২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার পর এটিই প্রথম ভোট, যেখানে ‘নতুন বাংলাদেশের’ রূপরেখা নিয়ে জনগণের মুখোমুখি হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এই পটপরিবর্তনের আবহে দেশের মোট ভোটারের অর্ধেক নারী সমাজকে ঘিরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উভয় দলই নারীকে উন্নয়নের মূল স্রোতে রাখতে চায়, তবে কৌশল ও স্থায়ী সমাধানের প্রশ্নে তাদের মধ্যে রয়েছে মৌলিক ভিন্নতা।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে প্রান্তিক নারীর তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুরক্ষাকে প্রধান্য দিয়েছে। দলটির ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের নারী প্রধানদের মাসিক ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে সাধারণ পরিবারের জন্য একটি সময়োপযোগী ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’ বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে অনেক বেশি কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদী। জামায়াত বিশ্বাস করে, কেবল মাসিক অনুদান নয়, বরং নারীর স্থায়ী আত্মমর্যাদা নিহিত রয়েছে তার স্বাবলম্বী হওয়ার মধ্যে। জামায়াতের প্রস্তাবিত ‘আমার আয়ের সংসার’ প্রকল্পটি মূলত প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার মাধ্যমে নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার এক বৈপ্লবিক রূপরেখা। হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু বা মাছ চাষে সরকারি পুঁজি ও তদারকির মাধ্যমে নারীকে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করতে চায় দলটি। বিশেষ করে অভাবগ্রস্ত ও বিধবা নারীদের জন্য এককালীন বিনিয়োগ সহায়তা জামায়াতের ইশতেহারকে অধিকতর বাস্তবমুখী ও টেকসই করেছে।

নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিএনপি ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘নারী সাপোর্ট সেল’ এবং অনলাইন হয়রানি বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপের কথা বলেছে। তবে জামায়াতে ইসলামী নিরাপত্তার বিষয়টিকে কেবল আইন প্রয়োগের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘প্রিভেন্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার আলোকে সাজিয়েছে।

নারীর জন্য নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে জামায়াত জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের পাশাপাশি গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা, আলাদা বাস সার্ভিস এবং রাস্তায় রাস্তায় ‘ইমার্জেন্সি পোল’ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে আলাদা বাসের প্রস্তাবটি কর্মজীবী নারী ও ছাত্রীদের প্রতিদিনের চরম ভোগান্তি অবসানে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের আধুনিকায়নে বিএনপি মেয়েদের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এটি নারী স্বাস্থ্যের প্রাথমিক সচেতনতায় বড় ভূমিকা রাখবে।

তবে জামায়াত এক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছে। ইডেন, বদরুন্নেসা ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ‘নারী বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাটি উচ্চশিক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এছাড়া প্রতিটি জেলায় পৃথক নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ওসিসি (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) স্থাপনের মাধ্যমে নারীর প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় আনতে চায় জামায়াত।

নারীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা যেখানে সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার, সেখানে জামায়াত একটি অনন্য প্রস্তাব সামনে এনেছে। তারা ‘সম্পত্তি সুরক্ষা কমিটি’ গঠন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রচারণার মাধ্যমে নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। এটি নারীর পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী আইনি সমাধান। বিএনপিও নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।

ইশতেহার নিয়ে আলাপকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দীকা বলেন, “বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ আধুনিক উদ্যোগ সন্দেহ নেই। তবে সরাসরি টাকা দেওয়ার চেয়ে নারীদের স্বাবলম্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উদ্যোক্তা পুঁজি দেওয়াটা অনেক বেশি সম্মানের।”

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ইশতেহারে তথ্য-প্রযুক্তির আধুনিক ছাপ ও আর্থিক প্রণোদনার প্রাধান্য থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারটি মূলত নারীর নিরাপত্তা, আইনি মর্যাদা এবং স্থায়ী অর্থনৈতিক মুক্তির একটি সমন্বিত দলিল।