খুলনা ব্যুরো, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা সংবাদদাতা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জুড়ে একটি তীব্র রাজনৈতিক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল খুলনা-৫ আসনের জামায়াত মনোনীত ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার ভাষায়, রাজধানী থেকে গ্রাম-গঞ্জ, শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর, দোকানদার, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও ছাত্রসমাজ সবার মুখে এখন একটাই উচ্চারণ, আমরা পরিবর্তন চাই। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাওয়া তিনটি দল সততা, নৈতিকতা, চরিত্র ও আমানতদারির পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, যারা বারবার পরীক্ষায় ফেল করে, তাদের আর পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয় না। জনগণ এবার সেই ফেল করা দলগুলোকেই রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চায়।

তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই একটি পক্ষ চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে নারী ভোটারদের হিজাব খুলে নেওয়ার হুমকি, শারীরিক নির্যাতন, সভা-মিটিংয়ে হামলা এবং পীর-মুরুব্বিদের হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই মায়েদের কাপড় খুলে দিতে চায়, তারা ক্ষমতায় গেলে গোটা জাতিকে বিবস্ত্র করে ফেলবে। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলেও দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বিএনপির দিকেও অভিযোগ তোলেন। তার ভাষায়, ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই যদি খাল-বিল, মাঠ-ঘাট দখল করা হয়, তাহলে ক্ষমতায় গেলে মা-বোন, হিন্দু-মুসলিম কারও জানমাল নিরাপদ থাকবে না। এই পরিস্থিতিতে জনগণ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি ইসলামী দল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জুলাই আন্দোলনের তরুণ শক্তি, এলডিপি, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলনসহ বিভিন্ন দেশপ্রেমিক দল এই ঐক্যে যুক্ত হয়েছে বলে জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লার বিজয় ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে একটি পক্ষ বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ব্যবহার করে সহিংসতা ও নাশকতার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লার বিজয় ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত এই টাকা দিয়ে চিহ্নিত দাগী পুরাতন সন্ত্রাসী যারা কারাগারে ছিল, যারা লুকিয়ে ছিল তাদের বাইরে আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব সন্ত্রাসীদের একত্রিত করে অবৈধ অস্ত্রধারীদের সঙ্গে মিলিয়ে নির্বাচনের সময় কেন্দ্রভিত্তিক সহিংসতা ও নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কালো টাকার যে স্রোত, পানির মতো ঢালা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও পে-স্কেল সংক্রান্ত আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, এসব দাবি যুক্তিসঙ্গত হলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন কোনো কর্মসূচি দেওয়া উচিত নয়, যাতে নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। যেকোনো দাবি নিয়মতান্ত্রিকভাবে তোলা উচিত। সরকারি কর্মচারীরা দেশপ্রেমিক নাগরিক ও ভোটার উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাত্র কয়েক দিন পরই নির্বাচন এই সময়ে অস্থিরতা সৃষ্টি না করাই সমীচীন। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে এসব দাবি নিষ্পত্তি করা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি। গতকাল শনিবার বিকেলে খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলা স্বাধীনতা চত্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন।

ফুলতলা উপজেলা আমীর অধ্যাপক আব্দুল আলিম মোল্লার সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম, অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস ও অধ্যক্ষ গাউসুল আযম হাদী, মহানগরী সহকারী সেক্রেটারি আজিজুল ইসলাম ফারাজী, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য শেখ সিরাজুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা আল মুজাহিদ, এডভোকেট ফিরোজ কবির, এডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্যা, আলী আকবর মোড়ল, খুলনা জেলা উত্তর ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতি মো. ইউসুফ ফকির। অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন ফুলতলা উপজেলা খেলাফত মজলিসের সভাপতি মাওলানা আলাল উদ্দিন সরদার, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মাসুম বিল্লাহ, খানজাহান আলী থানা আমীর হাসান মাহামুদ টিটু, মাওলানা শেখ ওবায়দুল্লাহ, মাওলানা সাইফুল হাসান, ড. আজিজুল হক, নজরুল ইসলাম জমাদ্দার, শেখ আলাউদ্দিন, শেখ আব্দুল আলীম, গাজী মোর্শেদ মামুন, মাষ্টার মফিজুল ইসলাম, ইঞ্জিঃ সাব্বির আহম্মেদ, শরিফুল ইসলাম মোল্যা, মাওলানা জুবায়ের হোসেন ফাহাদ প্রমুখ।

এর আগে শনিবার সকালে ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে ওলামায়ে মাশায়েখ ও আইম্মায়ে মাসাজিদদের নিয়ে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। সংগঠনের সভাপতি মাওলানা আব্দুর রহমান সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, ওলামায়ে মাশায়েখ ও আইম্মায়ে মাসাজিদদের সেক্রেটারি হাফেজ শহিদুল ইসলাম, খেলাফত মজলিসের খুলনা জেলা সহ-সভাপতি অধ্যাপক মুফতি আবদুল কাইয়ুম জমাদ্দার, ডুমুরিয়া উপজেলা আমীর মাওলানা মুখতার হোসাইন প্রমুখ। পরে তিনি দামোদও কারিকরপাড়া ও ইস্টার্ণ গেটে উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন। এ সময় তিনি এলাকাবাসীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীকের ভোট প্রার্থনা করেন।

ফুলতলা-ডুমুরিয়ার ১৪টি ইউনিয়নে অভূতপূর্ব গণজাগরণের কথা তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নারী-পুরুষের পাশাপাশি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, এই গণসমর্থন দেখে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যার ফলেই হুমকি ও ভয়ভীতি ছড়ানো হচ্ছে।

দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ২০০১ সালে আমি এমপি ছিলাম। তখন দেশ পাকিস্তান হয়নি, হিন্দুদের শাখা-সিঁদুরও কেড়ে নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক পরাজয়ের ভয় থেকে মিথ্যাচার ছড়িয়ে এবার দাঁড়িপাল্লার জোয়ার থামানো যাবে না।

মিয়া গোলাম পরওয়ার ঘোষণা দেন, ১১ দলীয় ঐক্য বিজয়ী হলে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করা হবে। সেই সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে, দলীয়করণ বন্ধ করবে এবং সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবে বলে তিনি অঙ্গীকার করেন।

নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে নৈতিকতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা, নারীদের মাস্টার্স পর্যন্ত বিনা খরচে শিক্ষা, ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিকদের ফ্রি চিকিৎসা, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের সরকারি চিকিৎসা, কৃষির আধুনিকায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, সুদমুক্ত ও যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে আইন-আদালত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত হবে, ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ হবে এবং খুনি ও দুর্নীতিবাজদের আর রক্ষাকবচ দেওয়া হবে না।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এমপি থাকাকালে তিনি ৩৫০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করেছেন এবং দুর্নীতির কোনো অভিযোগ তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়নি। বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি পুনরুজ্জীবন তার প্রধান অগ্রাধিকার বলেও তিনি জানান।

জনসভায় তিনি গুরুতর অভিযোগ করেন যে, দাঁড়িপাল্লার বিজয় ঠেকাতে আবারও দাগি সন্ত্রাসীদের সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে বোমা তৈরি ও অস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনার তথ্য তারা পাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি। প্রশাসনের উদ্দেশে তার স্পষ্ট বার্তা ভোট কেটে বা ভয় দেখিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার যুগ শেষ। মিয়া গোলাম পরওয়ার জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শক্ত বার্তা দেবে ফুলতলা।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, উপজেলায়, ইউনিয়নে ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিপুল অঙ্কের টাকা ছড়ানো হচ্ছে। ভোট কেনা, লোকজন আনা ও প্রভাবিত করার মতো কাজ চলছে বলেও তারা শুনতে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমরা এটাও শুনতে পাচ্ছি ভোট কেনা হচ্ছে, লোকজন নেওয়া হচ্ছে, প্রভাবিত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জামায়াতের প্রার্থীরা নিজেদের ভালো বলবেনই, কিন্তু আসল বিষয় হচ্ছে জনগণের মনোভাব। আমরা তো মনে করি, আল্লাহ পাকের মেহেরবানীতে এবং জনগণের যে ভালোবাসা দেখছি, তাতে ইনশাআল্লাহ আমরা বিজয়ী হব।

প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আচরণবিধি মনিটরিং কমিটি ও জুডিশিয়াল টিমের দায়িত্ব হচ্ছে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পক্ষে কোথায় কত টাকা ছড়ানো হচ্ছে সেটা প্রশাসন চাইলে অভ্যন্তরীণভাবে অনুসন্ধান করলেই জানতে পারবেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রতিটি থানার কাছে তথ্য রয়েছে কোন কোন এলাকায় কারা চিহ্নিত অপরাধী, কারা অবৈধ অস্ত্র বহন করে। ওসি, পুলিশ সুপার বা পুলিশ কমিশনার যদি সিনসিয়ার হন, তাহলে তারা নির্দেশ দিতে পারেন ভোট কেন্দ্রের আশপাশে যেসব চিহ্নিত সন্ত্রাসী ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হোক, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হোক।

নির্বাচনের দিনে ভোটারদের মধ্যে যেন ভয় তৈরি না হয়, সে জন্য আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শুধু বলেই শেষ নয় কালো টাকার ব্যাপারে প্রশাসনের অ্যাকশন হওয়া উচিত। তাহলেই ভোটটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠিত হবে। তা না হলে উৎকণ্ঠা থেকেই যাবে।

তিনি বলেন, ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশ দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য, মামলা বাণিজ্য, ফ্যাসিবাদ ও বিচারহীনতার উপহার পেয়েছে। আমরা এই বাংলাদেশ পাল্টে নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। নিজের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে , আমার বাড়ি সারা বাংলাদেশ। যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই পৌঁছে যাওয়া আমার দায়িত্ব। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে তিনি বলেন, হ্যাঁ জিতলে বাংলাদেশ জিতবে। হ্যাঁ মানে আজাদী। আর না মানে গোলামী।

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা আমাকে আপনাদের সেবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে ইনসাফ কায়েমের লড়াইয়ে শরিক হোন। দাঁড়িপাল্লা কেবল একটি প্রতীক নয়, এটি ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার।’ তিনি বলেন, ‘খুলনার মাটিতে আর কোনো জুলুম ও বৈষম্যের স্থান হবে না। ছাত্র-জনতার বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়।’

বুলেটের রাজনীতিকে আমরা ব্যালটের রাজনীতির মাধ্যমে পরাজিত করব----হাসানত আব্দুল্লাহ

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, একটি পক্ষ বুলেটের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর আমরা ব্যালটের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এই বুলেটের রাজনীতিকে আমরা ব্যালটের রাজনীতির মাধ্যমে পরাজিত করব। শনিবার খুলনা-৫ আসনের (ফুলতলা-ডুমুরিয়া) এলাকার ১১ দলীয় নির্বাচনী এক্যের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারে সমর্থনে ফুলতলায় অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন।

নির্বাচন কোনো সহজ অর্জন নয় উল্লেখ করে রাজনৈতিক নেতা হাসানাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, এই নির্বাচন পেতে সহস্র মানুষ শহীদ হয়েছেন, অসংখ্য মানুষ গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, এই নির্বাচন অর্জনের জন্য আমাদের মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। আয়নাঘর ছিল শুধু একটি স্থাপনা নয়Ñসারা বাংলাদেশই নিপীড়িত মানুষের জন্য উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছিল।

নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০০৯ সালের আগে বায়তুল মুকাররমের সামনে লগি-বৈঠার রাজনীতি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে ওসমান হাদির শাহাদাত পর্যন্ত দীর্ঘ রক্তাক্ত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আজকের নির্বাচন এসেছে। এই নির্বাচন শহীদদের রক্তে লেখা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে প্রশাসনের উদ্দেশে হাসানাত আব্দুল্লাহ বলেন, বিগত তিনটি নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। দিনের ভোট রাতে করা হয়েছে, মৃত মানুষকে কবর থেকে তুলে এনে ভোট দেওয়া হয়েছে, আমিরামি নির্বাচন পরিচালনা করা হয়েছে, এমন অভিযোগ করেন তিনি। তবে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ড উপর মহলের নির্দেশে করা হয়েছিল বলেই তারা বিশ্বাস করতে চান।

পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন তরুণ প্রজন্ম ও শহীদদের রক্তে অর্জিত। কোনো পুলিশ সদস্য যদি অবৈধ টাকার মুখোমুখি হন, তাহলে সন্তান, বাবা-মা ও দেশের মানুষের কথা মনে রাখার আহ্বান জানান তিনি। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি আবার ব্যালট বাক্স ভরে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে জনগণের বিদ্রোহ সামলানো যাবে না।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রশাসনকে জনতার কাতারে নেমে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরবে। একই সঙ্গে তিনি দুর্নীতি ও তদবিরমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার রাজনৈতিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন হাসানাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, অনেক সাংবাদিক সত্য তুলে ধরতে চাইলেও মালিকানার কারণে তা পারেন না। তার অভিযোগ, একটি গোষ্ঠী টেলিভিশন ও সরকারি প্রতিষ্ঠান দখল করে মিডিয়া মাফিয়াগিরি চালাচ্ছে। তিনি বলেন, জনগণ জেগে উঠলে কোনো মিডিয়ার প্রয়োজন হয় না জনগণই তখন মিডিয়া হয়ে ওঠে।

মিডিয়া মালিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট দলের প্রচারণা চালালে সেই গণমাধ্যম আর গণমাধ্যম থাকে না, দালালে পরিণত হয়। তিনি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের আহ্বান জানান।

ডুমুরিয়া ও ফুলতলা এলাকার ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, একটি পক্ষ কালো টাকা ও টাকার বস্তা নিয়ে নির্বাচনে নেমেছে। ভোটারদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ভোটের আগে একদিন টাকা নিয়ে পাঁচ বছর গোলাম থাকবেন, নাকি বিনা পয়সায় ভোট দিয়ে আগামী পাঁচ বছর সেবা নেবেন? ভোট বিক্রি করলে পাঁচ বছর জনগণকে গোলামি করতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ভোটকে পবিত্র আমানত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ভোটাধিকার অর্জনে শত সহস্র মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাদের রক্তের দোহাই দিয়ে তিনি ভোট কেনাবেচা না করার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, স্বৈরতন্ত্রের শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। যারা গোপনে সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তাদের ভূমিকা ইতিহাসে লেখা থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফুলতলা-ডুমুরিয়া আসনের প্রার্থী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই প্রার্থী দেশের যেকোনো আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখেন এবং এমপি থাকা অবস্থায় ব্যয় করা প্রতিটি টাকার হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন।

বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও চাঁদাবাজির কারণে দলের ভেতরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।