এ দেশে আর কখনো ভয়, দমন-পীড়ন বা সন্ত্রাসের রাজনীতি ফিরে আসতে দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল রাজনীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে আমাদের এই অঙ্গীকারকে কেউ দুর্বলতা মনে করবেন না। জুলাই বিপ্লব মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। গতকাল শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।
আমীরে জামায়াত বলেন, প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ১১ দলীয় জোটের সমর্থকবৃন্দ, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বিএনপির মতের সাথে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান রাখার কারণে যেসব নিরীহ নাগরিক ও ভোটার সহিংসতার শিকার হয়েছেন- আমরা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। প্রত্যেক নিরপরাধ ভুক্তভোগীর পাশে আমরা দৃঢ় সংহতি ঘোষণা করছি।
তিনি বলেন, যে জাতি সদ্য তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছে, সেই জাতির বুকে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রতিহিংসার রাজনীতির কোনো স্থান নেই। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই- জুলাই বিপ্লব এখনো জীবিত। জুলাই সনদ ছিলো একেবারে সুস্পষ্ট- আর কোনো স্বৈরাচার নয়; না রাষ্ট্রীয় শক্তির মাধ্যমে, না কোনো রাজনৈতিক দলের ছায়ায় থেকে। এ দেশের মানুষ একবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, আবারও ভয়-ভীতির অন্ধকারে ফিরে যাবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি- অবিলম্বে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনুন। দ্রুত ও দৃশ্যমান আইন প্রয়োগই পারে পরিস্থিতি অবনতির হাত থেকে রক্ষা করতে এবং নিশ্চিত করতে, কোনো নাগরিক যেন বিকল্প উপায়ে নিরাপত্তা খুঁজতে বাধ্য না হন। প্রতিটি ঘটনা যথাযথভাবে নথিভুক্ত ও রেকর্ড করতে হবে।
তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা আমাদের নির্বাচিত এমপি, প্রার্থী ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি- দেরি না করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে যান, তাদের পাশে দাঁড়ান, সংহতি প্রকাশ করুন এবং প্রমাণগুলো সংগ্রহ করুন। ছবি, ভিডিওসহ সব তথ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে সংগ্রহ করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিন এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে শেয়ার করুন, প্রয়োজনে সংবাদ সম্মেলন করুন, যাতে সত্য জাতির সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপিত হয়।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আসন্ন সরকারের প্রতিও আমাদের বার্তা পরিষ্কার- জনগণের ম্যান্ডেট কোনো লাইসেন্স নয়; এটি একটি শর্তযুক্ত আমানত। এই আমানতের মূল শর্ত হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সবার জন্য সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা প্রদান। সুশাসনের প্রথম পরীক্ষা শুরু হয় নিজের দল ও কর্মীদের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
আমরা শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল রাজনীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে আমাদের এই অঙ্গীকারকে কেউ দুর্বলতা মনে করবেন না। জুলাই বিপ্লব মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। এ দেশে আর কখনো ভয়, দমন-পীড়ন বা সন্ত্রাসের রাজনীতি ফিরে আসতে দেওয়া হবে না- কারো পক্ষ থেকেই নয়। আল্লাহ আমাদের প্রিয় দেশকে হেফাজত করুন।
দেশব্যাপী জুলুম বন্ধের আহ্বান
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান দেশব্যাপী জুলুম-অত্যাচার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “আমার কর্মীর গায়ে নয়, পারলে আমার গায়ে হাত দাও। এখনই দেশব্যাপী সব জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।” বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা. শফিকুর রহমান গতকাল রোববার বিকেলে তাঁর নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের বিভিন্ন এলাকা সফর করে ওই এলাকার মসজিদে আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। এ সময় তিনি সাধারণ মুসল্লি ও জনগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাঁদের খোঁজখবর নেন। এটি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম সফর।
ঢাকা-১৫ আসনের উন্নয়নসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে যে ওয়াদা করেছেন, তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি জনগণের সমস্যার কথা জানার ও বোঝার চেষ্টা করেন। মতবিনিময়ের পূর্বে তাঁর নির্বাচনী এলাকার কিছু বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন তিনি নিজ হাতে অপসারণ করেন। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুসরণ করে সব বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে এবং জনগণের সমস্যা সমাধানে আমাদের সবাইকে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
নানা বাধা-প্রতিবন্ধকতা ও হামলা উপেক্ষা করে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে তাঁকে বিজয়ী করার জন্য তিনি ভোটার জনগণ, জামায়াতের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। অত্র এলাকার জনগণ তাঁকে নির্বাচিত করে যে বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পালন করার জন্য তিনি মহান আল্লাহর তাওফিক কামনা করেন। সেই সঙ্গে জনগণের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, “আমি দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সবার খেদমত করার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।”
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায় এবং গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে দল সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, “জনগণ আমাদের ওপর যতটুকু দায়িত্ব দিয়েছে, সর্বোচ্চ দিয়ে তা পালন করব। দেশটা কারও কাছে ইজারা দেব না, কাউকে প্রভু মানব না, কারও দাসত্ব স্বীকার করব না।”
মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, “আমরা ভালোবাসা দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। ভালোবাসা দিতে চাই। যদি ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের জাতি গড়ার সুযোগ দেওয়া না হয়, তবে আমরা আমাদের মতো করে কাজ করব। আমাদের দেশপ্রেম ও ভালোবাসাকে দুর্বলতা মনে করবেন না।” ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের যতটুকু সুযোগ আছে, সবটুকু উজাড় করে দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চাই। মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিতে চাই।”
এ সময় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানকে বিজয়ী করায় মিরপুরবাসী ও সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি আরও বলেন, “ইনশাআল্লাহ, আমীরে জামায়াত ঢাকা-১৫ আসনে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাজ শুরু করবেন। অত্র এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করবেন এবং নানা জনস্বার্থ ও নাগরিক সুবিধা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেবেন।”
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে শান্তি, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমীর ও আসন পরিচালক আব্দুর রহমান মুসা, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি লস্কর মোহাম্মাদ তসলিম ও কবির হোসেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, মিরপুর পূর্ব থানা আমীর ও আসন কমিটির সদস্যসচিব শাহ আলম তুহিন, ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগর পশ্চিমের সভাপতি হাফেজ আবু তাহের, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি রেজাউল করিম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মহিব্বুল্লাহসহ জামায়াতের থানা আমীর, সেক্রেটারি এবং ১১ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।