চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় আগে। অর্থাৎ গুনে গুনে ৬৩ দিন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ডা. শাহাদাত হোসেন এখনো মেয়র পদ ছাড়ছেন না। প্রচলিত আইনকে তোয়াক্কা না করেই তিনি এই পদটি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন, যা নিয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।

রোববার ( ২৬ এপ্রিল) আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের নিজের ফেসবুকে চসিক মেয়রের মেয়াদ শেষ নিয়ে পোস্ট করেন।

জুলকারনাইন সায়ের পোস্টে লেখেন, অথচ ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯’-এর ধারা ৬ অনুযায়ী, কোনো সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর। সে অনুযায়ী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি। ওই নির্বাচনের ২৮ দিন পর, ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি মামলা করেন নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের বিচারক খাইরুল আমীনের আদালতে, যার মামলা নম্বর ছিল ২/২০২১।

মামলার এজাহারে তিনি নির্বাচনে ‘অবিশ্বাস্য কারচুপির’ অভিযোগ এনে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পুনঃতফসিল ও পুনঃনির্বাচন দাবি করেন।

ওই মামলায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা এবং তৎকালীন চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীসহ মোট ৯ জনকে বিবাদী করা হয়। অন্য বিবাদীদের মধ্যে ছিলেন চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার (আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা) মো. হাসানুজ্জামান এবং অন্যান্য মেয়র প্রার্থীরা।

পরবর্তীতে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে করা এই মামলায় নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ও চট্টগ্রামের ১ম যুগ্ম জেলা জজ ২০২৪ সালের ০১ অক্টোবর রায় দেন। ওই রায়ে ‘নৌকা’ প্রতীকের প্রার্থীর বিজয় বাতিল করে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করা হয়।

এরপর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ২০২৪ সালের ০৮ অক্টোবর গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে তাকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে ঘোষণা করে। পরে ওই বছরের অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর শপথ গ্রহণের মাধ্যমে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডা. শাহাদাত হোসেন।

এদিকে, নির্বাচনের গেজেট অনুযায়ী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এর মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হলেও মেয়র পদ ছাড়ছেন না ডা. শাহাদাত হোসেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটেও তাকে মেয়র হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

এদিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারীর পর থেকে তিনি মেয়র হিসেবে যত আদেশ দিয়েছেন বা স্বাক্ষর করেছেন তা নিয়ে আইনী সংকট তৈরি হয়েছে। উচ্চ আদালতে গেলে এসব আদেশ টিকবে না বলেই মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে বলা হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়া সিটি কর্পোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে।

আইন অধিশাখার মতামতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক, প্রশাসনিক ও সার্বিক কার্যাবলীর ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রশাসক নিয়োগ করা যেতে পারে, এবং সেই প্রেক্ষিতে ডা. শাহাদাত হোসেনকে বা অন্য কাউকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে পূর্ণকালীন প্রশাসক (সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যন্ত) হিসেবে নিয়োগের সুপারিশেরও করা হয়। তারপরেও কোন এক কারণে মেয়র হতে প্রশাসক পদে যেতে শাহাদাত হোসেনের আপত্তি বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

এ বিষয়ে জনাব শাহাদাতের মতামত জানতে, তাঁর সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন — আদালতের রায় অনুযায়ী ২০২১ সালে নৌকার বিজয়ী প্রার্থী অবৈধ ঘোষিত হয়েছেন এবং জুডিশিয়াল অর্ডার অনুযায়ী অক্টোবর ২০২৪ হতে আগামী ৫ বছরের জন্য তাঁর মেয়াদ রয়েছে এবং এ সময়ের জন্যে তিনি মেয়র হিসেবেই নির্বাচিত হয়েছেন, এর স্বপক্ষে তিনি ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তাঁর আইনজীবির চেম্বার হতে স্বাক্ষরিত একটি চিঠি আমার সাথে শেয়ার করেন।

তবে ১ অক্টোবর ২০২৪ বিচারক খাইরুল আমীন (যুগ্ম জেলা জজ) নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল, চট্টগ্রাম স্বাক্ষরিত আদেশে স্পষ্টতই উল্লেখ করা হয়েছে যে '২৭/০১/২০২১ এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মেয়র হিসেবে ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থী শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে ঘোষণা করা হলো' (সংযুক্ত রায়টি লক্ষ্য করুন)।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত — আদালতের আদেশ অনুযায়ী এটা বেশ পরিষ্কার যে জনাব শাহাদাত ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র হিসেবে ৫ বছরের জন্যে মনোনীত হয়েছেন, আদেশটি ২০২৪ সালে হলেও তার মেয়াদ ওই নির্বাচনে বিজয়ী হিসেবে ৫ বছর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, অর্থাৎ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত। জনাব শাহাদাতের আইন পরামর্শকের ১৩ এপ্রিলের যুক্তি গ্রহণযোগ্য কোন ইনস্ট্রুমেন্ট নয় বলেও বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন।