সংসদ রিপোর্টার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ১২ মার্চ। সেদিন বেলা ১১টা থেকে সংসদ কক্ষে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।

গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ অধিশাখা থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ১২ মার্চ রোজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম (২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম) অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন। সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ আদেশটি প্রকাশ করা হলো।

এর আগে রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও জানান, আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। সেই অধিবেশনে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।

এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে যেকোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির। তিনি বলেছেন, যেহেতু স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের পদ বর্তমানে খালি আছে, তাই জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ ও কার্যপ্রণালি বিধি ৮-১০ মোতাবেক যেকোনো সংসদ সদস্য স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সম্প্রতি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন।

আইনজীবী শিশির মনির বলেন, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেছেন। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুসারে ১৫ মার্চ তারিখের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। যেহেতু স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের পদ খালি আছে, তাই প্রথম অধিবেশনে সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ ও কার্যপ্রণালি বিধি ৮-১০ মোতাবেক যে কোনো সংসদ সদস্য স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। প্রথম অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।

উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। এরইমধ্যে সংসদ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে প্রধানমন্ত্রী করে দলটির নতুন সরকার কাজও শুরু করেছে।

স্পীকার নির্বাচনের পদ্ধতি

বাংলাদেশের সংবিধান এবং সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি (জঁষবং ড়ভ চৎড়পবফঁৎব) অনুযায়ী স্পিকার নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্পিকার নির্বাচনের মূল ধাপগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:

নির্বাচনের সময় ও সভাপতিত্ব: প্রথম বৈঠক: সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকেই সংসদ-সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার এবং একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হয়।

সভাপতিত্ব: নতুন স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদায়ী সংসদের স্পিকার (যদি তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন) বা ডেপুটি স্পিকার সংসদ পরিচালনা করেন। যদি তারা কেউ উপস্থিত না থাকেন, তবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কোনো সংসদ সদস্য সভাপতিত্ব করেন।

মনোনয়নপত্র বা প্রস্তাব পেশ : যেকোনো সংসদ সদস্য অন্য একজন সদস্যের নাম স্পিকার হিসেবে প্রস্তাব করতে পারেন। এই প্রস্তাবটি অন্য একজন সদস্য কর্তৃক সমর্থিত হতে হবে। যাঁর নাম প্রস্তাব করা হচ্ছে, তাঁকে অবশ্যই এই মর্মে সম্মতি দিতে হবে যে, নির্বাচিত হলে তিনি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে রাজি আছেন।

ভোটাভুটি পদ্ধতি : একক প্রার্থী: যদি স্পিকার পদের জন্য কেবল একজনের নাম প্রস্তাব করা হয়, তবে সভাপতি তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেন। যদি একাধিক প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করা হয়, তবে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী কণ্ঠভোট (ঠড়রপব ঠড়ঃব) বা প্রয়োজনে বিভক্তি-ভোট (উরারংরড়হ ঠড়ঃব) অনুষ্ঠিত হয়। যে প্রার্থী উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাবেন, তিনিই নির্বাচিত বলে গণ্য হবেন।

শপথ গ্রহণ ও দায়িত্বভার : স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণের পর নতুন স্পিকার সংসদে এসে তাঁর আসনে বসেন এবং তাঁর সভাপতিত্বে পরবর্তী কার্যক্রম (যেমন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন) শুরু হয়।

কে হচ্ছেন স্পীকার

সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রথম দিনই স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার নির্বাচন করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে সামনে রেখে পরবর্তী স্পিকার হিসেবে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার নাম জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন এবং দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এই পদের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, জয়নুল আবেদীন দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় যুক্ত এবং বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংসদীয় অভিজ্ঞতা ও আইনি দক্ষতার সমন্বয়ে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য যোগ্য মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, নরসিংদী-২ আসন থেকে চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নামও সমান গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেও প্রবীণ এই নেতা এখনো সরকারের বাইরে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাকে স্পিকার পদের জন্য অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।

জাতীয় সংসদের স্পিকার পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংসদ অধিবেশন পরিচালনা, কার্যপ্রণালী বিধি প্রয়োগ এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই পদে অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ পরিচালনায় আইনি ব্যাখ্যা ও বিতর্ক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার বিষয়টিই চূড়ান্ত নির্বাচনে প্রধান বিবেচ্য হতে পারে।