আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশ পরিবর্তনের এক যুগান্তকারী ঘটনার স্বাক্ষী হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে যারা বিজয় লাভ করবেন বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের গুরুদায়িত্ব পড়বে সেই দলের উপর। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটার সংখ্যা প্রায় চার কোটি। যা মোট ভোটারের প্রায় ৩০ শতাংশ হবে আর এ তরুণ ভোটারদের উপর নির্ভর করবে আগামী নির্বাচন কোন দল সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তবে ভোট প্রদানের আগে কিছু বিষয় তরুণদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহলো, নতুন সরকার কি আগের মতো ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবে নাকি তারা দেশ পরিবর্তনের ব্রত গ্রহণ করবে। আর দেশকে এগিয়ে নিতে নতুন সরকার কি কি পদক্ষেপ নিবেন। দূর্নীতি, চাঁদাবাজি, লুটপাট প্রতিরোধেই বা তারা কি কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। এসকল প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই কয়েকজন তরুণ ভোটারের মতামত তুলে ধরা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
ভোট না দেওয়াও এক ধরনের চাঁদাবাজির সুযোগ সৃষ্টি করে
আশরাফুল হক, গনিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে নতুন ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। নতুন ভোটারদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি এবং তাদের মধ্যে শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিকের অংশও উল্লেখযোগ্য। তারা যদি ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার না দেয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলো পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থী মনোনয়নে বাধ্য হবে।
ভোট প্রদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় এসে কিংবা ক্ষমতার আশ্রয়ে চাঁদাবাজিতে জড়িত রাজনীতিবিদদের প্রত্যাখ্যান করলে অপরাধভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা যায়।
বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটালি সক্রিয়। তারা চাঁদাবাজির ঘটনা তুলে ধরা, এ বিষয়ে আলোচনা সৃষ্টি করা এবং জনমত গঠনের মাধ্যমে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।
ডিজিটাল দায়িত্বশীলতা নতুন ভোটারদের একটি বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গুজব শনাক্ত করা, নির্ভরযোগ্য উৎস ছাড়া তথ্য প্রচার না করা এবং ভুয়া অ্যাকাউন্ট রিপোর্ট করার মাধ্যমে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। এতে অপরাধী চক্রের অনলাইন প্রচারণা দুর্বল হয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মভিত্তিক গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভুয়া বট আইডির মাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও মিথ্যা ধর্মীয় ব্যাখ্যা ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়।
ভোট না দেওয়াও এক ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করে। নতুন ভোটারদের উদাসীনতা পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে সচেতনভাবে ভোট দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
এছাড়া, চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সচেতন, সাহসী ও সক্রিয় নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণও অপরিহার্য। তাদের ভোটই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বাস্তব ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
দলীয় প্রভাবমুক্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা
সুমাইয়া নাজনীন, ল’ এ্যন্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়।
সামনে জাতীয় নির্বাচন। রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল বা ধারাবাহিকতার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ ভোটার হিসেবে আমার মনে যেমন প্রত্যাশার রেণু উড়ছে, তেমনি কিছু চিরচেনা শঙ্কাও কাজ করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পথে যে ব্যাধিটি দীর্ঘকাল ধরে 'ক্যানসার'-এর মতো জেঁকে বসে আছে, তা হলো— চাঁদাবাজি। বিভিন্ন খাতের তথ্য-উপাত্ত এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই একটি অপসংস্কৃতির কারণে আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও অসহনীয় হয়ে উঠছে।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা: আমরা দেখেছি, অতীতে যখনই ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ কেবল এক হাত থেকে অন্য হাতে গেছে, কিন্তু এর অবসান ঘটেনি।
স্থানীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় ফুটপাত, পরিবহন স্ট্যান্ড এমনকি সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি নির্মাণের সময়ও নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা দাবি করা ছিল একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত।পণ্যবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে পাইকারি আড়ত পর্যন্ত স্তরে স্তরে চাঁদাবাজির ফলেই আজ সাধারণ ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠছে। মাঠপর্যায়ে ১০ টাকার সবজি ঢাকায় এসে কেন ৫০ টাকা হয়, তার পেছনে এই অদৃশ্য হাতের ভূমিকা এখন আর কারও অজানা নয়।
অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ যখনই কোনো নতুন ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছে, তাকে শুরুতেই রাজনৈতিক মাশুল বা 'সালামি'র মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে মেধাবী অনেক তরুণ বিনিয়োগ বিমুখ হয়ে পড়ছে।
সামনের নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, কেবল মৌখিক আশ্বাসে আমরা আর সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আমাদের চাওয়াগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও গঠনমূলক:
দলীয় প্রভাবমুক্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা:
চাঁদাবাজির সাথে জড়িত ব্যক্তি যদি ক্ষমতাসীন দলেরও হয়, তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। অপরাধীকে 'রাজনৈতিক কর্মী' হিসেবে নয়, বরং 'জনগণের শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।
ডিজিটাল নজরদারি ও আর্থিক স্বচ্ছতা:
পরিবহন সেক্টর এবং বাণিজ্যিক হাবগুলোতে নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম ও সিসিটিভি নজরদারি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অটোমেশন চালু হলে চাঁদাবাজদের ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও সক্রিয় ভূমিকা:
থানা-পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত একশন নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগকারীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
খাতভিত্তিক সংস্কার ও সিন্ডিকেট নির্মূল:
বিশেষ করে কৃষি ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। পণ্যের সরবরাহ চেইন থেকে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের সরিয়ে সরাসরি উৎপাদক ও ভোক্তার সংযোগ স্থাপন করতে হবে।
একজন তরুণ ভোটার হিসেবে আমি মনে করি, চাঁদাবাজি কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে মেধা ও শ্রমের পূর্ণ মর্যাদা থাকবে। সামনের নির্বাচনে আমাদের ভোট হবে সেই নেতৃত্বের পক্ষে, যারা একটি চাঁদাবাজিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার সৎ সাহস রাখবেন। আমরা আর পেছনে ফিরতে চাই না; আমরা চাই একটি ভয়হীন বাংলাদেশ, যেখানে পরিশ্রমের ফসল হবে কেবলই সাধারণ মানুষের।
চাঁদাবাজির বিষয়গুলো আমাদের জন্য অনেক হতাশাজনক
সাদমান জাহাঙ্গীর, একাউন্টিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
চাঁদাবাজি বর্তমানে অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে আন্দোলন পরবর্তী সময়ে যখন আমরা সবাই একটা পরিবর্তনের আশা করেছিলাম, এধরনের সমস্যা থেকে সম্পূর্ন পরিত্রাণের কথা ভেবেছিলাম তখন ক্রমাগত চাঁদাবাজির বিষয়গুলো আমাদের জন্য অনেক হতাশাজনক। শ্রমজীবি দরিদ্র মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ চাঁদাবাজির প্রধান শিকার। যার ফলে শুধু ব্যাক্তি না, দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই চাঁদাবাজি দমনে যথাযথ আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজন। এবং আইশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সচেষ্ট হতে হবে যেন চাঁদাবাজদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত হয়। তরুণ ভোটার হিসেবে যেই ব্যাক্তি বা রাজনৈতিক দল চাঁদাবাজিসহ বর্তমান সমস্যাগুলোর সময়োপযোগী সমাধান করতে পারবে তাদেরকেই ভোট দিব যেন দেশ থেকে এসব সমস্যা সমাধানে তারা কার্য্যকর উদ্যোগ নিতে পারেন।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে
শাহরিয়ার আহাদ, মেডিকেল শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ।
বাংলাদেশ, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, যে দেশটি সম্ভাবনাময়, ঐতিহ্যময় এবং সংস্কৃতির এক অসাধারণ মেলবন্ধন। তবে, দুর্নীতি ও চাদাবাজি আমাদের উন্নতির অগ্রযাত্রাকে ভীষনভাবে কলঙ্কিত করছে । নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি বর্তমানে একটা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে ।
এটা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষের উপর একটা অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করছে, আতঙ্ক সৃষ্টি করছে এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধিতেও চাঁদাবাজির একটা প্রভাব আমারা স্পষ্টই দেখতে পাই।
আর খুবই দুঃখজনকভাবে এই চাঁদাবাজি যখন কোন রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়ে থাকে তখন তা খুবই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পরে। অনেক সময় প্রশাসন ও চাঁদাবাজ দমনে ব্যার্থ হয়
তাই আমি মনে করি একই সঙ্গে আইনের সঠিক প্রয়োগ যেমন জরুরি, ঠিক তেমনিভাবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও বন্ধ করতে হবে।
পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যুব সমাজের অংশগ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি