মহিব্বুল আরেফিন ও নুর আলম নেহাল, রাজশাহী ব্যুরো : জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, যাদের ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আজ সংসদ ও গণভোট সম্ভব হয়েছে, তাদেরই এখন অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। তরুণদের আত্মত্যাগের ফলেই দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। বিএনপির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া কেউ ক্ষমতায় বসবে না। অথচ এখন ৪৭ জেলায় প্রশাসক বসানো হয়েছে। সিটি করপোরেশনেও প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা গুম কমিশন চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনারাও স্বৈরাচারী পথেই হাঁটছেন।”

শনিবার দুপুর দু’টায় রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ নিরসন এবং ফারাক্কা ইস্যুতে পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জনসম্পৃক্ত বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি। উপস্থাপনা করেন রাজশাহী মহানগরী জামায়াত সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল, রাজশাহী জেলা জামায়াত সেক্রেটারি মো. গোলাম মুর্তজা ও এনসিপি’র রাজশাহী মহানগরীর আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার এখন এসব আন্দোলনকারীকে শিশু সংগঠন বা গুপ্ত সংগঠন বলছে। কিন্তু জনগণের ৭০ শতাংশ রায়কে অস্বীকার করা যাবে না। এখনো সময় আছে এসে বলুন, আমরা জনগণের রায় মেনে নিচ্ছি। তাহলে জনগণ আপনাদের ক্ষমা করবে। আমীরে জামায়াত বলেন, “ভালো কাজ করলে আমরা পানির মতো তরল থাকবো, আর অন্যায় করলে ইস্পাতের মতো কঠোর হবো।” আপনারা চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশের কথা বলেছিলেন, কিন্তু এখন সমঝোতার নামে চাঁদাবাজি বৈধ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সবখানে যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের বসানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “সংসদে কথা বলতে না দিলে আমরা রাজপথে কথা বলবো। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। যারা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসতে পারে, তারা কোনো হুমকিকে ভয় পায় না।” সীমান্ত হত্যা নিয়ে ডা. শফিক বলেন, “আমরা প্রতিবেশী দেশকে সম্মান করি, কিন্তু আমাদের দিকে চোখ রাঙাবেন না। আমাদের ঘুম হারাম করলে আমরাও আপনাদের শান্তিতে থাকতে দেবো না। বাংলাদেশের পদ্মা ও তিস্তার বিশাল অংশ আজ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। নদীকে তার যৌবন ফিরিয়ে দিতে হবে।” তিনি বলেন, “আমরা ভালো কাজের পক্ষে সবসময় থাকবো। কিন্তু অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করবো। জনগণের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে। আমরা জীবন দিতে পারি, কিন্তু দেশের মর্যাদা বিকিয়ে দেবো না।”

এ সময় জামায়াত নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য প্রদান করেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, রাজশাহী মহানগরী আমীর ড. মো. কেরামত আলী এমপি, পাবনা জেলার আমীর অধ্যাপক আবু তালেব মণ্ডল এমপি, জয়পুরহাট জেলার আমীর ফজলুর রহমান সাঈদ এমপি, রাজশাহী জেলা আমীর অধ্যাপক আব্দুল খালেক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আমীর মাওলানা আবু জার গিফারী, নাটোর জেলা আমীর ড. মীর নুরুল ইসলাম, নওগাঁ জেলা আমীর মো. আব্দুর রাকিব, সিরাজগঞ্জ জেলা আমীর মো. শাহিনুর আলম, বগুড়া জেলা আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হক, বগুড়া মহানগরী আমীর অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী মহানগরীর নায়েবে আমীর ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, রাজশাহী মহানগরী শিবিরের সভাপতি ইমরান নাজির ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবির সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল।

অন্য শরিক দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, এনসিপির নেতৃবৃন্দের মধ্যে মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, কেন্দ্রীয় নেতা মনিরা শারমিন ও ইমরান ইমন, জাগপা’র সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রধান, ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি অ্যাড. এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর মাওলানা আব্দুল কাইউম, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর অধ্যাপক সিরাজুল হক, রাজশাহীর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সেক্রেটারি ওয়াহেদুজ্জামান ডাবলু প্রমুখ।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি: জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, যতদিন জনগণের রায় বাস্তবায়িত না হবে, ততদিন আন্দোলন চলবে। সরকার ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েও জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে পড়েছে। তাই জনগণের রায়কে সম্মান জানাতেই হবে। তিনি বলেন, সরকার সাড়ে চার কোটি মানুষের রায়কে অস্বীকার করছে। জনগণের রায় মানা না হলে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

অলি আহমদ বীর বিক্রম: এলডিপি’র সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, জনগণ আজ দুঃসহ জীবনযাপন করছে। প্রতিদিন হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশ হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে কাজ করছে। ভারতে মুসলমানদের নামায পড়তে দেয়া হচ্ছে না, মসজিদ ভাঙা হচ্ছে। আমরা কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করি না, কিন্তু আমাদের প্রতিও হুমকি বরদাশত করা হবে না। তিনি আরো বলেন, এখন দলীয়করণের মাধ্যমে অযোগ্য লোকদের বিভিন্ন পদে বসানো হচ্ছে। আমরা কোনো দলীয় নেতা বা মন্ত্রী চাইনি, আমরা চেয়েছি সংস্কার। দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভয়াবহ। বিদেশের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আপনারা যাদের মন্ত্রী বানিয়েছেন তাদের অনেকেরই যোগ্যতা নেই। তারা জনগণের নয়, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। দেশের সমস্যা সমাধানে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কার করতে হবে।

নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি: ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির যে আদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেই একই সাংবিধানিক ভিত্তিতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন বৈধ হলে গণভোট কেন অবৈধ হবে? বিএনপির সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হলো দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অস্বীকার করা। জনগণ এর দাঁতভাঙা জবাব দিতে প্রস্তুত।

ড. কেরামত আলী এমপি: রাজশাহী মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. মো. কেরামত আলী এমপি বলেন, ভোট নেয়ার সময় জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করলেও ক্ষমতায় এসে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। আমরা জনগণের রায় বাস্তবায়ন করেই ছাড়বো।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম: জামায়াতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ভোটের আগে যারা জুলাই সনদের পক্ষে ছিল, সরকার গঠনের পর তারাই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। যেকোনো মূল্যে এ দেশের মানুষ গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেই ঘরে ফিরবে।

সারজিস আলম: এনসিপি’র উত্তরাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক সারজিস আলম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের মতো বিএনপির নেতা-কর্মীরা মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন। বাংলাদেশের মানুষ ধানের শীষে ভোট দিয়েছে বেগম খালেদা জিয়া ও মেজর জিয়াকে সামনে রেখে। তারেক রহমান তাঁর যোগ্য পিতা-মাতার উত্তরসূরি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটা সুযোগ পেয়েছেন। তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি এই সুযোগটা কাজে লাগাবেন কি না। কিন্তু আমরা যখন দেখি আওয়ামী লীগের সময়ে যেভাবে মিডিয়া দখল করা হতো, তাঁর সময়ে একই কায়দায় মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই দলীয় নেতাকর্মী দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন আমরা আগের যে বাংলাদেশ ছিল- সেই বাংলাদেশের লক্ষণ আমরা আবারো দেখতে পাই। সারজিস বলেন, “অভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশে চাঁদাবাজি হতো। এখনো হচ্ছে। যেগুলোর কারণে একটা অভ্যুত্থান হয়েছে, সেই কাজগুলো যদি বিএনপির নেতাকর্মীদের দিয়ে আবারো হয়, তাহলে আমরা আগামী দিনে বিএনপির রাজনীতি নিয়ে শঙ্কিত। আমরা বিশ্বাস করি, এই রাজনীতি করে আগামীর বাংলাদেশে কেউ আর টিকে থাকতে পারবে না।”

নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী : এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, আমাদের সামনে জীবন দিয়ে আবু সাঈদ ভাই বলে গেছেন- দেশকে রক্ষা করতে হলে রক্ত দিতে হবে। আমরা এখানে চাঁদাবাজি করতে আসিনি। আমরা এসেছি ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শহীদদের অধিকার রক্ষার জন্য। অনেক ভাই আজ পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে আছেন। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনে আমাদের ভোট চুরি করা হয়েছে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা নীরব ছিলাম। জুলাই সনদ নিয়ে তামাশা করবেন না। জনগণের রায় নিয়ে গড়িমসি করলে আপনাদের পরিণতিও আওয়ামী লীগের মতো হবে। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করি না। সীমান্তে প্রতিনিয়ত হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। এমন সম্পর্ক আমাদের প্রয়োজন নেই। ভারতকে আমরা ভয় করি না। পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়েও তারা টালবাহানা করছে। অন্যদিকে সরকার তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জনগণের সঙ্গে তামাশা করছে। অবিলম্বে এসব সংকট নিরসন করে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।

ইকবাল হোসেন প্রধান: জাগপা’র সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রধান বলেন, মাওলানা ভাসানী ফারাক্কা ইস্যুতে এখানেই সমাবেশ করেছিলেন। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে পদ্মায় পর্যাপ্ত পানি থাকবে। পদ্মা শুকিয়ে গেলে সরকারও টিকে থাকতে পারবে না। ভারতের সঙ্গে গোপন সমঝোতা বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না।

রফিকুল ইসলাম খান এমপি: রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশের সভাপতি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও গণভোটের প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। অথচ এখন বলা হচ্ছে জনগণ গণভোট বোঝে না। বিএনপি নেতারা পাগল হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ পাগল নয়। তারা বুঝেশুনেই ভোট দিয়েছেন। তাই দ্রুত জনগণের রায় মেনে নিতে হবে।