আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের পৃথক নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই ইশতেহারগুলোতে দুই দলই পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরেছে। এই ইশতেহারে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে দেশীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ (Bangladesh First) নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। জামায়াত জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনো ‘কালো চুক্তি’ পর্যালোচনা ও প্রয়োজনে বাতিল করা হবে। এছাড়া মুসলিম বিশ্ব (OIC) এবং ডি-৮ ভুক্ত দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছে দলটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের ইশতেহারের মূল সুর হলো, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। তবে নির্বাচনের পর এই নীতিগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বিশ্বশক্তির সাথে বাংলাদেশ কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি নিচে তুলে ধরা হলো:

জামায়াতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইসলামী সংহতি: জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ঘোষিত ২৬ দফার ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তা ও আদর্শিক কূটনীতিতে জোর দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে জামায়াত জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনো ‘কালো চুক্তি’ পর্যালোচনা ও প্রয়োজনে বাতিল করা হবে। এছাড়া মুসলিম বিশ্ব (OIC) এবং ডি-৮ ভুক্ত দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছে দলটি। নিরাপত্তার বিষয়ে দলটি বলেছে, বাংলাদেশের ভূখণ্ড যেন অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে না পারে, তা নিশ্চিত করার হবে।

জামায়াতের পররাষ্ট্রনীতির মূল পয়েন্ট: জামায়াত জানিয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে জাতীয় স্বার্থবিরোধী এবং বাংলাদেশের মর্যাদাহানি করে এমন সব দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজনে বিতর্কিত ও ‘কালো চুক্তি’গুলো বাতিল করা হবে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড, আকাশপথ বা সমুদ্রসীমা কোনো বিদেশি শক্তি যেন অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে না পারে, তার কঠোর নিশ্চয়তা দিয়েছে দলটি। ওআইসি (OIC) এবং ডি-৮ (উ-৮) ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে জামায়াতের। জামায়াত একটি ‘দেশপ্রেমিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন’ আধুনিক সামরিক বাহিনী গড়ার ওপর জোর দিয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশী নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ও স্বনির্ভরতা অর্জনকে তারা অগ্রাধিকার দেবে। অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও অন্য কারও হস্তক্ষেপ বরদাশত না করার নীতি গ্রহণ করেছে।

বিএনপি’র ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ও অর্থনৈতিক কূটনীতি: পররাষ্ট্র নীতির সম্পর্কে ইশতেহারে বিএনপি বলছে, তারা কোনো রাষ্ট্রের সাথে ‘প্রভু-ভৃত্য’ নয়, বরং সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখবে। আঞ্চলিক স্থবিরতা কাটাতে তারা সার্ক (SAARC) পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে ‘লুক ইস্ট’ পলিসি ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভর না করে উৎসে বৈচিত্র্য আনার কথা বলা হয়েছে। দলটির পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিশ্লেষণ: ইশতেহারে ঘোষিত এই নীতিগুলো নিয়ে ভূ-রাজনীতি ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আঞ্চলিক ভারসাম্য ও ভূ-রাজনীতির সম্পর্কে বাংলাদেশী বংশোদ্ভত ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিয়া মুহাম্মদ তরুণ-এর মতে, বিএনপির এই ইশতেহার মূলত আওয়ামী লীগের তৈরি করা শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা। তাঁর মতে, বিএনপি ‘ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের’ কিছু উপাদানকে নিজেদের ভাষায় আত্মসাৎ করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি দেখাতে চাইছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নাটকীয়ভাবে পুনর্নির্মাণ করতে পারে। এছাড়াও অর্থনীতিবিদরা বিএনপির ১ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি অর্থনৈতিক কূটনীতি ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দলের ইশতেহারেই ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি বিএনপি-জামায়াত জোট (বা পৃথকভাবে) ক্ষমতায় আসে, তবে ভারতের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা (যেমন: জঙ্গি দমন) কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে জামায়াতের ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি’ পর্যালোচনার ঘোষণা প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার সম্পর্কে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দুই দলই সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করার কথা বললেও জামায়াতের ‘ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়া’র ঘোষণাটি মূলত একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা অবস্থান। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিলেও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সাথে দর কষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করবে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সাহাবুল হক বলেন, বিএনপির ইশতেহারে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির অংশটি তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী ও কৌশলগত ইঙ্গিতপূর্ণ বলে মনে হয়। ইশতেহারে সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি মূলত আদর্শনির্ভর ও নীতিগত অবস্থানের ওপর জোর দেয়। ইশতেহারে মুসলিম উম্মাহর সংহতি, ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং পরাশক্তিনির্ভরতার বাইরে থাকার আকাক্সক্ষা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক এবং সাংবাদিক সাহাবুল হক আরও বলেন, বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পূর্ববর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির ফোকাস যেখানে অর্থনৈতিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, সেখানে জামায়াতের ফোকাস জাতীয় নিরাপত্তা ও মুসলিম বিশ্বের সংহতির দিকে।