আজ ৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) সন্ধ্যা ৬:১৫টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান একযোগে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন।

আমীরে জামায়াতের প্রদত্ত ভাষণ এখানে তুলে ধরা হলো-

প্রিয় দেশবাসী,

আসসালামু আলাইকুম। সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। আশা করি আল্লাহর মেহেরবানিতে আপনারা সবাই ভালো আছেন, সুস্থ আছেন।

আজ আমি আপনাদের সামনে এখানে এসেছি কোনো গতানুগতিক রাজনৈতিক ভাষণ দিতে নয়। আজ আমি একেবারে মনের ভেতরের কিছু কথা বলতে চাই। যে কথাগুলো একজন জেন-জি, একজন যুবক, আর আমাদের প্রজন্ম সবার সাথে সম্পৃক্ত। একজন মুসলমানের জন্য যেমন, তেমনি আমাদের দেশের অন্য ধর্মের ভাই-বোনদের জন্যও।

প্রিয় দেশবাসী,

আজ আমি এখানে যাদের কারণে কথা বলছি, সেই জুলাইয়ের শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। একই সাথে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদেরও গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে এখনও বহু মানুষ আহত আছেন আমি তাদের দ্রুত আরোগ্য ও সুস্থতা কামনা করছি। জুলাই হয়েছিল কারণ আমাদের দেশ এক হয়েছিল। জুলাইতে রাস্তায় নেমেছিল আমার তরুণ বন্ধুরা। রাস্তায় নেমেছিল আমাদের প্রিয় মা-বোন-মেয়েরা। রাস্তায় নেমেছিল শ্রমিক, রিকশাশ্রমিক ভাইয়েরা এবং সকল মেহনতি জনতা। ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও তখন এক হয়েছিল। শিক্ষক, প্রকৌশলী, ডাক্তারসহ সব শ্রেণির পেশাজীবী মানুষও রাস্তায় নেমে এসেছিল। দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও সে সময়ে প্রশংসনীয় ভুমিকা পালন করে। আমরা জুলাই আর চাই না; আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে আর কোনো দিন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয়।

আমাদের বুঝতে হবে, জুলাই কেন হয়েছিল। জুলাই হয়েছিল একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য। জুলাই হয়েছিল একটা কালো রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য। যুগের পর যুগ ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পরিবারতন্ত্রের হাতে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে। সেখান থেকে মুক্তির জন্য।

বিশেষকরে, ২০০৯ সাল থেকে জাতির উপর এমন এক শাসকগোষ্ঠী চেপে বসে যারা মানবাধিকার, ভোটাধিকারসহ সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলে। গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের উপর নিপীড়ন চালায়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ এর পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন নামে তামাশার মাধ্যমে আমদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্ছিত রাখা হয়। এই সব নিপীড়ন ও অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যই এসেছিল রক্তাত জুলাই। আমাদের তরুণরা এখন একটা নতুন দেশ দেখতে চায়। যে দেশকে তারা গর্ব করে বলতে পারবে নতুন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ২.০।

এক কথায় যদি বলি দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। কিন্তু একটি মহল পরিবর্তনের বিরোধী। কারণ পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এই সংস্কৃতি বদলানোর সাহস সবার থাকে না। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর হিম্মত সবার থাকে না। এই হিম্মত দেখিয়েছে আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওসমান হাদী ও তাদের সহযোদ্ধারা। তাদের রক্তের শপথ নিয়ে নতুন প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ সাহসী সন্তান আজ এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। এই দেশ আমাদের সময়ের এই সাহসী সন্তানদের হাতেই তুলে দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই তরুনরা রচনা করবে।

এই তরুণরা পরিশ্রমী।

এই তরুণরা সাহসী, এই তরুণরা মেধাবী।

এই তরুণরা পরিবর্তনকে ভালোবাসে।

এই তরুণরা নতুনকে আলিঙ্গন করে।

এই তরুণরা সত্য বলতে দ্বিধা করে না।

এই তরুণরা প্রযুক্তি বোঝে এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে জানে।

তারাই পারবে নতুন বাংলাদেশ গড়তে।

আমরা তোমাদের হাত ধরতে চাই। জুলাইয়ের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার কাজে সঙ্গী হতে চাই। প্রচলিত ধারা বদলাতে চাই। দেশটা বিভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকুক, মানুষের জীবনে শান্তি ফিরুক। এই আমাদের চাওয়া। সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে। এমন বাংলাদেশ যেখানে কেবল পারিবারিক পরিচয়ে কেউ দেশের চালকের আসনে বসতে পারবে না। এমন বাংলাদেশ যেখানে রাষ্ট্র হবে সবার, সরকার হবে জনগণের।

প্রিয় দেশবাসী,

জনগন চায় একটু নিরাপত্তা সুশাসন ও ইনসাফ । তাই আগামীর বাংলাদেশকে এসব অঙ্গীকার ও মূল্যবোধের আলোকে সাজাতে চাই। রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করে; কিন্তু এসব পরিকল্পনার সবগুলো যেমন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি তেমনি অনেকগুলো একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবী এবং এ সংস্কার প্রক্রিয়াকে জারি রাখাসহ সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। এ গণভোট জনগণের সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই গনভোটে হ্যা এর পক্ষে ভোট চাই।

নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্খার আলোকে আমাদের পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও অঙ্গীকার আপনাদের নিকট স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে আমরাই প্রথম পলিসি সামিট এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি কৌশল জনগনের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এর প্রতিফলন রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা অবদান রেখেছেন। এছাড়াও আমরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের সাথে বসেছি, এবং তাদের মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ নিয়েছি। আমরা সুযোগ পেলে, মহান আল্লাহ ইচ্ছায় জনগনের ভালবাসায় আমরা সরকার গঠন করলে প্রথম দিনে ফজর নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করব ইনশহাল্লাহ।

প্রিয় দেশবাসী,

আমাদের শাসক শ্রেণি সরকারি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেদেরকে দেশের মালিক গন্য করেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, পদ-পদবী-নীতি-প্রতিষ্ঠান, সবকিছু ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসাবে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে চুরি ও দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রতারিত করে জনগনের সম্পদ লুন্ঠন করেছে। উন্নয়ন প্রকল্প ব্যক্তিগত ও দলীয় লুন্ঠনের সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যাবস্থার অবসান ঘটানই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

আলহামদুলিল্লাহ, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর থেকে যারা জনপ্রতিনিধি হিসাবে সংসদ, সরকার ও স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালন করেছে তারা কেউই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়নি। তারা দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনারা দেশের মানুষ আপনারাই তার সাক্ষী।

প্রিয় দেশবাসী,

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে একটি নতুন স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক মহাসুযোগ হিসাবে এসেছে। যেসব সমস্যা আমরা বিগত দিনে সমাধান করতে পারিনি, যে লুটেরা গোষ্ঠীকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, সেসব সমস্যার সমাধান এবং লুটেরা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হচ্ছে আগামী নির্বাচন। তাই জনগণকে ঠিক করতে হবে আমরা আমাদের নিজেদের জন্য, আমাদের তরুণদের জন্য, আমাদের নারীদের জন্য, বয়স্ক মানুষের জন্য, প্রান্তিক মানুষের জন্য, শ্রমিকের জন্য, উদ্যোক্তাদের জন্য কোন বাংলাদেশ চাই।

আমাদেরকে প্রশ্ন করতে হবে আমরা কি সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা কি নিয়ম-নীতি-শান্তির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা কি উন্নত দেশ হতে চাই, আমরা কি শোষণ-জুলুম-দুর্নীতি-চাঁদাবাজ মুক্ত রাষ্ট্র চাই। আমাদেরকে ভাবতে হবে আমরা কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাই, যোগ্যতা ও সততাকে সরকারি পদের জন্য মৌলিক শর্ত করতে চাই; আমরা কি আমাদের জাতীয় সক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করতে চাই। এসব বিষয়ে যদি আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চাই তাহলে আমাদেরকে আগামী নির্বাচন নিয়ে নৈতিকভাবে ভাবতে হবে। রাজনৈতিক কথার ফুলঝুরির বাইরে এসে বাস্তবতার আলোকে সৎ, দক্ষ, নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছি যে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য ৫টি বিষয়ে হ্যা এবং ৫টি বিষয়ে না বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা হ্যা বলতে বলেছি। কারণ এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত, নৈতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজি-কে স্পষ্ট করে না বলতে হবে।

প্রিয় দেশবাসী,

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট কিন্তু জনসংখ্যায় বড় একটি দেশ। এ জনসংখ্যাকে অনেকে সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করলেও আমরা মনে করি এটি আল্লাহর নেয়ামত এবং এক বড় সম্পদ। তাই আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তি হিসাবে রুপান্তর করতে হলে নীতি ও নৈতিকতা ভিত্তিক রাজনীতির বিকল্প নাই। সমাজে নীতি-নৈতিকতা-শৃঙ্খলা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোন জাতি আগাতে পারেনি। আমাদের পক্ষেও সম্ভব না।

নারী

যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। আমরা ক্ষমতায় এলে নারীরা কেবল ঘরের ভেতরে নয়, সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরবে। কর্পোরেট জগত থেকে রাজনীতি—সবখানে তাঁদের মেধার মূল্যায়ন হবে কোনো বৈষম্য ছাড়াই। আমরা এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যেখানে কোনো মা বা বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের নির্বাচিত করুন।

প্রিয় দেশবাসী,

আমরা মনে করি সমাজে ন্যায় বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সকলকে মর্যাদা দিতে হবে এবং সকলের মানবাধিকার সুরক্ষা দিতে হবে। সকল পরিচয় নির্বিশেষে আমরা এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি যে একটি মানবিক-উন্নত দেশ গড়ার জন্য দল-মত-নির্বিশেষে সকলের মান-ইজ্জত-অধিকারের সুরক্ষা দিবো। এই বাংলাদেশ—মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মত ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করব।

প্রিয় দেশবাসী,

আমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে হলে তিনটি জায়গায় আমাদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

একটি হচ্ছে শিক্ষায় সংস্কার।

শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতা ভিত্তিক এবং সেটা হতে হবে টেক বেইজড। এখনকার সারা দুনিয়া প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার উপর নির্ভরশীল, আমরা সেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আমাদের সন্তানদের হাতকে আমরা দক্ষ কারিগরের হাত হিসেবে গড়ে তুলতে চাই এবং তাদের হাতে হাতে আমরা কাজ দিতে চাই। কোনো বেকার ভাতা তাদেরকে তুলে দিতে চাই না।

দ্বিতীয় জায়গাটা হচ্ছে বিচারাঙ্গন। ন্যায়বিচার সমাজে প্রতিষ্ঠা হলেই কেবল আমরা আমাদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে পারব। অন্যথায় দুঃশাসন এবং দুর্নীতির কণ্ঠরোধ মোটেই সম্ভব হবে না। অতএব, বিচার বিভাগকে আমূল ঢেলে সাজাতে হবে। সেখানে অবশ্যই সৎ, দক্ষ এবং কমিটেড যে সমস্ত লোকেরা আছেন তাদের বিচারের আসনে বসাতে হবে।

তৃতীয় জায়গাটা হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। এই ভঙুর অর্থনীতি নিয়ে দেশকে আগানো সম্ভব নয়। সুতরাং অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক যে সমস্ত খাত রয়েছে সে জায়গাগুলোতে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আমাদের হাত দিতে হবে। আমাদের ব্যবসাকে করতে হবে বিনিয়োগবান্ধব। বিনিয়োগবান্ধব হলেই দেশে কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং আমাদের বেকারত্ব দূর হবে। এই তিনটা জায়গায় আমাদের গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমরা আশা করবো দেশবাসী আমাদেরকে তাদের মূল্যবান ভোটের আমানত অর্পন করে আমাদের দেশকে প্রত্যাশার আলোকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন।

সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম,

একাধিক ধর্মের এ দেশে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই মুসলমান হিসাবে এটি আমাদের দায়িত্ব যে সমাজে ন্যায় বিচার, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। এগুলো ইসলামের শ্বাশত আদর্শ। সকল মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব; এটি আল্লাহ আমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলেছেন। এ দায়িত্ব আমরা সকলে মিলেই পালন করব। প্রিয় তাবলীগ জামাতের ভাইয়েরা, আপনারা দ্বীনের জন্য যে মেহনত করছেন, দেশ গড়ার কাজেও আপনারা আমাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবেন বলেও আমরা বিশ্বাস করি।

আমরা অঙ্গীকার করছি ভবিষ্যতে কেউ আপনাদেরকে অন্যায়ভাবে বিভিন্ন বিশেষণে ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করতে পারবে না। বিচার বহির্ভূতভাবে আপনাদেরকে হত্যা করতে পারবে না। আমরা জানি অতীতে আপনাদের কোন মানবাধিকার ছিল না। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হবে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় নীতি-পদ্ধতিতে আপনাদের আনুষ্ঠানিক অবদান ও ভূমিকাকে জোড়দার করা হবে।

আন্তর্জাতিক এবং জলবায়ু

আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সম মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করবো। আমরা অন্যের ভৌগলিক অখন্ডতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করবো, তেমনি সকল দেশের সাথে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিবো। তবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা, জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মাণে প্রধান ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক উন্নয়ন চ্যালেঞ্জসমূহ, বিশেষতঃ জলবায়ু পরিবর্তন, নিরসনে আমরা সাধ্যমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। নিপীড়নের শিকার হয়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্টীকে তাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।

প্রিয় প্রবাসী ভাই ও বোনেরা,

জন্মভুমি থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে আপনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, জেল জুলুমের শিকার হয়েছেন। ইতোমধ্যে আপনারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন বাংলাদেশে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ইতিহাস রচনা করেছেন। আগামী দিনে দেশ গড়ার এই অভিযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া আমাদের নতুন বাংলাদেশ -এর স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে। আমরা চাই প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে। সে লক্ষ্যেই প্রবাসীদের জন্য ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে—যারা প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, সেবা ও সমস্যার বিষয়ে দূতাবাস বা হাইকমিশনের সাথে সরাসরি সমন্বয় করে প্রবাসীদের স্বার্থে উপদেষ্টা ও প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে। এবং প্রবাসীরাও যেন সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করতে আনুপাতিক হারে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি নির্বাচন বা মনোনয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

প্রিয় দেশবাসী,

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আমরা গিয়েছি। আপনারা আমাদের সভা-সমাবেশে যোগ দিয়েছেন; আমাদের কথা শুনেছেন। আপনাদের ভালোবাস , অংশগ্রহন ও সহযোগিতায় আমরা অভিভুত। আমরা আপনাদের প্রতি চির কৃতজ্ঞ। আমাদের নির্বাচনী প্রচারণা বা অন্যান্য কার্যক্রমে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী।

আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সকল রাজনৈতিক দলের জন্য একটি বিরাট নৈতিক দায়িত্ব । তাই আমাদের আহবান হবে নির্বাচনী আচরণ-বিধিকে সম্মান জানানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বি রাজনৈতিক দলের বৈধ অধিকারকে সম্মান করা। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। আমাদের সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা অনেক কষ্ট করে আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান কভার করেছেন। আপনাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। আপনাদের ঋণ শোধ করতে পারবো না। আপনারা ভালো থাকবেন।

আমাদের দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী, শুভাকাঙ্খী এবং নির্বাচনী জোটের নেতৃবৃন্দ, কর্মীগণ নিরলস পরিশ্রম করেছেন। আর্থিক ত্যাগ করেছেন। শেরপুরে আমার ভাই রেজাউল করিম, প্রতিপক্ষের নির্মম আঘাতে, শাহাদাত বরণ করেছেন। আল্লাহ সকলের ত্যাগ ও কুরবানি কবুল করুন। আমাদের ভাই, জনাব মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদল, যিনি শেরপরু-৩ আসনের প্রার্থী ছিলেন, ইন্তেকাল করেছেন, আল্লাহ তাকে উত্তম পুরস্কার দিন ও জান্নাত নসীব করুন।

প্রিয় দেশবাসী,

আমরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হচ্ছে আমানত। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোন উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখবো ‘আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’। আমরা হযরত ওমরের সেই বিখ্যাত উক্তি ও দায়িত্বশীলতা মনে রাখবো যে, “ফোরাতের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মড়ে গেলেও আমি ওমর দায়ী থাকবো”। আল্লাহ’র নির্দেশ অনুসারে আমরা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবো, ইনশাআল্লাহ।

আশা করি আপনারা আমাদের অঙ্গীকার ও স্বপ্নকে বিশ্বাস করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের প্রতি সমর্থন দিবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদেরকে দাঁড়ি পাল্লা মার্কায় এবং যেসব অঞ্চলে ১১ দলীয় প্রার্থী আছে সেসব এলাকায় ১১ দলীয় প্রতীকে ভোট দিবেন, এ আকুল আবেদন আপনাদের প্রতি রাখলাম। আল্লাহ পরিবর্তনের এক মহাসুযোগ আমাদেরকে দিয়েছে, আসুন সেটা কাজে লাগাই। বিগত দিনের রাজনীতি পরিহার করি। একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করি যেখানে সবাই মান-ইজ্জত-মর্যাদা নিয়ে বাস করবে।

আল্লাহ আমাদের প্রতি সহায় হোন।

আল্লাহ আমাদের অঙ্গীকার পালনে সহায়তা দিন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জিন্দাবাদ

১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জিন্দাবাদ

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ