আগামী বছরের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এর আগেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে বিভক্তি ও অস্থিরতা। একদিকে চলছে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক, অন্যদিকে বড় বড় রাজনৈতিক দলের ভেতরেও তৈরি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা’ বা পিআর পদ্ধতি নিয়ে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং সদ্য গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চাচ্ছে, এবার নির্বাচন হোক এই নতুন পদ্ধতিতে। তাদের দাবি, আনুপাতিক পদ্ধতিতে বা পিআর পদ্ধতিতে সব দল নিজেদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন পাবে। তবে এই প্রস্তাবে একমত নয় বিএনপি। তারা মনে করছে, এতে তারা ভোটে জিতলেও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থা অনুযায়ী, জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে ৩০০টি আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচন করে। সেই সঙ্গে নারীদের জন্য রয়েছে ৫০টি সংরক্ষিত আসন। বিজয়ী দল সরকার গঠন করে এবং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ধরে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে নতুন নির্বাচন পদ্ধতি বা পিআর পদ্ধতি চালুর বিষয়ে। তবে এটি নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক ও সংশয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আনুপাতিক পদ্ধতি বা পিআর পদ্ধতি চালু হলে জামায়াত ও এনসিপির মতো ছোট দলগুলো উপকৃত হবে। আর এ কারণেই বিএনপি এই প্রক্রিয়া নিয়ে দ্বিধায় আছে। কারণ, তারা এককভাবে সরকার গঠন করতে চায়। আনুপাতিক ব্যবস্থার বা পিআর পদ্ধতির উদাহরণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা নর্ডিক দেশগুলোর কথা বলছেন। ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্কে এই ব্যবস্থা সফলভাবে কাজ করছে। কারণ এসব দেশে রাজনৈতিক ঐক্য ও আস্থার সংস্কৃতি আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ প্রিয়জিৎ দেব সরকার বলেন, বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন করে নতুন ভোট ব্যবস্থা চালু করা মানেই বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করা। এতে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গনের ভেতরের খবর বলছে, বিএনপি এখন মাঠপর্যায়ে প্রার্থী নির্বাচন এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে ব্যস্ত। অন্যদিকে জামায়াত তরুণদের আকৃষ্ট করতে চাচ্ছে, নতুন রূপে নিজেকে উপস্থাপন করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ও এনসিপি একসঙ্গে হয়ে নির্বাচনে বিএনপির বিপক্ষেই দাঁড়াতে পারে।
এদিকে, ভারতের ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করছেন, বিএনপির ভেতরেও এখন নতুন ও পুরাতন প্রজন্মের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন নেতৃত্বকে এগিয়ে আনতে চাইছেন, যেটি পুরোনো গার্ডের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। তিনি আরও জানান, এনসিপির ভেতরেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল আছে, যা তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগোতে বাধা দিচ্ছে। রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ হওয়া। যদিও দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, তাদের ভোটার এখনো রয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা হয়তো বিএনপিকে ঠেকাতে জামায়াত বা এনসিপির মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে ভোট দিতে পারেন।