ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদী হত্যা মামলায় ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে বাদীপক্ষের আপত্তি শুনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন।

ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের ডিসি মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান জানান, আদালত পুনঃতদন্ত করে ২০ জানুয়ারির মধ্যে সিআইডিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে।

হাদী হত্যা মামলায় ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। কিন্তু অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ। গত সোমবার মামলাটি শুনানির জন্য ছিল। আব্দুল্লাহ আল জাবের সেদিন অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিন সময় চান। আদালত তা মঞ্জুর করে গতকাল বৃহস্পতিবার অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য করেন।

এদিন ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেছেন মামলার বাদী। তার পক্ষে অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল শুনানি করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল, এজন্য তদন্ত কর্মকর্তা কেবল তা জমা দিয়েছেন। এখানে হত্যার পরিকল্পনাকারীদের সাথে হত্যাকারী শুটারদের কী সম্পর্ক তা উল্লেখ করা হয়নি। হাদী কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাকে হত্যার জন্য অবশ্যই বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল। এজন্য তাকে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়েছে। যেন কেউ আর হাদীর মত ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস না পায়। এ আইনজীবী বলেন, ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে আওয়ামী লীগের একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলেরর কথা বলা হয়েছে। এটা হাস্যকর। একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের এ সাহস করার কথা না। অবশ্যই বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল। এজন্য এ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আমরা নারাজি দিয়েছি। এখানে শুধু ফয়সালকে দেখানো হয়েছে। তার চেক জব্দ করেছে এটা হাস্যকর ব্যাপার। এটা কী ধরনের তদন্ত? প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার পর কীভাবে সেইফ এক্সিট পায়? কীভাবে হত্যাকারীর সাথে পরিকল্পনাকারী পালাতে সাহায্য করল, তাদের কথা বলা হয়নি অভিযোগপত্রে। তিনি বলেন, হাদী বারবার বলতেন ন্যায়বিচারের কথা এবং তাকে যদি মেরে ফেলে, সেই ন্যায়বিচারটাও চাইতেন। এজন্য আমরা ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ নারাজি দিয়েছি।

জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদীকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুরুতর আহত হাদীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদীকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদীর মৃত্যুর খবর আসে।

হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে। তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন।

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদীর দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই হাদীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং ভোটারদের মধ্যে ‘ভয়ভীতি তৈরি করতেই’ আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদীর নির্বাচনি প্রচারে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়।

শহীদ ওসমান হাদী হত্যার তদন্তে রাষ্ট্রীয় গাফিলতির অভিযোগ ইনকিলাব মঞ্চের

শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলায় দাখিল করা চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করে রাষ্ট্রের তদন্তে চরম অসহযোগিতা ও গাফিলতির অভিযোগ তুলেছে ইনকিলাব মঞ্চ। মামলার চার্জশিট পর্যালোচনা ও পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে এমন অভিযোগ জানায় সংগঠনটি। সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, আজ আদালতে শহীদ ওসমান হাদী হত্যা মামলার চার্জশিটের পর্যালোচনা শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে গত ১২ তারিখ প্রথম শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষকে সহায়তার জন্য আইনজীবীরা সময় চেয়েছিলেন। আজকের শুনানিতে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন ও চার্জশিটের বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, হত্যার রাতে রাত ১২টার দিকে গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের ফোন করে ঘটনাস্থল শনাক্ত করতে সহায়তা চায় এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের অনুরোধ জানায়। অথচ ঘটনার আগে-পরে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর এমন অসংগঠিত আচরণ রহস্যজনক। আব্দুল্লাহ আল জাবের অভিযোগ করে বলেন, আমি নিজেই মামলার বাদী হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত থানার পক্ষ থেকে মামলার কোনো কপি দেওয়া হয়নি। শাহবাগ, মতিঝিল ও পরবর্তীতে পল্টন থানায় একাধিকবার যোগাযোগ করলেও পুলিশ মামলার কপি সরবরাহ করেনি। তিনি বলেন, এদিকে একদিন বলা হচ্ছে আসামি ভারতে পালিয়েছে, আরেকদিন বলা হচ্ছে ঢাকায় রয়েছে। ডিবি জানায় মেঘালয়ে অবস্থান করছে, কিন্তু মেঘালয় পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে জানায় তারা কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

চার্জশিট প্রসঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব বলেন, এই তদন্ত প্রতিবেদন পুরোপুরি অস্পষ্ট ও দুর্বল। মূল পরিকল্পনাকারীদের নাম এতে নেই। হত্যাকাণ্ডের পেছনে যে একটি সংঘবদ্ধ খুনি চক্র কাজ করেছে, তা চার্জশিটে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চার্জশিটে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র ক্ষোভ থেকেই যদি হত্যা করা হয়, তাহলে দুই মাস ধরে তাকে নজরদারিতে রাখার দরকার ছিল না। তিনি আরও বলেন, হত্যার দিন পাঁচজন শ্যুটার প্রস্তুত ছিল- একজন ব্যর্থ হলে অন্যজন গুলি করত। ২১ জনের একটি টিম এই মিশনে ছিল বলে তথ্য রয়েছে। কিন্তু চার্জশিটে বাকি চারটি গ্রুপ ও টিমের কোনো উল্লেখ নেই।

আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, রাষ্ট্রের ধারাবাহিক অসহযোগিতার কারণে সন্দেহ জাগে- এই হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রের কেউ জড়িত কি না। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে যদি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, কিংবা সেনাপ্রধান, আওয়ামী লীগ, এমনকি শেখ হাসিনার সংশ্লিষ্টতাও থাকে সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।