধারণ জনগণও বিরক্ত। জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সব দলের শাসন দেখেছেন; এবার তারা জামায়াতকে দেখতে চান। এছাড়া জামায়াতের প্রার্থী মধুপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হওয়ায় এলাকায় তিনি একজন ভদ্র ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী শিল্পপতি মাহবুব আনাম স্বপনের গ্রামের বাড়ি ভূঞাপুর উপজেলায় হওয়ায় তাকে ‘বহিরাগত’ বলে বিএনপির অপর গ্রুপ ট্রল করে। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইল-১ আসনে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে জামায়াত এখানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩২হাজার ২ শত ৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৩ হাজার ২৭ জন এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ১৯ হাজার ২ শত ৪৫ জন।
টাঙ্গাইল-২ (ভূঞাপুর-গোপালপুর)
টাঙ্গাইল-২ সংসদীয় আসনটি জেলার ভূঞাপুর ও গোপালপুরÑ এই দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনে অতীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পর্যায়ক্রমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম পিন্টু এবং জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি ও বিশ্ববিখ্যাত ২০১ গম্বুজ মসজিদের পরিচালক মাওলানা হুমায়ুন কবিরের মধ্যে।
বিশ্ববিখ্যাত ২০১ গম্বুজ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতার ছোট ভাই এবং মসজিদের পরিচালক হিসেবে মাওলানা হুমায়ুন কবির এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এ আসনে বিএনপির কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় আব্দুস সালাম পিন্টু স্বস্তিতে রয়েছেন। অপরদিকে জামায়াতের প্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালিয়ে এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন।
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ ও দখলের রাজনীতিতে তারা অতিষ্ঠ। ফলে ইসলামপন্থী ও দুর্নীতিমুক্ত দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর দিকে সাধারণ মানুষের ঝোঁক বেশি। তবে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের সঙ্গে।
বড় দুই দলের দুই হেভিওয়েট নেতা পুরোপুরি নির্বাচনী কাজে সময় ব্যয় করছেন। তবে সম্প্রতি বিএনপি নেতাকর্মী কর্তৃক উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় এলাকায় বিএনপির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আবার গত ১৮ ডিসেম্বর ভূঞাপুরে জামায়াতের পথসভা শেষে বিএনপির কতিপয় নেতাকর্মী কর্তৃক মঞ্চ ভাঙচুর ও জামায়াত নেতাদেরকে মারধরের ঘটনায় বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ফলাফলের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ০৪ হাজার ২ শত ৭১ জন।
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল)
ঘাটাইল আসনটি বিএনপি’র দুর্গ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। তবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ পতনের পর দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে বেশ শক্ত অবস্থানে জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর টাঙ্গাইল জেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ হোসনী মোবারক বাবুল এ আসনে মনোনীত হয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপি’র নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম ওবায়দুল হক নাসির। একই দল থেকে স্বতন্ত্র সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মূল আলোচনায় সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লুৎফর রহমান খান (আজাদ)। তিনি ১৯৯১,১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ আসনে বিএনপির মনোনিত প্রার্থীর গ্রামের বাড়ি সখীপুর উপজেলায় হওয়ার কারণে স্থানীয় তৃনমূল বিএনপি লুৎফর রহমান আজাদের পক্ষে রয়েছে।
এ ছাড়াও ঘাটাইল আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রেজাউল করিম, গণসংহতি আন্দোলনের মোফাখারুল ইসলাম, শিল্পপতি ও কেমি প্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজিং ডিরেক্টর তরুণ ছাত্রনেতা মো. শামীম মিয়া।
আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩৮০। যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৯৩ ও নারী ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮৫। এছাড়া ২ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী)
টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলা নিয়ে টাঙ্গাইল–৪ সংসদীয় আসনটি গঠিত। এ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। তবে জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে এ আসনে চলছে একেবারেই ভিন্ন ও বিচিত্র রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও টাঙ্গাইল জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক। অপরদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও শিল্পপতি লুৎফর রহমান মতিন।
বিএনপির মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত অপর কেন্দ্রীয় নেতা বেনজির আহমেদ টিটুর সমর্থকরা এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন এবং তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন। ফলে বিএনপির অভ্যন্তরে এ আসনে স্পষ্ট গ্রুপিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অন্যদিকে মহানবী (সা.), হজ, তাবলিগ জামায়াত এবং হাসিনা পুত্র জয়কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত নেতা, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। উল্লেখ্য, তিনি গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন । বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও বিভক্তির কারণে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮ শত ৪৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪ শত ৯৯ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩ শত ৪৮ জন।
টাঙ্গাইল-৫ (টাঙ্গাইল সদর)
রাজনৈতিক জেলা হিসেবে খ্যাত টাঙ্গাইল সদর আসনটি নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত এই আসনে শহরাঞ্চলের পাশাপাশি নদীতীরবর্তী বিশাল চরাঞ্চল রয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই টাঙ্গাইল জেলার রাজনৈতিক পটভূমিতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেই সময় থেকে টাঙ্গাইলে রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে আসছেন।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য ও টাঙ্গাইল জেলা আমীর আহসান হাবীব মাসুদ। অপরদিকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এবং ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
মজার বিষয় হলো, জামায়াত ও বিএনপির এই দুই হ্যাভিওয়েট প্রার্থী একই বিদ্যালয়ের একই শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। এ আসনে এনসিপির প্রার্থী মাসুদুর রহমান রাসেল এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী ফাতেমা রহমান বিথীও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তবে সামগ্রিকভাবে এ আসনে মূল লড়াই হবে জামায়াত ও বিএনপি র মধ্যে।
মনোনয়ন বঞ্চিত জেলা বিএনপির সেক্রেটারি এ্যডভোকেট ফরহাদ ইকবালের অনুসারীরা এখন পর্যন্ত কফিন মিছিলসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মনোনয়নের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান প্রকাশ করে আসছেন। ফলে এ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এখনো প্রশমিত হয়নি।
এই আসনে মূলত চরাঞ্চলের মানুষের ভোটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রতিটি নির্বাচনে চরাঞ্চল থেকে যিনি প্রার্থী হয়েছেন, তিনিই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে ধারণা রয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির চরাঞ্চলের কোনো প্রার্থী মনোনয়ন পাননি।
অপরদিকে মনোনয়নপ্রাপ্ত বিএনপি প্রার্থী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর গ্রামের বাড়ি ভূঞাপুর উপজেলায় হওয়ায় তাকে টাঙ্গাইল সদর আসনে ‘বহিরাগত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আলোচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে টাঙ্গাইল সদরের ছেলে জামায়াতের প্রার্থী আহসান হাবীব মাসুদ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক প্রচারণা চালানো এবং সাধারণ মানুষের বিপদে-আপদে দ্রুত ঘরে ঘরে পৌঁছে সমস্যা সমাধানে সক্রিয় থাকার কারণে জনপ্রিয়তার দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬২ হাজার ২ শত ১১ জন।
টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার)
টাঙ্গাইল-৬ সংসদীয় আসনটি নাগরপুর ও দেলদুয়ার উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও অতীতে আওয়ামী লীগও একাধিকবার এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ডা. একেএম আবদুল হামিদ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এলাকায় পরিচিত মুখ হিসেবে প্রশংসিত। তফসিল ঘোষণার অনেক আগেই তিনি নিয়মিতভাবে গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে মাঠ প্রস্তুত করে ফেলেছেন।
অন্যদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি রবিউল আওয়াল লাভলু। তবে মনোনয়নকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ ও গ্রুপিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলের অর্ধশতাধিক ত্যাগী প্রার্থী মনোনয়ন না পাওয়ায় তাদের অনুসারীরা নীরব অসন্তোষ প্রকাশ করছেন, যা নির্বাচনের মাঠে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে একই রাজনৈতিক চক্রের ক্ষমতার পালাবদলে ক্লান্ত। অনেকেই দুর্নীতিমুক্ত ও নৈতিক রাজনীতির প্রত্যাশায় ইসলামী দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। এই বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী এ আসনে ধীরে ধীরে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
টাঙ্গাইল-৭ (মির্জাপুর)
টাঙ্গাইল-৭ সংসদীয় আসনটি মির্জাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনটি টাঙ্গাইল জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল আসন। শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এখানে ভোটের হিসাব বরাবরই জটিল।
এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই সাংগঠনিকভাবে সক্রিয়। দলের মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ আবদুল্লাহ তালুকদার দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকা-, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়তা এবং ধর্মীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা তৈরি করে আসছেন। ফলে তরুণ ভোটার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই বাড়ছে।
অপরদিকে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী শক্তিশালী হলেও দলীয় কোন্দল এখানেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। একাধিক প্রভাবশালী নেতা মনোনয়ন না পাওয়ায় ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ বিরাজ করছে। যদিও প্রকাশ্যে সবাই দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিচ্ছেন, তবে মাঠপর্যায়ে সেই ঐক্যের প্রতিফলন এখনও স্পষ্ট নয়।
এই আসনে মূল লড়াইটি এখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে। সাধারণ ভোটারদের মতে, এবার তারা মুখ ও নেতৃত্বের পরিবর্তন চান এবং নতুন ধারার রাজনীতিকে সুযোগ দিতে আগ্রহী।
টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর)
টাঙ্গাইল-৮ সংসদীয় আসনটি বাসাইল ও সখীপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। বনাঞ্চল, কৃষিপ্রধান এলাকা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাসের কারণে এই আসনের রাজনৈতিক চরিত্র কিছুটা আলাদা। এখানে ভোটাররা ব্যক্তি ইমেজ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জোলা সহকারী সেক্রেটারি ও বাসাইল উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম খান অনেক আগে থেকেই এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন। তিনি ধর্মীয় কর্মকা-ের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরাসরি মাঠে কাজ করছেন। ফলে গ্রামাঞ্চলে তার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এ্যডভোকেট আহমেদ আজম খান নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় থাকলেও দলের ভেতরের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। একাধিক ইউনিটে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকায় বিএনপি এখনো পুরোপুরি নির্বাচনী গতি পায়নি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী একক সিদ্ধান্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মসূচির মাধ্যমে এগিয়ে রয়েছে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনলেও বাস্তব ফল তেমন পাননি। ফলে এবার তারা বিকল্প শক্তিকে সুযোগ দিতে আগ্রহী। এই বাস্তবতায় টাঙ্গাইল-৮ আসনে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
এ আসনে কৃষক শ্রমিক জনতালীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে আলোচনায় আছেন।