জামায়াত-১৭৯, এনসিপি-৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-২০, খেলাফত মজলিস-১০, অন্যান্য-১৪

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের আসন সমঝোতা ঘোষণা করা হয়েছে। তার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ১৭৯টি আসনে, জাতীয় নাগরিক পার্টি ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি ৭টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি ৩টি, বিডিপি ২টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাগপার আসনের বিষয়ে পরে জানানো হবে। আর ইসলামী আন্দোলন সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত না থাকায় তাদের আসনের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা হলে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। ১১ দলের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।

এ সময় তিনি বলেন, এ নির্বাচন অতীতের নির্বাচনের মতো নয়। এবারের নির্বাচনটি হচ্ছে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচনে সকলেই ঐক্যবদ্ধ থেকে প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য চেষ্টা করা নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এতগুলো দল সব মতকে ধারণ করে এত বড় নির্বাচনী জোট আর কখনো হয়নি। আজকের এই টেবিল জাতীয় ঐক্যের একটি মডেল হিসেবে কাজ করবে। আমরা ওয়ান বক্স পলিসিতে ঐকমত্য থাকবো। আমরা যারা এ ঐক্যে আছি তাদের একজন করে প্রার্থী একটি আসনে থাকবে। সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে আসন বণ্টনের বিষয়ে একমত হয়েছি। দু’একটি জায়গায় এখনো সমস্যা রয়ে গেছে। সেগুলো প্রত্যাহারের আগেই চূড়ান্ত করতে পারবো এ আশাবাদ রেখেই যে সকল দল আজকে উপস্থিত আছে তাদের ঘোষণা দেয়া হচ্ছে।

এর আগে সাংবাদিক সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫৪ বছর রাজনীতির ঘুনেধরা অবস্থা থেকে জাতির মুক্তির আকাক্সক্ষা পূরণের জন্যই আমরা ১১ দল ঐক্য করেছি। আমরা পুরনো সেই রাজনীতি আর চাই না। ফ্যাসিবাদ, খুনের ও চাঁদাবাজির রাজনীতিতে ফিরে যেতে চাই না। আমরা সত্যিকার অর্থে জনআকাক্সক্ষা বিশেষ করে তরুণদের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশটাকেই দেখতে চাই। সেই বাংলাদেশটা গড়ার জন্যই আমাদের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক আয়োজন। আমরা কার্যত যারা জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি দেন, ধারণ করেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, সেই মানুষগুলোই আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি।

তিনি বলেন, দেশবাসীর কাছে অনুরোধ। আপনারাও পরিবর্তন চান, আমরাও সেই পরিবর্তন করার দায়িত্ব নিয়ে ময়দানে নেমেছি। আপনাদের দেয়া দায়িত্বই পালন করার জন্য সামনে এসেছি। আপনারা সবকিছু দিয়ে আমাদের পাশে থাকবেন, সমর্থন জুগাবেন এবং জনগণের বিজয়টা নিশ্চিত করবেন। অতীতের মতো আমরা কোনো নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং দেখতে চাই, ভোট কারচুপি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান খুব স্পষ্ট। এ দেশের যুব সমাজ তিনটি নির্বাচনে বয়স হওয়া সত্ত্বেও একটি নির্বাচনেও ভোট দিতে পারেনি। আমরা তাদের ভোটটি নিশ্চিত করতে চাই। যুব সমাজ, তোমরা তোমাদের ভোট দেয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসো এবং তোমাদের ভোটের হিসাব তোমরা নিয়ে নাও। আমরা তোমাদের সাথে থাকবো, ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই ঐক্য গঠনে অনেকের অবদান রয়েছে, সকলের অবদান স্মরণ করছি। তিনি শহীদ ওসমান বিন হাদির অবদান স্মরণ করে তার হত্যার বিচার চান।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সংবাদ সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, ইসলামী আন্দোলন আমাদের ঐক্যের শুরু থেকেই ছিলেন। আজকে তারা নেই। তারা আরো বোঝাপড়া করছেন। আশা করি তারাও থাকবেন। আর এটিকে কখনো জোট বলিনি এটি একটি নির্বাচনী সমঝোতা। আর এখন এটি নির্বাচনী ঐক্য।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সারাদেশে আমাদের দলের পক্ষে কোনো একক প্রার্থী থাকবে না। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আজ থেকে আমরা ১১ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সংস্কারের পক্ষে থাকা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে থাকা, আজাদির পক্ষে থাকা অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একটা প্ল্যাটফর্মে এসেছে। যেখানে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে আমরা অংশগ্রহণ করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, এটি আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও ঐতিহাসিক যাত্রা। জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং সবার অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা যে জনআকাক্সক্ষাকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে চাইছি, এই ঐক্য তা বাস্তবায়নে পরিপূর্ণ সহায়ক হবে।

তিনি বলেন, নির্বাচনী সমঝোতা বা ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে সারাদেশে প্রার্থী দেবে। আমরা সবাই সবাইকে সহযোগিতা করব এবং আমাদের যে গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ, সেটার বাস্তবায়ন ঘটবে। জনগণের পক্ষে এবং আজাদির পক্ষে এই নির্বাচনের ফলাফল ঘরে তুলব, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনের পরিবেশ নাই। সবার জন্য সমান সুযোগ নেই। এটা যদি সৃষ্টি করা না হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনাররা যেভাবে জেলে গেছেন, আপনাদেরও আগামী দিনে জেলে যেতে হবে।

তিনি বলেন, আপনারা ইতোপূর্বে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসন দেখেছেন। এবার আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধÑ একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসন, সুশাসন এবং চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা দেখার সুযোগ দিন। এখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে, যা অন্য কোথাও দেখা যায়নি।

নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, জাতিকে আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑ আপনারা কি ভিন্ন দেশের দাসত্ব করবেন, নাকি বাংলাদেশের জনগণের সেবা করবেন? আমরা যারা এখানে উপস্থিত হয়েছি, আমরা জনগণকে শাসন করতে আসিনি; বরং জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে এসেছি।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক জায়গায় নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই এবং সবার জন্য সমান সুযোগ (লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করা হয়নি। এই পরিবেশ যদি সৃষ্টি করা না হয়, তবে মনে রাখবেনÑ আগের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনাররা যেভাবে আজ জেলে আছেন, আপনাদেরও ভবিষ্যতে একই পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কারো পেছনে বা দ্বারে দ্বারে ঘুরে তোষামোদ করবেন না; বরং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অনুগত থাকুন। দেশের জন্য যা কল্যাণকর, তা-ই করুন। মানুষ এখনও কাক্সিক্ষত ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনে বৈধতা পাওয়া বা বাতিলের বিষয়ে যেসব আবেদন জমা পড়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে পর্যালোচনা করে রায় দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমরা প্রত্যাশা করি, সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে আজ এই মঞ্চে উপস্থিত প্রতিনিধিদের পক্ষে রায় দেবে এবং আমাদের দেশের সেবা করার সুযোগ করে দেবে। আমি সবার সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করছি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বিগত ১৫ বছরের দুঃশাসন ও নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে ১১টি রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মামুনুল হক বলেন, ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, বিভিন্ন বিরোধী আন্দোলন, ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকালে প্রতিবাদী জনতার ওপর হামলা এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। এসব শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা ও তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই ঐক্যের ঘোষণা দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, যা আন্দোলনকারীদের ভাষায় ‘৩৬ জুলাই’, সেই গণঅভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতার স্বাদ ও সফলতার অভিজ্ঞতা লাভ করে। সেই চেতনার ধারাবাহিকতায় আজকের এই সাংবাদিক সম্মেলন এবং নির্বাচনী ঐক্যের ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

মামুনুল হক বলেন, এই রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে। জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা, অভিপ্রায় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিতে দলগুলো অনেক আগেই একসঙ্গে পথচলা শুরু করে। জুলাই সনদের আইনিভিত্তি বাস্তবায়নকে অভিন্ন লক্ষ্য ধরে ধাপে ধাপে আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পথপরিক্রমার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১১টি দল এবার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) অলি আহাম্মদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের। আরো উপস্থিত ছিলেন, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, সাবেক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রমুখ নেতারা।