রাজনীতি কি কেবলই আদর্শের লড়াই, নাকি রক্ত আর উত্তরাধিকারের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন? বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় এমন কিছু প্রভাবশালী পরিবারের গল্প, যেখানে ক্ষমতা প্রবাহিত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কোনো দেশে পিতা-মাতার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তাদরে সন্তান গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব, আবার কোথাও স্বামী-স্ত্রীর হাত ধরে সূচিত হয়েছে এক অনন্য রাজনৈতিক ধারা। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে শুরু করে সুদূর কানাডা কিংবা গ্রিসের রাজনীতিতে এই বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বিশ্বে অল্প কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবার আছে, যাদের তিন সদস্য কোনো দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানের গুরুদায়িত্ব সামলেছেন। তেমনই এক পরিবার বাংলাদেশের জিয়া পরিবার। স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্রগঠনের অস্থির সময় থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্তাল পথচলা, সামরিক শাসন-উত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠন থেকে সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী নতুন বাস্তবতা সবখানেই এই পরিবারের প্রভাব স্পষ্ট। জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির নেতৃত্বে আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) নতুন সরকার গঠন হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ সরকারের প্রধান হচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের শপথের মধ্য দিয়ে এই পরিবারগুলোর তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে জিয়া পরিবারও। বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার পর এবার বাংলাদেশ পরিচালনার ভার নিচ্ছেন ছেলে তারেক রহমান। রাজতন্ত্র বাদে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোন দেশে কোন কোন পরিবারের একাধিক সদস্য দেশ পরিচালনা করেছেন, তা দেখে নেওয়া যাক:
বাংলাদেশে জিয়া পরিবার: ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন প্রয়াত জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। সেনাপ্রধান হন তিনি। এরপর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয় তাকে। বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ এস এম সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজে চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন করেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে তার প্রতিষ্ঠিত দলটি এবার নিয়ে চার বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলো। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তখন খালেদা জিয়া ছিলেন পুরোদস্তুর গৃহিণী। স্বামীহারা খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। যুক্ত হন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে।
রাজনীতিতে এসে রাজপথের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান খালেদা জিয়া। চষে বেড়ান দেশের নানা প্রান্ত। এর ফলও পান। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর তিনি তিন দফা সরকারপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের একাধিক সাধারণ নির্বাচনে একাধিক আসনে দাঁড়িয়ে কখনোই কোনোটিতে না হারার অনন্য রেকর্ডও আছে তার দখলে। গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইন্তিকাল করেন।
মায়ের মৃত্যুর পর তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান হন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তার নেতৃত্বে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এখন বাবা-মায়ের পর তিনিও দেশ চালানোর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এর আগে গত ডিসেম্বরে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তিনি।
ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবার: জওহরলাল নেহরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ইন্দিরা গান্ধী নেহরুর কন্যা (ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী)। রাজীব গান্ধী (প্রধানমন্ত্রী) হলেন ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারত স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। নতুন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহরু। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এই নেতা স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ও নেহেরু ভূমিকা রেখেছেন। আর স্নায়ুযুদ্ধকালে সদ্যস্বাধীন ভারতকে জোট নিরপেক্ষ হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যেতেও নেহরুর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। দীর্ঘদিন অসুস্থতায় ভোগার পর ১৯৬৪ সালের ২৭ মে রাজধানী দিল্লিতে মারা যান প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার পরিবার থেকে ভারতের তিনজন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। পরের নামটি জওহরলাল নেহরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী।
ইন্দিরা দুই মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেন। ছিলেন ১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। এরপর ১৯৮০ সালে আবারও ইন্দিরার নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার গঠন করে। এই দফায় তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৮৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। ইন্দিরা ভারতের প্রথম ও একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলীতে ইন্দিরা নিহত হন।
মায়ের মরদেহ রেখে ওই দিনই ইন্দিরাপুত্র রাজীব গান্ধীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে শপথ নিতে হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ু রাজ্যের চেন্নাইয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাতে গিয়ে আত্মঘাতী বোমায় নিহত হন তিনি।
পাকিস্তানে ভুট্টো-জারদারি পরিবার: পাকিস্তানে বাবা এবং মেয়ে উভয়েই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি ছিলেন। বেনজির ভুট্টো হলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর কন্যা (মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী)। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর দলটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এর মাত্র তিন বছর পর, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পিপিপি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তান) বড় জয় পায়। সিন্ধু প্রদেশের ধনী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া আর পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ভুট্টো নিজেও পাঁচটি নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হন।
১৯৭৩ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের প্রথম একীভূত সংবিধান কার্যকর হলে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।
পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে ১৯৭৯ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।
পরবর্তী সময়ে পিপিপির হাল ধরেন জুলফিকার আলীর মেয়ে বেনজির ভুট্টো। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত বেনজির রাজনৈতিক ক্যারিশমা দেখিয়ে সরকারপ্রধান হন। তিনি পাকিস্তান তথা পুরো মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে বেনজির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদে তিনি ১৯৯০ সালের আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে আবারও সরকারপ্রধান হন বেনজির ভুট্টো। ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির লিয়াকত বাগে নির্বাচনী সমাবেশে হত্যাকা-ের শিকার হন বেনজির ভুট্টো।
শ্রীলঙ্কায় বন্দরানায়েকে পরিবার: শ্রীলঙ্কা (বন্দরনায়েকে এবং রাজাপাকসে পরিবার)। দেশটিতে বংশপরম্পরায় ক্ষমতা দখলের একাধিক নজির আছে। এস.ডব্লিউ.আর.ডি. বন্দরনায়েকে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে তাদের কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হন। এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে ছিলেন শ্রীলঙ্কার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৫৬ সালের এপ্রিলে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেন তিনি। এর আগে ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রাজনৈতিক দল শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি। তাকে আধুনিক শ্রীলঙ্কার (তখনকার সিলন) অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ধরা হয়। জনসাধারণের কাছে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। দেশটিতে জাতীয়তাবাদী সংস্কারের সূচনা করেছিলেন তিনি। ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আততায়ীর গুলীতে এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে নিহত হন।
শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন ২০০০ সালের আগস্ট অবধি। এরপর রাজনীতি থেকে অবসরে যান। এরও মাস দুয়েক পরে ২০০০ সালের অক্টোবরে তার মৃত্যু হয়। এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকে ও শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে দম্পতির মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা। বাবা-মায়ের পথ ধরে তিনিও শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে সফল একজন ব্যক্তি। চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী-দুই পদেই ছিলেন। ১৯৯৪ সালের আগস্টে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। একই বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।
থাইল্যান্ডে সিনাওয়াত্রা পরিবার: থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ২০২৫ সালের আগস্টে বরখাস্ত হন পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। ওই বছরের জুনে কম্বোডিয়ার সাবেক নেতা হুন সেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন তিনি। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ওই ফোনকলে নৈতিকতা লঙ্ঘন করেছিলেন পেতংতার্ন। ফলে সরকারপ্রধানের পদ হারান ফিউ থাই পার্টির এ নেত্রী। এর বছরখানেক আগে (২০২৪ সালের নভেম্বরে) প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন পেতংতার্ন। পেতংতার্ন থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী সিনাওয়াত্রা পরিবার থেকে দেশের শীর্ষ পদে আরোহণ করা তৃতীয় ব্যক্তি। তার বাবা থাকসিন সিনাওয়াত্রা থাই রক থাই পার্টি থেকে ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগপর্যন্ত এ পদেই ছিলেন তিনি।
উত্তর কোরিয়ায় কিম পরিবার: বাবা, ছেলে ও নাতি একই পরিবারের তিন প্রজন্মের তিনজনের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার উদাহরণ আছে উত্তর কোরিয়ায়। কিম পরিবার ১৯৪৮ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া শাসন করে আসছে। কিম ইল-সাং ছিলেন বর্তমান উত্তর কোরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা। ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার নেতা হিসেবে ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেন। পদে ছিলেন ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন তিনি। রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৪ সালের জুলাই, মৃত্যুর আগপর্যন্ত। বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা (প্রেসিডেন্ট) হন কিম ইল-সাংয়ের ছেলে কিম জং-ইল। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মারা যান তিনি।
গ্রিসে পাপানড্রেউ পরিবার: ইউরোপের দেশ গ্রিসের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার হলো পাপানড্রেউ। এই পরিবার থেকে তিন প্রজন্মের তিনজন ব্যক্তি দেশটির সরকারপ্রধান হয়েছেন। জর্জিয়াস পাপানড্রেউ তিন দফায় গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রথমবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯৪৪ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত।
নিকারাগুয়ায় সামোজা পরিবার: একই পরিবারের তিনজনের দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার নজির আছে নিকারাগুয়ায়। দেশটিতে এই রাজনৈতিক পরিবার ‘সামোজা পরিবার’ নামে পরিচিক। পরিবারটি থেকে প্রথম দেশের প্রেসিডেন্ট হন আনাস্তাসিও সামোজা গার্সিয়া। তিনি ১৯৩৭ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৪৭ সালের মে পর্যন্ত প্রথম দফায় এবং ১৯৫০ সালের মে মাস থেকে ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার আগপর্যন্ত দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। লুই সামোজা দেবাইলি এই পরিবারের দ্বিতীয় সদস্য যিনি রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছিলেন। তিনি আনাস্তাসিও সামোজা গার্সিয়ার ছেলে। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৬৭ সালে ক্ষমতায় বসেন লুইস সামোজা। ছিলেন ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত। ১৯৬৭ সালে তার মৃত্যু হয়।
পেরুর প্রাদো পরিবার : মারিয়ানো ইগনাসিও প্রাদো ছিলেন পেরুর এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধান, পরবর্তী সময়ে তার পরিবারের আরও দুজন দেশ শাসন করেছেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। অন্যজন ছিলেন সরকারপ্রধান। দুই মেয়াদে পেরুর প্রেসিডেন্ট ছিলেন মারিয়ানো ইগনাসিও প্রাদো। প্রথমবার ১৮৬৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এরপর ১৮৭৬ সালের আগস্ট থেকে ১৮৭৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি আরেক দফায় দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
কানাডার ট্রুডো পরিবার: উন্নত দেশগুলোতেও এমন উদাহরণ রয়েছে। পিয়েরে ট্রুডো কানাডার ১৫তম প্রধানমন্ত্রী। জাস্টিন ট্রুডো হলেন পিয়েরে ট্রুডোর বড় ছেলে। তিনিও কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সিঙ্গাপুরের লি পরিবার: সিঙ্গাপুরের ইতিহাসে লি কুয়ান ইউ এবং তার পুত্র লি সিয়েন লুং-এর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের সম্মিলিত নেতৃত্ব সিঙ্গাপুরকে একটি অনুন্নত দ্বীপরাষ্ট্র থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত দেশে রূপান্তরিত করেছে। লি কুয়ান ইউ আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক হিসেবে পরিচিত। তিনি ১৯৫৯ সালের ৫ জুন সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ ৩১ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৯০ সালের ২৮ নভেম্বর স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করেন।
জাপানের ফুকুদা পরিবার: জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাকেয়ো ফুকুদা এবং ইয়াসুও ফুকুদা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাপানের যুদ্ধোত্তর রাজনীতিতে বাবা ও ছেলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। তাকেয়ো ফুকুদা ছিলেন জাপানের একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৭৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর জাপানের ৬৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি জাপানের অর্থমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার শাসনামলে তিনি ‘ফুকুদা ডকট্রিন’ নামক একটি ঐতিহাসিক কূটনৈতিক নীতি ঘোষণা করেন, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে জাপানের সুসম্পর্ক স্থাপনে মাইলফলক হয়ে আছে। তিনি প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন।
একই পরিবার থেকে দুজন করে আরও যারা সরকার প্রধান ছিলেন: বিশ্বের অনেক দেশে একটি রাজনৈতিক পরিবার থেকে দুজনের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকারপ্রধান হওয়ার নজির রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ (বাবা-ছেলে), বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (বাবা-মেয়ে), সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এবং তার ছেলে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুং, কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো এবং তার ছেলে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো।
ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন সুকর্ণ। আরর্ দেশটির পঞ্চম ও প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ছিলেন তার মেয়ে মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী। আরও ছিলেন, সিরিয়ার সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল-আসাদ ও বাশার আল-আসাদ (বাবা-ছেলে), লেবাননের সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি ও সাদ হারিরি (বাবা-ছেলে), কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রো (দুই ভাই), ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট বাবা ফার্দিনান্দ মার্কোস এবং ছেলে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র (বংবং মার্কোস নামে পরিচিত)।
তথ্যসূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, বিবিসি, রয়টার্স, আল-জাজিরা, পিএম ইন্ডিয়া, শ্রীমাভো বন্দরানায়েকের ওয়েবসাইট