ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তারেক রহমান। লন্ডনে দীর্ঘ ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে ভোটার তালিকায় নিজের নাম তোলার পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এছাড়া তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও ভোটার হওয়ার কার্যক্রম শেষ করেছেন। আজ রোববার নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সিধান্ত জানানো হবে।

কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শনিবার সকালে গুলশানের বাসা থেকে বের হন তারেক রহমান। তবে গত দুই দিনের মতো গতকাল লাল-সবুজ রঙে সাজানো বাসে যাননি তিনি। সাদা রঙের একটি গাড়িতে (এসইউভি) চড়ে যান তিনি, গাড়িটি ছিল ফুল দিয়ে সাজানো। এই গাড়ির পেছনে আরেকটি গাড়িতে ছিলেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।

গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার তৃতীয় দিন গতকাল শনিবারও ব্যস্ত সময় পার করেছেন তারেক রহমান। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর কবর জিয়ারত করেন। তিনি মরহুমের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে বিশেষ মুনাজাতে অংশ নেন। এরপর তিনি জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের কবরও জিয়ারত করেন। তিনি সেখানে কিছু সময় অতিবাহিত করেন। এরপর নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে যান তিনি। সেখানে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে বনানীতে নিজের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করতে যান তিনি।

২৭ ডিসেম্বরই ভোটার হচ্ছেন তারেক রহমান, বিএনপির পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছিল আগেই। সেজন্য সব প্রস্তুতিও সেরে রাখে নির্বাচন কমিশন কর্তৃপক্ষ। বিএনপি মিডিয়া সেল জানায়, শনিবার আঙুলের ছাপ, চোখের মণির (আইরিশ) প্রতিচ্ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান করেন।

ভোটার হতে প্রদানকৃত তথ্য দেওয়ার পর তারেক রহমানের এনআইডি পেতে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা লাগবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এস এম হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, ভোটার হতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ছবি, আইরিশ ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। এগুলো ইসির ডাটাবেজে আপলোড করা হয়। ডাটা সেন্টারে থাকা ভোটারদের তথ্যের সঙ্গে ক্রসম্যাচ করা হয়। এরপর একটি নাম্বার তৈরি হয়। এটা সফটওয়্যারে করা হয়। এ কাজে কত সময় লাগবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ৫ ঘণ্টা, ৭ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে আরও বেশি লাগে, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে একটু কম লাগে। তবে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই তারেক রহমান এনআইডি পেয়ে যাবেন বলে তিনি জানান।

গতকাল দুপুর ১টার দিকে নির্বাচন ভবনের পেছনে অবস্থিত নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনে যান তারেক রহমান। ওই ভবনের নিচতলার একটি কক্ষ প্রবাসী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এনআইডি সংক্রান্ত সেবা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত। ওই কক্ষে গিয়ে ছবি তোলা, দশ আঙ্গুলের ছাপ দেওয়া, চোখের আইরিশ (চোখের মণির ছাপ) ও স্বাক্ষর করার কাজ করেন তারেক রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদসহ অন্য কর্তারা। তথ্য প্রদানের পর তারেক রহমান সবার সাথে কুশরলাদি বিনিময় করেন। তিনি সুন্দরভাবে সব কাজ সমাপ্ত হওয়ায় সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

জানা গেছে, রাজধানীর গুলশানের ঠিকানায় ভোটার হতে সার্বিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমান। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, গুলশান এলাকার একটি বাসার ঠিকানা ব্যবহার করে তারা ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেছেন। ইসি সূত্র জানায়, ভোটার নিবন্ধনে তারেক রহমান ও জাইমা রহমানের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাসা নম্বর এন ই-ডি৩/বি, ওয়ার্ড নম্বর ১৯, গুলশান অ্যাভিনিউ, পোস্ট কোড ১২১২। আর বর্তমান ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে ধানম-ি ১৫ নম্বরে ধানম-ি আবাসিক এলাকার একটি বাসা।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান ও জাইমা রহমান যেখান থেকে ভোটার হতে ইচ্ছুক সেটি ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের আওতাধীন গুলশান এলাকার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে। আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ হওযার পর ভোটার তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে গুলশান এলাকার ভোটার হিসেবে তাদের অবস্থান ফাইনালি চূড়ান্ত হবে।

ইসি সূত্র আরও জানায়, তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এর আগে চলতি বছরের জুন মাসের দিকে গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসার ঠিকানায় ভোটার হন। ওই বাসভবনের ঠিকানা হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, গুলশান-২, ১৯ নম্বর ওয়ার্ড, ঢাকা-১৭ আসন।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই ও বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরই তাদের ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। ভোটার তালিকা আইনের আওতায়। এতে কোনো ধরনের আইনগত জটিলতা ছিল না।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের দেওয়া তথ্যগুলো এখন কেন্দ্রীয় সার্ভারে থাকা কোটি কোটি তথ্যের সঙ্গে যাচাই করে দেখা হবে। কোনো অমিল না থাকলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস পাঠানো হবে। সেই লিংকে ক্লিক করে তিনি নিজেই নিজের এনআইডি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। এছাড়া তিনি চাইলে নির্বাচন কমিশন থেকেও সরাসরি স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।

তারেক রহমানের জন্মস্থান বগুড়া হলেও ভোটার হওয়া নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’-এর ঠিকানায় ভোটার হওয়ার আবেদন করেন।

২০০৮ সাল থেকে দীর্ঘ সময় প্রবাসে অবস্থানের কারণে তারেক রহমানের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে ভোটার হওয়া বাধ্যতামূলক। যদিও পৈতৃক আসন বগুড়া-৬ থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি ছিল, কৌশলগত কারণে তিনি ঢাকার অভিজাত এই আসনের ভোটার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এনআইডি পাওয়ার মাধ্যমে তার পাসপোর্ট নবায়ন থেকে শুরু করে নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পথ আরও সহজ হবে।

এদিকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানের আবেদন নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, এ বিষয়ে আজ রোববার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, রোববার নির্বাচন কমিশনে এটা পেশ করা হবে। কমিশনের সিদ্ধান্তের পরে উনাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে। এই আবেদন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিশন বৈঠকে বসবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিবন্ধনটা চলমান প্রক্রিয়া। নিবন্ধন কমপ্লিট করেছেন তিনি। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি যা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সে ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত লাগবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত দুইভাবে পাওয়া যায়। একটা হচ্ছে আনুষ্ঠানিক সভা করে, আরেকটা হচ্ছে নথির মাধ্যমে।

ভোটার হতে জাইমার আবেদন : ভোটার হতে আবেদন সম্পন্ন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। ভোটার নিবন্ধন কাজ সম্পন্ন করতে মা ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে দুপুর ১২টা ২৬ মিনিটে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ভবনে প্রবেশ করেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। সেখান থেকে তারা কার্যক্রম শেষ করে ১২টা ৪৫ মিনিটে বের হয়ে যান বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে।

কোকোর কবর জিয়ারত : ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত কবলেন তারেক রহমান। শনিবার দুপুর ২টা দিকে বনানী কবরস্থানে আসেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কবরের পাশে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকেন নিরবে। এরপর সুরা ফাতেহা ও দরুদ শরীফ পাঠ করে ভাইয়ের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন তারেক রহমান।

২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হুদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো। ওই সময়ে লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন তারেক রহমান। একদিন পরে কোকোর লাশ দেশে এনে বনানী কবর স্থানে দাফন করা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতনের কারণেই কোকোর মৃত্যু ঘটেছে।

কোকোর কবর জিয়ারতের পর তারেক রহমান যান বনানীর সামরিক কবরস্থানে। যেখানে শুয়ে আছেন তার শ্বশুড় সাবেক নৌ বাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান। সেখানে ফাতেহা পাঠ করে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন তারেক রহমান।

পিলখানায় শহীদদের কবর জিয়ারত : পিলখানা ট্র্যাজেডিতে শহীদ ৫৭ সেনা কর্মকর্তার কবর জিয়ারত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার দুপুরে রাজধানীর বনানীতে সামরিক কবরস্থানে এ জিয়ারত করেন তিনি। এসময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। ২০০৯ সালে ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদরদপ্তরে শহীদ হন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ সেনা কর্মকর্তা।

শ্বশুর বাড়ি গেলেন : দীর্ঘ দেড় যুগপর পর রাজধানীর ধানমন্ডিতে শ্বশুরবাড়ি মাহবুব ভবনে গেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটের দিকে গুলশান এভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসভবন থেকে তাকে বহনকারী গাড়িবহর শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করে। এদিকে তারেক রহমানকে জামাইয়ের আদরে গ্রহণ করেন শাশুড়ি। সেখাকে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়।