কোনভাবেই লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না রেলের। প্রতি অর্থবছরেই লোকসানের ঘানি টানতে হচ্ছে এ খাতে। পরিসংখ্যান বলছে, রেলে এক টাকা আয় করতে খরচ করতে হচ্ছে আড়াই টাকা।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কভিড মহামারীর পর প্রথমবার রেলের আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। এ অর্থবছরে সংস্থাটি সব মিলিয়ে আয় করে ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। অন্যদিকে গত অর্থবছরে আয় কমলেও চলতি অর্থবছরে আবার তা বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৫৩২ কোটি টাকা আয় করেছে সংস্থাটি। তবে বাড়তে থাকা এ আয় রেলের লোকসান কমাতে যথেষ্ট নয়। রেলওয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর সংস্থাটির লোকসান হতে পারে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এ পরিমাণ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন রেলের কর্মকর্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি ট্রেনে আসন সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যাত্রী পরিবহণ করা হয়ে থাকে। মেঝেতে দাঁড়িয়ে এমনকি ট্রেনের ছাদেও যাত্রী দেখা যায়। অথচ রেলের পরিসংখ্যান বলছে-প্রতিটি ট্রেনের ১৫ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয় না। দিনের পর দিন চেষ্টা করেও টিকিট বিক্রি বাড়ানো যাচ্ছে না।
রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার তুলনায় টিকিট বিক্রি খুবই কম। এ কারণেই রেলে লোকসান হচ্ছে। গত অর্থবছরে রেল ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। আর ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা আয় করেছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরে ২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে রেল।
জানা গেছে, বিশ্বের প্রায় সব দেশে ২৪ থেকে ৩৪টি কোচ নিয়ে আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। কিন্তু বাংলাদেশে ৯ থেকে ১৬টি বগি নিয়ে আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। শুধু রাজনৈতিক ফায়দা নিতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে স্বল্প বগি দিয়ে ট্রেন চালানো হয়েছে। লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন ৪ থেকে ৮টি বগি নিয়ে চলছে। চলমান ট্রেনে যথাযথ কোচ সংযুক্ত করে ট্রেন পরিচালনা করলে প্রায় দ্বিগুণের (১৮০০ কোটি টাকা) বেশি আয় করা সম্ভব হতো। বর্তমানে ২৪৮টি যাত্রীবাহী ও ৩৩টি মালবাহী ট্রেন থেকে বছরে ৯০০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে।
জানা গেছে, মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ মালামাল পরিবহণ করে রেল। অথচ রেলপথে মালামাল পরিবহণের চাহিদা রয়েছে। এক সময় সিমেন্ট, সার, পাট, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য পরিবহণে রেলের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। অথচ এখন তলানিতে। পণ্য পরিবহণ বাড়ানোর কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
রেলভবনে এক মতবিনিময় সভায় রেলওয়ের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, রেলের লোকসান যে কোনো মূল্যে কমাতে হবে। আয় বাড়াতে যা যা প্রয়োজন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ও বাড়তি ব্যয় পরিহার করতে হবে।
উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। এক টাকা রোজগারের জন্য আড়াই টাকার মতো খরচ হয়। এটার পেছনে দুইটা কারণÑ রেলের দুর্নীতি ও অপচয়। এ অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি।
তিনি বলেন, রেলের লোকসানের আরও একটি কারণ হলো,বিনা টিকিটে যাত্রী পরিবহন। রেলওয়ে সেবার মূল্য অনেক কম। অনেকেই ট্রেনে উঠে ভাড়া দেন না। এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে রেলওয়ের সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাবে। লোকসান বাড়লে রেলের সেবা কমানো ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকবে না।’
রেলের দুর্নীতির বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘রেলের সচিব ও ডিজিকে সুনির্দিষ্ট টার্গেট দেওয়া হয়েছে। আমরা মনিটর করব এক টাকা উপার্জন করতে কত টাকা খরচ হয়। সেটা অবিলম্বে দুই টাকার নিচে আনতে হবে। এটা করতে হলে বাধ্য হয়ে তাদের দুর্নীতি কমাতে হবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিচালনায় বর্তমানে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হচ্ছে সরকারের। পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ যায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অনবোর্ড পরিষেবা, ইঞ্জিন-কোচ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রাংশ সংগ্রহের পেছনে। ‘বিশেষ কার্যক্রম’ খাতের এ পরিচালন ব্যয়ের প্রধান উদ্দেশ্য যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন।
যদিও সংস্থাটির যাত্রীসেবার মান নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ট্রেনে-স্টেশনে অপরিচ্ছন্নতা, সময়সূচিতে হেরফের, টিকিট কালোবাজারি, আসনবিহীন ও টিকিটবিহীন যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, খাবারের বাড়তি দামসহ ব্যবস্থাপনাগত বিভিন্ন ইস্যু এবং চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন-বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, ঘন ঘন লাইনচ্যুতির মতো কারিগরি বিষয়গুলোও যাত্রী ভোগান্তির কারণ হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রেলের ‘নাজুক যাত্রীসেবায়’ তেমন কোনো উন্নতি হয়নি বলে মনে করেন অনেক নিয়মিত রেলযাত্রী। উল্টো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেলের আয় কমেছে। অবশ্য আয় কমে যাওয়ার পেছনে গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ট্রেন চলাচল বিঘিœত হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন রেলের কর্মকর্তারা।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. এম সামছুল হক বলেন, রেলে আয় বাড়ানোর উত্তম পথ হলো কনটেইনার ও মালামাল পরিবহণ বাড়ানো। রেলের জমি ইজারা দিয়ে আয় বাড়ানো যায়। এখনো হাজার হাজার একর জমি বেদখলে রয়েছে।
সূত্র জানায়, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা বেড়েছে। জায়গায় জায়গায় রেলের জয়েন্টগুলো নাজুক অবস্থায় আছে, স্লিপার ক্ষয়ে গেছেÍতার ওপর ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলছে। ট্রেন থেকে বগি বা ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে রেলে রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি ঠিকমতো হচ্ছে না।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর রেলের পরিচালন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। এ পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে ৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। যদিও এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে সম্প্রতি এক সভায় জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক । ওই সভায় রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৫১৭ কোটি টাকা কমিয়ে ২ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।