শিকদার শামীম আলমামুন, মানিকগঞ্জ : আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জের ৩টি সংসদীয় আসনে প্রার্থী হিসেবে মোট ২৭ জন জেলা রিটানিং কর্মকর্তার নিকট মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। বর্তমানে তা যাচাই-বাছাই চলছে। ৩টি আসনেই বিএনপির দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে দলের মনোনয়ন বঞ্চিত বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রার্থিতা দাখিল করেছেন। সাতটি উপজেলা ও দুইটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ জেলায় বিএনপির পক্ষ থেকে দলের বাইরে জোটের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে ১জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। চারদলীয় জোট থাকাকালীন সময়ে সর্বশেষ ২০০১ সালে এ জেলার তৎকালীন চারটি আসনে বিএনপি’র প্রার্থীরা বিজয়ী হলেও ২০০৮ সালের পর আর কখনো কোনো নির্বাচনে জোট থাকা সত্ত্বেও কেউ বিজয়ী হয়নি। আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টি জয়ী হয়েছে। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ পতনের পর এবার নির্বাচনে দৃশ্যপট অনেক পাল্টে গেছে, আসন বিন্যাস এবং ভোটারদের মন-মানসিকতায় অনেক পরিবর্তন এসেছে ফলে ভিন্ন কিছু ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। বিভিন্ন বয়সি ও শ্রেণী পেশার ভোটারদের সাথে কথা বলে তেমনটাই মনে হয়েছে। বর্তমান সরকারের অধীনে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে নিরপেক্ষ প্রভাবমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে,নারী-পুরুষ ভোটার গণ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে সেই প্রত্যাশায় গ্রামেগঞ্জে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে এই প্রত্যাশায় তরুণ তরুণীদের পোস্টে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে উঠেছে। হাটে বাজারে চায়ের দোকানে কর্মস্থলে নির্বাচনী আলাপ বেশ জমে উঠেছে।

মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয়) : তিনটা উপজেলা মিলিয়ে প্রায় ৪ লক্ষ ৬৭ হাজার ভোটার রয়েছে। এখানে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ৯ জন। এদের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী এনডিএফ নেতা ডাঃ মোঃ আবু বকর সিদ্দিক নতুন প্রার্থী হলেও বিনামূল্যে স্বাস্থ্য খাতে নানা রকম সেবা মূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকায় ভোটারদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এ জিন্নাহ কবীর দীর্ঘদিন এ এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজকর্ম করে পরিচিত। কিন্তু দলীয় তিন গ্রুপের দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত তিনি। জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক দৌলতপুর উপজেলা চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক তোজা (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন। তৃণমূলের বিরাট একটি অংশ তোজাম্মেল হকের সাথে কাজ করছে। এছাড়াও বিএনপি’র সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্র খন্দকার ডঃ আকবর হোসেন বাবলু দলীয় মনোনয়ন না পাওয়াতে বিরাট একটি অংশ দলীয় প্রার্থীর বিরোধী হয়ে উঠেছে। এর বাইরে আরো মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ছয়জন।

মানিকগঞ্জ-২ (সিংগাইর-হরিরামপুর) : মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন ৬ জন। দুটি উপজেলা একটি পৌরসভা ও সদর উপজেলার দুইটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে সাড়ে ৪ লক্ষাধিক ভোটার রয়েছে। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হলেন জেলা বিএনপি’র সাবেক সেক্রেটারি ও দলীয় চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ইঞ্জিঃ মাঈনুল ইসলাম খান শান্ত। এখানে সিংগাইর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবিদুর রহমান, জেলা বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল হক মোল্লা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১৩ দলীয় জোটের সমর্থন পেয়েছেন খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী মুহাদ্দিস শেখ মোঃ সালাহ উদ্দিন। এছাড়া জাতীয় পার্টি প্রার্থী সাবেক এমপি এস এম আব্দুল মান্নান, ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী মোহাম্মদ আলী মনোনয়ন দাখিল করেছেন । এ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মোঃ জাহিদুর রহমান। কিন্তু জোটগত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি।

মানিকগঞ্জ ৩- (মানিকগঞ্জ সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা) জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লক্ষ ১ হাজার ৫৬০ জন। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মনোনীত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ১২ জন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ঢাকা (উঃ) অঞ্চল সহকারী পরিচালক সাবেক জেলা আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন। তিনি ইতিপূর্বে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সাটুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে ভোটে নির্বাচিত হলেও তৎকালীন ফ্যাসিবাদী প্রশাসন বিশেষ মেকানিজমের মাধ্যমে তাকে পরাজিত ঘোষণা করে। বারবার কারা নির্যাতিত তৃনমূলে ব্যাপক জনপ্রিয় সদাহাস্যজ্বল দেলওয়ার হোসাইন ইতিমধ্যে বহুমাত্রিক সামাজিক কাজ ও গণসংযোগের মাধ্যমে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এদিকে গণফোরামের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি মফিজুল ইসলাম খান ১৯৭৩ সালে এমপি হলেও পরবর্তীতে সবগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেও কখনো আর বিজয়ী হতে পারেননি তবে এবারও প্রার্থিতা দাখিল করেছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলীয় চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা। তার মরহুম পিতা হারুনুর রশিদ খান মুন্নুমিয়া ২০০১ সালে চার দলীয় জোটের সমর্থনে এমপি হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের দপ্তরবিহীন মন্ত্রী ছিলেন। বিভিন্নভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাড়ানো আফরোজা রিতা একজন শক্তিশালী প্রার্থী। কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সিদ্ধান্ত না মেনে এখানে জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা স্বতন্ত্র প্রার্থীতা দাখিল করেছেন। বিএনপি’র একটি অংশ তাকে নিয়ে ভোট প্রার্থনা করে গণসংযোগ করে থাকে। এর বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মনোনীত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এখানে সর্বমোট ১২ জন প্রার্থীতা দাখিল করেছে।