অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। জরুরি প্রয়োজনে জারি করা এসব অধ্যাদেশ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান তিনি। বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে ৪০টি নিয়ে প্রথম দিনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। কমিটির পরবর্তী বৈঠকে বাকি অধ্যাদেশগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা হবে। জুলাইযোদ্ধাদের দায়মুক্তির বিষয়ে সংসদীয় এ কমিটি একমত হয়েছে বলেও জানা গেছে।
কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, অধ্যাদেশগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও যথার্থতা যাচাই-বাছাই করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রিপোর্ট হিসেবে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপিত হতে পারে। এ জন্য ২৫ মার্চ বুধবার দুপুর ২টায় পরবর্তী বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে বলে সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে।
বৈঠকের পর কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন বলেন, প্রথম দিনে অর্ধেকেরও কম অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা গেছে। কিছু বিষয়ে সদস্যদের ভিন্ন মত রয়েছে, সেগুলো পরবর্তী বৈঠকে পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে। ১৩৩টি অধ্যাদেশ তৎকালীন সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার জারি করেছিল। প্রয়োজন হলে লিখিত মতামতও নেওয়া হবে। আমরা আশা করি, ২ এপ্রিলের আগেই সব অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংসদের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। সংসদে কবে উত্থাপিত হবে, তা পরে নির্ধারণ করবে, সম্ভবত এক সপ্তাহের মধ্যেই তা হতে পারে, যোগ করেন তিনি।
বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশসহ আরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মো. মুজিবুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম খান ও জি এম নজরুল ইসলাম।
বৈঠকের শুরুতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ছাত্র-জনতার আত্মার মাগফিরাত কামনায় এক মিনিট নীরবতা ও মোনাজাত করা হয়। এ ছাড়া বৈঠকে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলা, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক থেকে বের হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতাকে দায়মুক্তি দেওয়ার যে অধ্যাদেশ রয়েছে, তার সঙ্গে সংসদীয় বিশেষ কমিটি পূর্ণ একমত পোষণ করেছে। এই বীর যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বৈঠকের আলোচনা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিটি অধ্যাদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করছি। আগামী ২ এপ্রিলের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করা হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সংবিধান এবং জন-আকাক্সক্ষার মধ্যে সমন্বয় করে এগিয়ে যাওয়া। তবে সব ক্ষেত্রেই অবশ্যই সংবিধানের প্রাধান্য বজায় থাকবে।’
আইনমন্ত্রী আরও স্পষ্ট করেন যে, বিশেষ কমিটির সুপারিশগুলো সরাসরি আইনে পরিণত হবে না। কমিটি তাদের মতামত ও সুপারিশ সংসদে পেশ করবে এবং সংসদই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে সেগুলো আইনে পরিণত হবে কি না।
সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ববর্তী অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এরই মধ্যে ১৫ দিন অতিবাহিত হওয়ায় বাকি সময়ের মধ্যেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে বিশেষ কমিটি।
বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। তাই জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সংবিধানের কোনো ধারা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হলে তা করা হবে।
তিনি বলেন, বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চলছে; কোনো কোনো অধ্যাদেশের ব্যাপারে আমরা একমত হয়ে গেছি, আর কিছু বিষয় নিয়ে পরবর্তী মিটিংয়ে আলোচনা হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রদের চাকরির বয়সসীমা ৩২ বছর করার বিষয়ে তারা প্রায় একমত হয়েছেন। জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষায় প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে আমরা একমত। তবে এ বিষয়ে আরও কিছু আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।’
সংবিধান ও জুলাই আকাক্সক্ষার মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা জুলাই আকাক্সক্ষাকে অবশ্যই প্রাধান্য দেব। কারণ জুলাই বিপ্লব না হলে আমরা আজকে সংসদ ভবনে আসতে পারতাম না। এটাকে আমরা প্রায়োরিটি দেব।’ তিনি আরও যোগ করেন, সংবিধান কুরআন বা ওহী নয়; তাই দেশের ও জনগণের প্রয়োজনে তা পরিবর্তন করা যেতেই পারে।
সাবেক সরকারের কড়া সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, আগের ফ্যাসিবাদী সরকারের সাধারণ সম্পাদক সংবিধানের দোহাই দিয়ে অনেক কিছু করেছেন। তারা বলতেন সংবিধানের বাইরে এক চুল নড়বেন না। কিন্তু জামায়াত বিশ্বাস করে, জুলাই চেতনাকে সমুন্নত রেখে সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা করা হবে।
রফিকুল ইসলাম খান স্পষ্ট করেন যে, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা শুরু থেকেই বলে আসছেন তারা শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করবেন না। দেশের ও জনগণের স্বার্থে যেকোনো বিষয়ে সরকারকে সমর্থন দেওয়া হবে। তবে দেশ, জনগণ বা ইসলামের বিরুদ্ধে যায়Ñ এমন যেকোনো বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো অধ্যাদেশ ইসলামের বিরুদ্ধে যাচ্ছে বলে মনে হয়নি বলে জানান তিনি।