বাংলাদেশে যাতে ফ্যাসিবাদী শাসন আর ফিরে না আসে, এজন্য সংস্কারের প্রস্তাবগুলো সর্বসম্মতভাবে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস হয়েছে। এটা এখন জাতীয় সংসদের বিষয়। আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। সেখানে সংসদ সদস্যগণ, যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, তারা এ বিষয়টি আলোচনা করবেন। এখন এ বিষয়টি আদালতের কাঁধে রেখে উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যারা চেষ্টা করছেন, আমরা মনে করি সেটা সঠিক নয়। এই প্রেক্ষাপটে আমরা আহ্বান জানাতে চাই- যে বিষয়টি জাতীয় সংসদের, তা জাতীয় সংসদ সদস্যদেরই পালন করতে দেওয়া উচিত বলে জানিয়েছে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি আরও বলেন, অতীতেও জাতীয় সংসদের কিছু বিষয় আদালতের কাঁধে ভর করে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তখন সংকট আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে এবং জাতীয় বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশেষ করে আপনারা জানেন, আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার কারণেই বিগত ১৬ বছর দেশে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক- তা আমরা আর দেখতে চাই না। তাই জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়টি জাতির সামনে স্পষ্ট হওয়া উচিত। বিষয়টি যেহেতু গণভোটে পাস হয়েছে, তাই আমরা অবিলম্বে এটি কার্যকর দেখতে চাই।
সোমবার (২ মার্চ) রাত ১০টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি প্রেস ব্রিফিং তিনি এ কথা বলেন।
এসময় অ্যাডভোকেট শিশির মনির এ বিষয়ে বলেন, আজ দুটি রিট পিটিশনের শুনানি হয়েছে। একটি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং সাংবিধানিক সংস্কার সভা গঠন এবং সংসদ সদস্য হিসেবে সংবিধান সংস্কার সভার সপক্ষে কেন সাংবিধানিক ঘোষণা দেওয়া হবে না- এই মর্মে একটি রুল চাওয়া হয়েছে। যত দিন পর্যন্ত রুল নিষ্পত্তি না হবে, তত দিন পর্যন্ত একটি নিষেধাজ্ঞা আদেশ চাওয়া হয়েছে।
আরেকটি রিট পিটিশনে গণভোট অধ্যাদেশের ধারায় যেখানে প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্ন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না- এই মর্মে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে।
এই রিট পিটিশনে আইন মন্ত্রণালয়, সেক্রেটারি, কেবিনেট ডিভিশন; সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেক্রেটারির ওপর নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে, যেন এ বিষয়সংক্রান্ত কোনো পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ না করা হয়। এই রিটের ওপর শুনানি হয়েছে।
শুনানিতে আমরা যে কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি-
১। গণভোটের প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। গণভোট তো হয়েই গেছে। প্রশ্নের ওপর মানুষ মতামত দিয়েই দিয়েছে। প্রশ্নে যখন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দেওয়া হয়, তখন প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করার অর্থ কী? এখন তো আর প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে না; চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে গণভোটের ফলাফলকে। যদিও বলা হচ্ছে প্রশ্নকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন তো ইতোমধ্যে ফলাফলে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ফলাফলকেই চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে।
২। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো- জুলাই জাতীয় সনদ হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে, মাত্র কয়েকটি ভিন্নমত ছাড়া। যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জারি করা হয়েছে, সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে- জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ আদেশ জারি করেছেন। এই আদেশটিকেও তারা সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করছেন।
তিনি বলেন, এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। আর মাত্র ১০ দিন বাকি আছে সংসদ বসার। এত তাড়াহুড়া করে দুজন আইনজীবীর মাধ্যমে এই রিট পিটিশন দায়ের করে- আসলে যারা দায়ের করেছেন তারা কী পেতে চান? আমি স্পষ্টভাবে সরকারের ইন্ধন দেখতে পেয়েছি। কোর্টে সরকারের ইন্ধন লক্ষ্য করেছি। আইনজীবীদের মধ্যেও সরকারের ইন্ধন দেখা যাচ্ছে। একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে- এই বিষয়টিকে আদালতে ‘সাব জুডিস’ বলে সংসদকে যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়। আমরা আদালতে প্রশ্ন তুলেছি, ১০ দিন অপেক্ষা করে সংসদ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আদালতের হস্তক্ষেপের কোনো কারণ থাকে না। যেহেতু নভেম্বর মাসে আদেশ হয়েছে, এখন মার্চ মাস। এতদিন চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজন হয়নি, তাহলে ১২ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করলে অসুবিধা কোথায়? এ প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর তারা দিতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। ‘ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চন’ নামে একটি নীতি রয়েছে, যেখানে উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয় আদালতের বিবেচনার বাইরে থাকে। তিনি প্রশ্ন রাখেন- বাংলাদেশের অভ্যুত্থান কি আদালতের নিয়ম মেনে হয়েছে? আদালতের আদেশ মেনে কি বিপ্লব হয়েছে? অন্তর্বর্তী সরকার, গণভোট বা জাতীয় নির্বাচন- এসব কি আদালতের নির্দেশে হয়েছে?
তিনি বলেন, একটি ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো- তারা জাতীয় নির্বাচনের অংশটুকু চ্যালেঞ্জ করেন না; শুধু গণভোটের অংশটুকু চ্যালেঞ্জ করেন। অথচ গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে, পাশাপাশি ব্যালটে হয়েছে। আপনি যদি গণভোট অধ্যাদেশের ৩ নম্বর ধারা চ্যালেঞ্জ করেন, তাহলে জাতীয় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ করেন না কেন? জাতীয় নির্বাচন ঠিক থাকবে, কিন্তু গণভোট থাকবে না- এমনটি কীভাবে সম্ভব? এতে বোঝা যায়, এই দুটি রিট পিটিশন ক্যালকুলেটিভ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অতীতে আদালতকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে, যা বুমেরাং হয়েছে। এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এর সমাধান হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, আজ যিনি বিচারক ছিলেন, তিনি এ সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। বিচার বিভাগে নিয়োগ কমিশন গঠনের পর সেই আইনের অধীনে হাইকোর্টে দুই সেট বিচারক নিয়োগ হয়েছে। আজকের জুনিয়র বিচারকও সেই আইনের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত। যদি অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বা গণভোট কিছুই বৈধ না হয়, তাহলে ওই মাননীয় বিচারকের নিয়োগ কীভাবে বৈধ হবে?
তিনি বলেন, কোনোভাবে বিপ্লবের চেতনা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বিষয়টিকে সংসদের পরিবর্তে আদালতের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন শুধু গণভোট বাতিলের দাবি উঠছে? কেন জাতীয় নির্বাচন বাতিলের দাবি উঠছে না? মাঝখানে আরও ১৩৫টি অধ্যাদেশ রয়েছে- সেগুলোর কী হবে? তাহলে কি আমরা আবার ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যাব?
তিনি বলেন, যদি তাই করতে চান, তবে সবই বাতিল করুন। কিন্তু তখন তারা রাজি নন। অর্থাৎ যা সুবিধাজনক তা রাখা হবে, আর যা অসুবিধাজনক তা বাদ দেওয়া হবে- এমন মানসিকতা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, একটি বিপ্লব-পরবর্তী চার্টারকে অপ্রাসঙ্গিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তা হবে রাজনৈতিক ও আইনি ভুল। বিচার বিভাগের কাঁধে বন্দুক রেখে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করা সঠিক নয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জনাব জাহিদুর রহমান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ্যাডভোকেট শিশির মো. মনির।